রেকর্ড, দাপট আর ‘স্টেটমেন্ট’ রাখা জয়
মেঘলা আকাশের নিচে টস জিতে আগে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিলেন লিটন কুমার দাস, ইনিংসে দ্বিতীয় ওভারে উইকেটের দেখাও পেলো বাংলাদেশ। তবে এরপরই টাইগার বোলিংয়ের উপর রীতিমত ঝড় বয়ে গেলো। কেটিনি ক্লার্ক ও ডিন ক্লিভার মিলে একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকালেন।
সেখান থেকে রিশাদ হোসেন দুজনকে ফিরিয়েই বাংলাদেশকে স্বস্তি এনে দিলেন। তবে এরপও বাংলাদেশকে জিততে হলে রেকর্ড গড়তেই হতো। শুরুটা অত ভালো না হলেও তাওহীদ হৃদয় আর পারভেজ হোসেন ইমন মিডল অর্ডারে দুর্দান্ত জুটিতে বাংলাদেশ লড়াইয়ে রাখলেন। আর শেষদিকে শামীম হোসেন পাটোয়ারীর ক্যামিওতে রেকর্ড গড়েই জিতলো লিটন দাসের দল।
সোমবার চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শহীদ মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ১৮৩ রান তাড়া করতে জিতেছে বাংলাদেশ।
ঘরের মাটিতে টি-টোয়েন্টিতে এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড। এর আগে গত নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭০ রান তাড়া করে জিতেছিল লিটনের দল। আজ সেই রেকর্ডকেই টপকে গেলো টাইগাররা।
জয়ের জন্য শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১০৬ রান। বাংলাদেশ সেটা তাড়া করেছে ২ ওভার হাতে রেখেই। তাওহীদ হৃদয়, পারভেজ হোসেন ইমন ও শামীম হোসেন আজ রান তাড়ায় নামার পর ইনিংসের মধ্যবর্তী ওভারগুলোতে (৭–১৬) ওভার প্রতি ১০.৯ রান তুলে মোট ১০৯ রান করেছেন, যা টি-টোয়েন্টিতে রান তাড়ায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।
ওয়ানডে সিরিজ জিতে এমনিতেই বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। তবে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলা, ১৪৬ দিন পর টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা- সবমিলিয়ে মানিয়ে নেওয়ার কিছু ব্যাপার তো ছিলই। তবে বাংলাদেশ যেভাবে জিতেছে রান তাড়ায় এমনভাবে জিততে দেখার নজির খুব একটা নেই বললেই চলে।
মেঘলা আকাশ দেখেই সম্ভবত আগে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লিটন। প্রথম ওভারেই ১১ রান তোলে নিউজিল্যান্ড, তবে তাওহীদ হৃদয়ের বুলেট থ্রোতে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই প্রথম উইকেটের দেখা পায় বাংলাদেশ। তবে এরপর কেটিনি ক্লার্ক ও ডিন ক্লিভারের তোপের মুখে পড়েন টাইগারা বোলাররা। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে দুজনের ব্যাটে ৬১ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। প্রথম ১০ ওভারের মধ্যে ক্যাচ মিস, চার-ছক্কা সবই দেখা গেছে।
ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা ক্লার্কের ক্যাচ ফেলেছেন সাইফ, তার রান তখন ২৮ বলে ৪৪। ৯,৩ ওভারেই ৯৯ রান জমা হয় নিউজিল্যান্ডের স্কোরবোর্ডে। ক্লার্ক ও ক্লেভার, দুজনেই বাংলাদেশের বোলারদের রীতিমতো তুলোধুনা করছিলেন। তবে এরপর টাইগার শিবির স্বস্তি এনে দেন রিশাদ হোসেন। টানা দুই ওভারে সেট দুই ব্যাটারকে ফিরিয়ে দেন এই লেগ স্পিনার। নবম ওভারের চতুর্থ বলে ২৮ বলে ৫১ রান করা ক্লেভারকে ফিরিয়ে ভাঙেন ৫০ বলে ৮৮ রানের জুটি ভাঙেন রিশাদ। এক ওভার পর আবার বল হাতে নিয়ে ফেরান ক্লার্ককে (৩৭ বলে ৫১)।
এই দুই উইকেটই ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরায়। এর প্রভাব ঠিকই পরেছে নিউজিল্যান্ডের দলীয় সংগ্রহে। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল ২০০ এর বেশি করবে তারা, সেখানে শেষ ৮ ওভারে ৭০ রান করতে পেরেছে। এর মধ্যে শেষদিকে ১৪ বলে ২৭ রানের ইনিংস খেলেন জস ক্লার্কসন।।
১৮৩ রান তাড়ায় বাংলাদেশের শুরুটা ভালো হয়নি। পাওয়ার প্লেতে সাইফ হাসানকে হারিয়ে ৪৪ রান তোলে টাইগাররা। আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম এদিন শুরু থেকেই ভুগছিলেন। অধিনায়ক লিটন কুমার দাসও এদিন উইকেটে থিতু হতে পারেননি। তিনি এবং তামিম ফেরেন মাত্র ১১ রানের ব্যবধানে। তখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ হয়তো ম্যাচ থেকে ছিটকেই গেলো।
কিন্তু উইকেটে এসে পালটা আক্রমণ করেন পারভেজ হোসেন ইমন। মুখোমুখি হওয়া প্রথম ১১ বলেই ২১ রান করেন তিনি। সবমিলিয়ে তার ব্যাট থেকে আসে ১৪ বলে ২৮ রানের ইনিংস। শুরুতে চাপে পড়া বাংলাদেশ ইমনের ব্যাটেই জয়ের দিশা খুজে পায়। ম্যাচ শেষে ম্যাচসেরা তাওহীদ হৃদয়ও প্রশংসা করলেন ইমনের।
তিনি বলেন, ‘কথায় আছে, অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যদি বেশি আগলে থাকেন, তাহলে হয় না। ইমন যেটা করেছে, পরিষ্কার ছিল কী করবে এবং ঠিক সিদ্ধান্তই (আক্রমণ) নিয়েছে। আর আমিও ওকে বলেছি একটু চেষ্টা করলে ভালো হয় (আক্রমণের)। শেষ পর্যন্ত ও পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পেরেছে।’
৪ নম্বরে নামা হৃদয় প্রথমে ইমনের সঙ্গে ৫৭, এরপর শামীম হোসেন পাটোয়ারীর সঙ্গে গড়েন ৪৯ রানের জুটি। শামীম খেলেন ১৩ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৩১ রানের ক্যামিও। ২৭ বলে ২ চার ও ৩ ছক্কায় ৫১ রান করে ম্যাচসেরা হন হৃদয়। সবমিলিয়ে হৃদয়ের সঙ্গে ইমন আর শামীমের জুটিই ম্যাচ জিতিয়েছে বাংলাদেশকে।
এসকেডি/এমএমআর