বাউন্ডারির বাইরে থেকে

‘আরে বলো কি, তামিম ইকবাল তো তোমাদের সহবাগ হতে পারে!’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৫৫ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

তিনি তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের পোস্টার বয় বনে গেছেন। বিশেষ করে জহির খানকে দু’পা বেরিয়ে ছক্কা হাঁকানোর ছবি আর ভিডিও তখন ঘরে ঘরে। ভারতের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে তার দুই সমবয়সী ও সহযোদ্ধা মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসান অর্ধশতক উপহার দিলেও তামিম ইকবালের নামটাই ছিল সবার মুখে মুখে। তাকে নিয়েই ওই ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর তুমুল আলোচনা।

চট্টগ্রামের খান পরিবারের তখনকার ছোট খানই তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত নাম।

ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ভারতের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি হাঁকানোর পথে তখনকার ভারতীয় দলের প্রধান স্ট্রাইক বোলার জহির খানকে ছক্কা হাঁকানোর কারণেই শুধু তামিম ইকবাল পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সফল সেনাপতি আকরাম খানের বড় ভাই, চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত মুখ, জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ ইকবাল খানের ছোট ছেলে আর বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ বিজয়ের অন্যতম রূপকার নাফিস ইকবালের ছোট ভাই হিসেবে তামিম ইকবাল ততদিনে একটা আলাদা পরিচিতি পেয়েও গিয়েছিলেন।

পাশাপাশি ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে ওল্ড ডিওএইচএসের হয়ে ফতুল্লা স্টেডিয়ামে ঝড়ের বেগে ১৮০ প্লাস ইনিংস খেলেও তামিম সাড়া জাগিয়েছিলেন। তখনই তামিম ইকবালকে সাদা বলে দেশের পরবর্তী এক নম্বর ব্যাটার ভাবতে শুরু করেছিলেন অনেকে।

তামিম তখন ওয়ানডে দলে নিয়মিতও হয়ে উঠেছিলেন; কিন্তু টেস্টে ডাক এলো তুলনামূলক বিলম্বে; ২০০৮ সালে। সেবার জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কিউইদের বিপক্ষে ডানেডিনে প্রথম টেস্টটি খেলেন তামিম ইকবাল।

টেস্ট অভিষেকের আগে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে তামিমকে নিয়ে অনেক বড় মন্তব্য করেছিলেন ভারতের সিনিয়র ক্রিকেট রিপোর্টার, রাইটার ও দুই বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেট লিখিয়ে দেবাশীষ দত্ত। ভারতীয় সাংবাদিকরাই তো বটেই, আমরাও যাকে ‘দেবু’ দা বলে ডাকি।

দেবু দার সঙ্গে আমার পেশাগত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কটা আরও গাঢ় হওয়ার একটি কারণও আছে। এক সময় তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের হয়ে নিয়মিত লিখতেন। দেবু দার অনেক লেখা দৈনিক জনকণ্ঠের খেলার পাতা, প্রথম পাতা ও শেষের পাতায় ফলাও করে প্রকাশিতও হয়েছে।

tamim

দেবু দা ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ কভার করতে ঢাকা এসেছিলেন। প্রথম টেস্ট ছিল শেরে বাংলায়। প্রেস বক্সে ঢুকেই দেবু দা আমায় ডেকে বললেন, ‘আরে বাবু ভাই, তোমরা তামিমরে খেলাও নাই ক্যান?’

পৈত্রিক পরিচয়ের সূত্রে দেবাশীষ দত্তের পূর্বপুরুষের দেশ আজকের বাংলাদেশ। তার বাবা বরিশালের সন্তান। সেই সূত্রে আমাদের সঙ্গে অনেক সময়ই বাংলাদেশের অ্যাকসেন্টে কথা বলতেন দেবু দা।

১৯ বছর আগের কথা। আমি তখন অত পরিণত হইনি। একটু পাকামো করে উত্তর দিতে গিয়ে ‘গুবলেট’ করে ফেললাম। বললাম, ‘দেবু দা, হয়েছেটা কি, তামিম তো ব্যাকরণ না মেনে একটু বেশি শটস খেলে। অনেক বেশি চালিয়ে খেলে, তাই তাকে টেস্ট দলে রাখা হয় না। হয়নিও। একদিনের সীমিত ওভারের জন্যই তাকে পারফেক্ট মনে হয়। তাই তাকে ভারতের সঙ্গে টেস্ট দলে রাখা হয়নি।’

