এমন কর্তৃত্বপূর্ণ বাংলাদেশকে শেষ কবে দেখা গিয়েছিল?

সৌরভ কুমার দাস
সৌরভ কুমার দাস সৌরভ কুমার দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬

পাকিস্তান ৩০ ওভারেই ১১৪ রানে অলআউট! নাহিদ রানা নিলেন একাই ৫ উইকেট। ২ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৫.১ ওভারেই জয়, ঝোড়ো ফিফটি করলেন তানজিদ হাসান তামিম। ১০০ ওভারের ওয়ানডে ম্যাচ শেষ মাত্র ৪ ঘণ্টায়! রমজান মাস হওয়ায় ইফতারের জন্য ৪০ মিনিটের বিরতি রাখা হয়েছিল। অথচ ইফতারের আগেই বাংলাদেশের জয়ে সেই বিরতির আর প্রয়োজনই হয়নি! তামিম-শান্তরা বাংলাদেশকে জিতিয়েই ইফতার সেরেছেন।

এই চিত্রগুলোই স্পষ্ট করে দিয়েছে, পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের আজকের জয় ঠিক কতটা দাপুটে, কতটা আধিপত্য বিরাজ করে কতটা একপেশে! তবে মাঠের খেলায় দাপটটা ছিল আরও বেশি! ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বশেষ কবে এমন কর্তৃত্ববাদী বাংলাদেশকে দেখা গিয়েছিল?

টেস্ট ও টি-টোয়েন্টির চেয়ে ওয়ানডে ভালো খেলে বাংলাদেশ। এমন একটা সুনাম এক সময় বাংলাদেশের ছিল। আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ছয় নম্বর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল টাইগাররা। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা যখন ছিলেন, তখন বাংলাদেশকে সমীহ করতো বিশ্বের সব পরাশক্তিই।

২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে যে সাফল্যের সূচনা করেছিল বাংলাদেশ, তারা ধারাবাহিকতা ছিল ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং পাকিস্তানের মত শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে আজ যে দাপুটে জয় পেয়েছে, এমন দাপুটে ও একপেশে জয় শেষ কবে পেয়েছিল বাংলাদেশ? এমন প্রশ্ন এখন আসতেই পারে। ধারাবাহিক না হতে পারলেও অনেক বড় দলকেই অনেকবার ধরাশায়ী করেছে টাইগাররা।

গত বছর এই মিরপুরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৭৯ রানে হারিয়েছিল। যদিও ওই সিরিজের উইকেট নিয়ে নানা আলোচনা আছে। তবে ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কাকে ১৬৩ রানে, ২০১৫ দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৯ উইকেটে, ২০১৫ সালে এই পাকিস্তানকেই ৩-০ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। একই বছর ভারতের বিপক্ষেও সিরিজ জয় আছে ২-১ ব্যবধানে।

জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হেসে-খেলে জয়ের অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতের মত দলগুলোর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতো, খেলতে পারতো। কিন্তু পঞ্চ পাণ্ডবের বিদায়ের পর গত কয়েক বছর সেই সম্মান হারিয়েছে বাংলাদেশ। টাইগাররা আর সমীহ জাগানিয়া দল নয়।

তবে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং প্রতি বিভাগেই এমন নিখুঁত পারফরম্যান্স আর প্রতিপক্ষকে একদম চেপে ধরে জয় আদায় করা! গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বশেষ এমন পারফরম্যান্স কবে দেখা গেছে এমন প্রশ্নের উত্তর বের করা মুশকিল।

৪ মাস পর ওয়ানডেতে ফেরা, সাম্প্রতিক সময়ে এই সংস্করণে পারফরমেন্সের নিম্নমুখী গ্রাফ, ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা নিয়ে নানা শঙ্কা! মাথার উপর এতসব বোঝা নিয়েই পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ দল।

তবে মাঠে নামতেই যেন সব চাপ একপাশে সরে গেলো। বল হাতে একের পর এক আগুন ঝরানো ডেলিভারি করলেন নাহিদ রানা। তাতে চুরমার হলো পাকিস্তানি ব্যাটিংয়ের টপ ও মিডল অর্ডার। এরপর বাকি কাজটা সারলেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। স্বল্প লক্ষ্য পেয়ে ব্যাটিংয়েও হলো বিধ্বংসী শুরু। সবমিলিয়ে এই জয়কে কি বলা যায়! আধিপত্য, দাপট নাকি কর্তৃত্ববাদী এক জয়?

