বুলবুলের একার সিদ্ধান্তেই কি এনএসসিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসলো বিসিবি?
এমনিতেই কোনো কিছু ঠিক নেই। ক্রিকেট বোর্ড কীভাবে চলছে? সভাপতি নেই এক মাসের বেশি সময় ধরে। কে বোর্ড চালাচ্ছেন? দুইজন সহ-সভাপতি আছেন—ফারুক আহমেদ এবং সাখাওয়াত হোসেন। তাদের কোনো দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়নি। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সেই অর্থে তেমন কোনো নির্দেশনা পাননি। শুধু জাতীয় দলের কার্যক্রমটা চলছে, আর নারী ক্রিকেটের কিছু কার্যক্রম। কিন্তু পুরো বোর্ডের চেইন অব কমান্ড (আদেশ দানের পরম্পরা) বলতে এখন কিছু আছে বলে মনে হয় না।
কী করে থাকবে? এক মাসের বেশি সময় ধরে বোর্ড সভাপতি দেশে নেই এবং তিনি দায়িত্বের সুষম বণ্টনও করে যাননি। কেউ জানে না আসলে কার কাজের ক্ষেত্র কী, কে কী কাজ করবেন। কে প্রশাসন (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) দেখবেন, কে গেম ডেভেলপমেন্ট দেখবেন—এসব কমিটি আছে। তারপরও কে ক্রিকেটের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন এবং বোর্ড পরিচালনার দায়িত্বে সভাপতির অনুপস্থিতিতে সহ-সভাপতিদের ভূমিকা (রোল) কী হবে—সেটা স্পষ্ট নয়। কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন, সেটাও পর্যন্ত ঠিক নেই।
এইরকম একটি টালমাটাল অবস্থার মধ্যে গতকাল রাতে ঘটেছে আরেক অদ্ভুত ঘটনা। বলা নেই, কওয়া নেই—জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তথা এনএসসি, বিসিবির গত অক্টোবরের নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপ এবং নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ পেয়েছে ক্লাবগুলো ও জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আর সেই তদন্ত কমিটির বিপক্ষে রীতিমত অবস্থান নিয়ে বসলো আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ক্রিকেট বোর্ড।
বিসিবি গতকাল রাতে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (প্রেস রিলিজ) দিয়েছে। যার সারমর্ম হলো—এ মুহূর্তে বিসিবির নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের তদন্ত মানেই সরকারের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) চোখে বিসিবির কার্যক্রমে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে। যা বাংলাদেশের আইসিসির সদস্যপদ এবং ক্রিকেটের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি তাদের এই মনোভাবের কথা জানিয়ে আরও বলে, এনএসসি সম্প্রতি একটি গেজেট প্রকাশ করেছে যেখানে গত নির্বাচনের বিষয়ে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। বিসিবির দাবি—বর্তমান বোর্ড সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং নিজস্ব গঠনতন্ত্র মেনে নির্বাচিত হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারা নিয়মিত সব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এমন অবস্থায় আকস্মিক এই তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত বিসিবির স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আইসিসির পূর্ণ সদস্য হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বৈশ্বিক প্রশাসনিক (গ্লোবাল গভর্নেন্স) কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হয়। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত ক্রিকেট বোর্ডের কাজে তৃতীয় পক্ষের বা সরকারি হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ আইসিসির শাসন ও বাধ্যবাধকতা (গভর্নেন্স ও কমপ্লায়েন্স) নীতিমালার আওতায় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে ফেলতে পারে।
বিসিবি থেকে আরও জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে আইসিসির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বোর্ডে যেকোনো হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ধরনের একটি বক্তব্য যখন বিসিবি থেকে আসে, তখন সেটিকে অনেকেই এনএসসির তদন্ত কমিটিকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল বলেই মনে করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বিসিবির এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু উদ্বেগই প্রকাশ করা হয়নি, বরং পরোক্ষভাবে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম স্থগিত রাখার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এই কার্যক্রম পরিচালিত হলে দেশের ক্রিকেটের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গল বেশি হবে এবং আইসিসির নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে—এমন বার্তাও সেখানে রয়েছে। তার মানে এনএসসি এবং বিসিবি এখন মুখোমুখি অবস্থানে। মোটা দাগে বলতে গেলে, এনএসসির তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তকে বিসিবি নিন্দা (কনডেম) করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছে যে এ ধরনের পদক্ষেপ আইসিসির দৃষ্টিতে সরকারি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যার ফলে শাস্তির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল দেশে নেই। দুইজন সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ এবং সাখাওয়াত হোসেন। সিইওয়ের দায়িত্বে নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন, পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম, ইফতেখার রহমান মিঠু, ফায়জুর রহমান মিতু। