কলেজের নির্মাণ শেষ হতেই উঠে যাচ্ছে আস্তর

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০৯ এএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২১

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই মেঝের সিমেন্টের আস্তর (প্রলেপ) উঠে যাচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় তলার শ্রেণিকক্ষ ও বারান্দার মেঝেতে পানি জমে ক্ষতি হচ্ছে ভবনের। আবার বাথরুম ও শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ফিটিংস, যা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই কলেজের পাঁচতলা ছাত্রীনিবাস ভবনের কাজও শেষ হয়েছে। ছাত্রীনিবাসটিতে সরবরাহ করা আসবাবপত্র (চেয়ার-টেবিল) ও ক্রোকারিজ সামগ্রীও মানসম্মত নয়। ছাত্রীনিবাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলেও তার ওপর নিরাপত্তা কাঁটাতার সঠিকভাবে লাগানো হয়নি।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) দেয়া এক প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি আইএমইডি থেকে কলেজটি পরিদর্শনে যাওয়া হয়। পরিদর্শন শেষেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটি নির্মাণে প্রকল্প অফিসের উদাসীনতা প্রতীয়মান। পাশাপাশি ঠিকাদারের উদাসীনতাও দেখা গেছে। কাজের ক্ষেত্রে যেসব ব্যত্যয় বা অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো ঠিকাদারের মাধ্যমে আগামী এক মাসের মধ্যে ঠিক করে অবহিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলেছে আইএমইডি।

ভবনটি নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর। এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইএমইডি সচিব যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে আশা করি। মালামাল মবিলাইজ হয়েছে। কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। কাজ শেষ হতে এক সপ্তাহের মতো লাগবে।’

সরেজমিন যা দেখেছে আইএমইডি
সূত্র বলছে, প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে চারতলা ভিতবিশিষ্ট দোতলা একাডেমিক কাম পরীক্ষা হল নির্মাণ, পাঁচতলা ভিতবিশিষ্ট পাঁচতলা ছাত্রীনিবাস ভবন নির্মাণ, একাডেমিক কাম পরীক্ষা হলের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ এবং ছাত্রীনিবাস ভবনের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ করা হচ্ছে।

পরিদর্শনে আইএমইডি দেখতে পেয়েছে, চারতলা ভিতবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের প্রথম পর্যায়ের দ্বিতীয়তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের কাজ ২০১২ সালের ৭ মার্চ শুরু হলে তা শেষ হয় ২০১৮ সালে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় এ ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ ২০১৮ সালের ২২ জুন শুরু হয়ে এখনো চলমান। নির্মাণকাজে ঠিকাদার নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবহার না করায় ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার ক্লাসরুম এবং বারান্দার মেঝেতে পানি জমে ভবনের ক্ষতি হচ্ছে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এছাড়া বাথরুম ও শ্রেণিকক্ষে নিম্নমানের ফিটিংস ব্যবহার করা হয়েছে বলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে।

একাডেমিক ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরের (তলার) কাজ পরিবীক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, কাজ শেষ হতে না হতেই ফ্লোর বা মেঝের সিমেন্টের আস্তর উঠে যাচ্ছে। কলেজের অধ্যক্ষ জানান, বারবার আপত্তি দিয়েও এ বিষয়ের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনও হয়েছে যে, প্রকল্পের আওতায় সম্পন্ন করা ফ্লোরের কাজ তিনি অন্য ফান্ডের টাকা দিয়ে পুনঃমেরামত বা সংস্কার করিয়েছেন।

পাঁচতলা ভিতবিশিষ্ট পাঁচতলা ছাত্রীনিবাস ভবনের নির্মাণকাজ ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর শুরু হয়ে সম্প্রতি শেষ হয়। হোস্টেলের সরবরাহ করা আসবাবপত্র (চেয়ার-টেবিল) ও ক্রোকারিজ সামগ্রী মানসম্মত নয় বলে প্রতীয়মান হয় পরিদর্শনে। ছাত্রীনিবাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলেও তার ওপর নিরাপত্তা কাঁটাতার সঠিকভাবে লাগানো হয়নি বলেও দেখেছে আইএমইডি।

পরিদর্শনকালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তোলে। কর্তৃপক্ষ জানায়, ঠিকাদারের কাজ তদারকি করার জন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্ট লোকজন নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না।