গত সোমবারই টাইগারদের হেড কোচ ফিল সিমন্স বলেছিলেন, এখন থেকে নিয়মিত একাদশে তিন পেসার খেলানোর চেষ্টা করবেন। আজ বুধবার সেটাই দেখা গেলো। মোস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদের সঙ্গে নাহিদ রানাও ছিলেন একাদশে।

একাদশে শুধু ছিলেন বললে ভুল হবে, রীতিমতো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন প্রতিটি ডেলিভারিতে। পাকিস্তানের টপ আর মিডল অর্ডার ব্যাটারদের জন্য যেন যমে পরিণত হয়েছিলেন এই ডানহাতি পেসার। তার একের পর এক করা গোলার মতো ডেলিভারির সামনে পাকিস্তানি ব্যাটারদের কোনো উত্তরই জানা ছিল না।

কেউ শরীর বাঁচাতে গিয়ে আউট হলেন, কেউ ডেলিভারি বুঝতে পারেননি, আবার কেউ কেউ তো বল চোখেই দেখেননি! সিলি ফিল্ডার রেখে শরীর বরাবর একের পর এক ডেলিভারি, সঙ্গে ২ স্লিপ আর গালি! মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটকে যেন হুট করেই অস্ট্রেলিয়ার গাব্বা বানিয়ে ফেলেছিলেন রানা।

টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তানের শুরুটা খুব একটা মন্দ হয়নি। ৯.৫ ওভারে বিনা উইকেটে ৪১ রান তুলে ফেলছিল তারা। তবে ওই ওভারেই আক্রমণে আসা নাহিদ রানা পাওয়ার প্লের শেষ বলেই ধ্বস নামানোর শুরুটা করেন।

টস জিতে ২৭০-৮০ রান করতে চেয়েছিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি। তবে টস না জিতলেও প্রথমে ব্যাট করার সুযোগ পায় তারা। কিন্তু একস্রোতে ৯ ওভারের মধ্যে পাকিস্তানের ৫ উইকেট তুলে ওখানেই তাদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন নাহিদ।

উইকেটে কিছু ঘাস থাকলেও এতটা ভয়ঙ্কর ছিল না; কিন্তু নাহিদ রানা যেন পাকিস্তানি ব্যাটারদের জন্য বিভীষিকা হিসেবে হাজির হন। শুরু থেকে সাবলীল অভিষিক্ত শামিল নাহিদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরেই আউট হন। এরপর পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডারের অন্যতম ভরসা মোহাম্মদ রিজওয়ানও নাহিদ রানের বিপক্ষে কোনো জবাব দিতে পারেননি। বরং গতিময় আউট সুইংয়ে অসহায় আত্মসমর্পন করতে হয় তাকে।

এরপর সালমান আলী আঘাকে আউট করেন টেস্ট ভঙ্গিতে! দুই স্লিপ, এক গালি আর এক সিলি পয়েন্ট রেখে শরীর বরাবর একের পর এক বাউন্সার ছুড়তে থাকেন নাহিদ। সেখানেই একটি ডেলিভারিতে গ্লান্স করতে গিয়ে সিলিতে তামিমের হাতে ধরা পড়েন সালমান।

নাহিদ যখন ফাইফার পূর্ণ করেন তখন পর্যন্ত খরচ করেছিলেন মাত্র ১৮ রান। সবমিলিয়ে এই ম্যাচে তার প্রাপ্তি ২৪ রানে ৫ উইকেট। ওয়ানডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এটি। এর আগে পাঁচ উইকেট ছিল কেবল মুস্তাফিজুর রহমানের (৫/৭৫)।

১১৪ রান তাড়ায় শুরু থেকেই পাকিস্তানি বোলারদের উপর তান্ডব শুরু করেন তানজীদ তামিম। শুরুতে সাইফ হাসানকে হারালেও নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান দলকে। ৩২ বলে ফিফটি করা তামিম শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫ ছক্কায় ৪২ বলে ৬৭ রান করে।

জয়ের কাছে গিয়ে আউট হন শান্ত (৩৩ বলে ২৭)। লিটন কুমার দাসকে নিয়ে কাজ শেষ করেন তানজিদ। ২০৯ বল রেখে জয় পায় বাংলাদেশ। এর চেয়ে বেশি বল বাকি রেখে জয় আছে তাদের স্রেফ দুটি- ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২২১ বল রেখে জয়, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৯ বল আগেই জয়।

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জনে পাকিস্তান সিরিজ দিয়েই মিশন শুরু করেছে বাংলাদেশ। আর প্রথম স্টপেজেই এমন দাপুটে জয় নিশ্চিতভাবেই পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিবে কয়েকগুন।

এসকেডি/আইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।