নাহিদ রানার কাছেই হেরেছে পাকিস্তান: মানছেন পাকিস্তান কোচও
খালি চোখে যারা খেলাটি দেখেছেন, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন- নাহিদ রানার বারুদে বোলিং তোপ সামলাতে না পেরেই মুখ থুবড়ে পড়েছে পাকিস্তান।
আবার কেউ যদি খেলা না দেখে কেবল স্কোরকার্ডে এক পলক চোখ রাখেন, তিনিও বলে দেবেন- কেউ যদি একা ৭ ওভারের টানা স্পেলে ২৪ রানে ৫ উইকেট নেন, তাহলে প্রতিপক্ষের বারোটা বেজে যাওয়াই স্বাভাবিক। ঠিক সেটাই হয়েছে পাকিস্তানের। ফলে শাহিন শাহ আফ্রিদীর দল ১১৪ রানে অলআউট হয়ে দিন শেষে ৮ উইকেটে হেরে হোটেলে ফিরেছে।
মানা যায়, নাহিদ রানা বল হাতে আগুন ঝরিয়েছেন। তার বোলিং তোপ সামলাতে না পেরেই সাহিবজাদা ফারহান, মা’জ সাদাকাত, শামিল হোসেন, মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আগারা অল্প সময় ও কম রানেই সাজঘরে ফিরেছেন।
কিন্তু নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, উইকেট কেমন ছিল? একজন ফাস্ট বোলার যখন বল হাতে আগুন ঝরান, তার গতি ও সুইংয়ে যখন প্রতিপক্ষের প্রথম পাঁচ ব্যাটার নাকাল হন, তখন মনে হতেই পারে উইকেট বুঝি ফাস্ট বোলিং- সহায়ক ছিল।
কিন্তু তা যে ছিল না, দিনের পরের সেশনে তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর অনায়াস ব্যাটিংই তা প্রমাণ করেছে। শাহিন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফাহিম আশরাফ ও আবরার আহমেদরা কোনো সুবিধাই করতে পারেননি। বরং বেশ মার খেয়েছেন। ২০৯ বল বাকি থাকতেই বাংলাদেশ লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে।
তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত পাকিস্তানের তিন পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ ওয়াসিম ও ফাহিম আশরাফকে দেদার সীমানাছাড়া করেছেন। প্রায় টি-টোয়েন্টি মেজাজে খেলে ৪২ বলে ৬৭ রান করার পথে তানজিদ তামিমের ৫৮ রান এসেছে ছক্কা (৫টি) ও চার (৭টি) থেকে।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময়ই পরিষ্কার হয়ে যায়, আসলে উইকেট ছিল ‘স্পোর্টিং’। সেই উইকেটেই এক তরুণ তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ওয়ানডেতে একাই প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। সেটা অবশ্যই উইকেটের সহায়তায় নয়, বরং নিজের ক্যারিশমায়।
গতির সঙ্গে সুইংয়ের মিশেলটা বেশ ভালো ছিল নাহিদ রানার। এই উইকেটে ঠিক যে জায়গায় বল ফেলতে পারলে ব্যাটারকে ধাঁধাঁয় ফেলা যায়, নাহিদ রানা ঠিক সেটাই করেছেন। কখনো গুড লেন্থ স্পটে, আবার কখনো থ্রি-কোয়ার্টার লেন্থে বল ফেলে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উঁচু বাউন্স তুলে পাকিস্তানি ব্যাটারদের বিপাকে ফেলেছেন।
দিন শেষে পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসনও তা অকপটে স্বীকার করেছেন। খেলা শেষে কথা বলতে এসে নিউজিল্যান্ড বংশোদ্ভূত এই কোচ বলেন, ‘নাহিদ রানাই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিয়েছে।’ স্কোরকার্ডের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘নাহিদ রানা বোলিংয়ে আসার আগে আমরা মোটামুটি ভালো অবস্থায়ই ছিলাম। কিন্তু সে আসার পর থেকেই আমরা ক্রমে পিছিয়ে পড়েছি।’
কথাটি মিথ্যা নয়। নাহিদ রানা বোলিংয়ে আসার আগে ৯ ওভারে পাকিস্তানের রান ছিল বিনা উইকেটে ৩৫। তিনি ১০ম ওভারে বোলিং করতে এসে শেষ বলে সাহিবজাদা ফারহানকে আউট করেই পাকিস্তানকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন। এরপর অভিষিক্ত মা’জ সাদাকাত, শামিল হোসেন এবং অভিজ্ঞ রিজওয়ান ও সালমান আগাকে পরপর সাজঘরে ফেরত পাঠিয়ে ম্যাচের চিত্র মুহূর্তেই বদলে দেন। প্রথম ৫ ওভারেই ৫ উইকেট তুলে নেন নাহিদ রানা।
ফলে বিনা উইকেটে ৪১ থেকে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৭০। সেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি শাহিন শাহ আফ্রিদির দল।
পাকিস্তান কোচ হেসনও সেটিই বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। একই উইকেটে শাহিন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফাহিম আশরাফ, তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তেমন কিছু করতে পারেননি। অথচ নাহিদ রানা দারুণ কার্যকর বোলিং করেছেন।
এর ব্যাখ্যা দিয়ে মাইক হেসন বলেন, ‘নাহিদ রানা বেশিরভাগ সময় উইকেট বরাবর বল করেছে। মাঝে মাঝে গতি ও বাউন্সে ভিন্নতা এনেছে। তার গতির বিপক্ষে যে পাল্টা জবাব দেওয়া উচিত ছিল, বা যেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার ছিল, আমাদের ব্যাটাররা তার কিছুই করতে পারেনি।’
নাহিদ রানাকে আগে কয়েকবার টেলিভিশনে বোলিং করতে দেখলেও সামনাসামনি আগে কখনো দেখেননি হেসন। আজই প্রথম দেখলেন এবং দেখে মুগ্ধ পাকিস্তান কোচ।
তিনি বলেন, ‘আমি নাহিদ রানাকে আগে টিভিতে বল করতে দেখেছি। এবারই প্রথম তাকে সরাসরি দেখলাম। সত্যিই সে চমৎকার বোলিং করেছে। এমনকি ওয়ার্ম-আপের সময়ও তাকে দেখে মনে হয়েছে তার দিনটা ভালো যাচ্ছে।’
নাহিদ রানার বোলিং নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পাকিস্তান কোচ বলেন, ‘রানা জোরের সঙ্গে উইকেটে বল ফেলেছে। কখনো সিম মুভমেন্ট করিয়েছে, আবার কখনো ক্রস-সিম ব্যবহার করেছে। আমার তাকে বেশ ভালো লেগেছে। আমার মনে হয় সে একজন সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলার। এমন এক ম্যাচে ৫ উইকেট পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সব মিলিয়ে সে প্রশংসা পাওয়ার মতোই বোলিং করেছে।’
এআরবি/আইএইচএস