প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী রজনী কুমার চাকমা আইএমইডির জিজ্ঞাসাবাদে এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। চলমান প্রকল্পটিতে বিভিন্ন নির্মাণকাজে প্রকল্প অফিসের উদাসীনতা প্রতীয়মান।

যে ব্যাখ্যা দিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী
খাগড়াছড়ির শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা আসলে একটা ভুল বোঝাবুঝি। পরে বিষয়টা আইএমইডি সচিবকে বলা হয়েছে। চারতলা ভবন তো। এর প্রথম দোতলার দরপত্র ছিল ২০১৩ সালে। ওটা হস্তান্তর হয়েছে আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর আগে (যদিও আইএমইডির প্রতিবেদনে ২০১৮ সালে বা তিন বছর আগে কাজ শেষ হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে)। এখন তিন ও চারতলার কাজ চলছে। যেটা পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে হস্তান্তর হয়েছে এবং এখন ব্যবহার হচ্ছে; সেটার ফ্লোরের কিছু জায়গা উঠে গেছে। সচিব ভেবেছেন, দুটোরই একই সময়ের দরপত্র (যদিও প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে)। তিনি হয়তো ভেবেছেন, এটার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ফ্লোরের সিমেন্টের আস্তর উঠে যাচ্ছে। বিষয়টা আমরা স্যারকে জানিয়েছি।’

তারপরও এখনই কি মেঝের সিমেন্টের আস্তর উঠে যাওয়ার কথা বা ভবনের স্থায়িত্ব কি এত কম? এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘এ সময় খুব একটা বেশি নয়। হয়তোবা ক্লাস করছিল বাচ্চারা। সব জায়গায় তো একইরকমভাবে ক্লিনিং (পরিষ্কার) হয় না। হয়তোবা বাচ্চারা ক্লাস করছে, বেঞ্চ টানাটানি করে অনেক সময়, এতে হয়তো কিছু অংশ উঠে গেছে। কাজ শেষ হতে না হতেই উঠে গেছে, এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল।’

jagonews24

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কলেজের অধ্যক্ষ জানান, বারবার আপত্তি দিয়েও এ বিষয়ের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আসিফুর রহমান বলেন, ‘না না, এটা ঠিক না।’

দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এটা ঠিক না। আমি তো তখন দায়িত্বে ছিলাম না। আমি তো দায়িত্ব পেয়েছি কিছুদিন আগে।’

মূল প্রকল্পের কী হাল
২০১০ সালের আগস্টে শুরু হয়েছিল ‘শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজসমূহের উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের কাজ। এর আওতায় ৭০টি সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে নির্মাণকাজ চলছে।

এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তাহিয়েত হোসেন গত মাসে অবসরে গেছেন। এখনো এ প্রকল্পে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়নি। সপ্তাহখানেকের মধ্যে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হতে পারে।

দীর্ঘসময় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন মো. তাহিয়েত হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ প্রকল্প প্রথমে (২০১০ সালের আগস্টে) শুরু হয়েছিল ৬৫৫ কোটি টাকায়। পরে খরচ বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৬৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ বেড়েছে, টাকা বেড়েছে। আসলে কাজই বাড়ছে শতভাগ। এজন্য সময় বেড়েছে। এই (খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবন) ভবন ছিল দোতলা। পরে তা পাঁচতলা হয়েছে। হোস্টেল ছিল চারতলা, পরে সেটা হয়েছে পাঁচতলা। এরকম সারাদেশেই কাজগুলো বেড়েছে। এতে ১০০ দশমিক ৫৭ শতাংশ ফিজিক্যাল কাজই বেড়ে গিয়েছিল। এ কারণে সময় বেড়েছে। এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। আমি গত মাসে ৬৬ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি রেখে এসেছিলাম।’

প্রত্যেকটা কলেজের বাজেট সমান নয় বলেও জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি কলেজের কাজের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ কাজটায় প্রকল্প পরিচালক যুক্ত নন। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হয়। নির্মাণ সংক্রান্ত পূর্ণ দায়-দায়িত্ব তাদের। টাকা-পয়সা তাদের দিয়ে দিতাম। কিছুই করতাম না। মনিটরিংসহ পুরো সেটআপ আছে তাদের। তারাই এর জবাব দেবে।’

পিডি/ইএ/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]