ভাবলাম, আমি বোধহয় একটা ক্রিকেট পণ্ডিতের মতো ব্যাখ্যা দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু দেবু দা আমার ব্যাখ্যা আমলেই আনলেন না। উল্টো বলে উঠলেন, ‘আরে বলো কি! তোমরা তো টেস্টে কিছুই পারো না। সাকুল্যে দেড়শ থেকে দুইশ রান করো। একদিনও পুরো ব্যাট করতে পারো না। তামিম খেললে তো অন্তত একটি বা দুটি সেশন খেলত। তাতেই তামিম ওর মতো হাত খুলে খেলে যে ৬০-৭০ রান করে ফেলত। আর সেটাই তোমাদের কাজে দিত। স্কোরলাইন বড় হতো। তামিমের মারের তোড়ে প্রতিপক্ষ ফ্রন্টলাইন বোলারদের লাইন-লেন্থ নষ্ট হতো। তোমরা এক প্রান্তে কিছুটা সময় স্বস্তিতে থাকতে পারতে। কিছু রানও পেতে।’

আমাদের সহবাগ (বিরেন্দর শেবাগকে কলকাতার পত্রিকায় ওই নামেই ডাকে) যেমন শুরুতেই হাত খুলে খেলে রানচাকা সচল রাখতে শুরু করে, প্রতিপক্ষ বোলিংকে চেপে বসতে না দিয়ে উল্টো নিজে ডমিনেট করে দলকে ফ্রন্টফুটে নিয়ে যায়, তামিম খেললে তোমাদের, মানে টিম বাংলাদেশের, ঠিক সেই কাজটাই হবে। তোমরা লিখে-টিখে তামিমকে টেস্ট দলে ঢোকাও বাবু ভাই। He will be a very handy batter for Bangladesh Test team।’

কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ঠিক দুই মাস পর ২০০৭ সালের মে মাসে হওয়া ভারতের সঙ্গে ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে তামিম ইকবালকে টেস্ট চিন্তাতেই আনা হয়নি। অবশেষে বছর না ঘুরতেই ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে তামিম টেস্ট দলে ডাক পেলেন এবং নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে অভিষেক টেস্টেই উভয় ইনিংসে নিজের চেনা ছন্দে হাত খুলে হাফ সেঞ্চুরি (৮৮ বলে ৯ বাউন্ডারিতে ৫৩ ও ১২৮ বলে ১২ বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ৮৪) হাঁকিয়ে হইচই ফেলে দিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই সবাই তামিম ইকবাল বন্দনায় মেতে উঠলেন।

তারপর তামিমকে আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ফর্মের কারণে কোনোদিন বসতেও হয়নি। টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক ৫১৩৪ রান ও ১০ টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক হয়েই খেলা ছেড়েছেন তামিম ইকবাল। যত খেলেছেন, দাপটেই খেলেছেন। টেস্টে টিম বাংলাদেশের এক নম্বর ওপেনার হয়েই ছিলেন। দলের অন্যতম নির্ভরতাও ছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা, একজন আদর্শ টেস্ট ওপেনারের প্রতিমূর্তি ছিলেন তামিম ইকবাল। প্রথম জীবনে অনেক বেশি শটস খেললেও টেকনিক্যালি ছিলেন ‘সলিড’। ক্রিকেট ব্যাকরণের প্রায় সব শট খেলার সামর্থ্য ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, সাহস ছিল প্রচণ্ড। প্রতিপক্ষ বোলার কে, তা আমলে না এনে নিজের স্বভাবসুলভ ব্যাটিংটাই করতেন। কখনোই প্রতিপক্ষের ফ্রন্টলাইন বোলারদের চেপে বসতে দেননি। যে কারণে তামিম যতদিন ওপেনার হিসেবে খেলেছেন, ততদিন বাংলাদেশ টেস্টে শুরুতে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কম। বরং তামিমের সাহসী, আস্থাশীল ও আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং সব সময়ই বাংলাদেশের প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

তামিম ইকবাল টেস্টে আদর্শ ওপেনারের মতোই বাংলাদেশের টপ অর্ডারকে আগলে রেখেছেন। প্রতিপক্ষের ফাস্ট বোলারদের বোলিং তোড় থেকে নিজ দলকে রক্ষা করেছেন। একটা লম্বা সময় শুরুটা ভালো করতে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। নিজে রান করার পাশাপাশি দলকে শক্ত ভিত গড়ার কাজটিও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন তামিম ইকবাল।

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।