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা কেউই এ বিষয়ে আগে কিছু জানতেন না। জাগো নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত তিনজন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে, এই চিঠি দেওয়ার আগে বোর্ডে কোনো সভা-বৈঠক বা এমনকি কোনো জুম কনফারেন্সও হয়নি। সহ-সভাপতি দুইজনের কেউই বিষয়টি জানতেন না। অনেকে দ্বিধা ও সংকটে ফোন ধরছেন না। যারা ধরছেন, তারা শুরুতেই বলছেন—ভাই, আমরা কিছুই জানি না। আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজেই এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং পুরো সিদ্ধান্তটি তাঁর একক। তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ বা আলোচনা না করেই তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হওয়ার অবস্থান নিয়েছেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিকে তাকে মোকাবিলা করতেই হবে। তিনি হয়তো বিষয়টি জানেন না, অথবা জেনেশুনেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু কেন? এটি তো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মতো হয়ে গেল। তিনি এককভাবে বোর্ডের অন্য শীর্ষকর্তাদের না জানিয়ে বিসিবির পক্ষ থেকে এনএসসিকে চ্যালেঞ্জ করে যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন, সেটি কার্যত এনএসসির কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।
এনএসসি হলো বাংলাদেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক সংস্থা। এনএসসির ২০১৮ সালের গঠনতন্ত্রের ২১ ধারায় পরিষ্কার বলা আছে—কোনো ফেডারেশনের কার্যক্রম যদি নিয়ম অনুযায়ী সন্তোষজনক না হয় এবং সংশ্লিষ্ট খেলাটির মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গলের আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সেই কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে পারে। কিন্তু এনএসসি তা করেনি। তারা কেবল নির্বাচনের অস্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সেই তদন্ত কমিটিকে তো বিসিবিকেও মোকাবিলা করতে হবে।
এখন বিসিবির শীর্ষকর্তা আমিনুল ইসলাম বুলবুল যে তদন্ত কমিটিকে গুরুত্ব দিতে চাইছেন না, তা স্পষ্ট। কিন্তু এতে সরকারি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তিনি এনএসসিকে আইসিসির সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখাচ্ছেন। ফলে পরিস্থিতি দাঁড়াচ্ছে—বিসিবি (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) বনাম এনএসসি। আর যখন বিষয়টি প্রকাশ পাবে যে বোর্ডের অধিকাংশ শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তখন বোর্ডের ভেতরেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হবে—যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
বেশ কয়েকজন পরিচালক উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন—এনএসসি যখন তদন্ত করতে চায়, তারা দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করুক। তদন্ত কমিটি তাদের কাজ করুক। কিন্তু বিসিবি কেন আগ বাড়িয়ে এমন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিল? এই বিজ্ঞপ্তির দায় বিসিবির অন্য শীর্ষকর্তাদের নয়—খোদ আমিনুল ইসলাম বুলবুলের।
এনএসসির তদন্ত কমিটির বিপক্ষে বুলবুলের এই অবস্থান, যা বোর্ডের বেশিরভাগ পরিচালকের অজান্তে নেওয়া হয়েছে, তা এনএসসির মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। পদাধিকারবলে দেশের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও এনএসসির প্রধান। তিনিও কি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেবেন? এখন বিষয়টি অনেকটাই ইগোর লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে—বিসিবি বনাম এনএসসি। আর যখন পরিষ্কার হবে যে এটি মূলত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, তখন এনএসসি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং আমিনুল ইসলাম বুলবুল সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে চলে যেতে পারেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের একাধিক কর্তা জাগো নিউজকে মতামত জানাতে গিয়ে বলেছেন, এই চিঠিটা বুলবুল যদি ব্যক্তিগতভাবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে দিতেন বা সরাসরি যোগাযোগটা সেভাবে হতো, তখন একটু সমঝোতা বা নমনীয়তা সুযোগ ছিল। এখন বরং এটা বিসিবির পক্ষ থেকে সরাসরি এনএসসিকে চ্যালেঞ্জ করাই হয়ে গেলো।
প্রশ্ন হচ্ছে—একজন বোর্ড সভাপতি কি নির্বাচিত সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে এভাবে দ্বন্দ্বে জড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন? সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এআরবি/এমএমআর