সাকিবের মতে যে কারণে ভালো খেলছে বাংলাদেশ

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:৪৮ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১২:২৩ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

ম্যাচ শেষে যখন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চলছিল ঠিক তখন শেরেবাংলার আউটফিল্ডের ভেতরে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের সামনে দুটি জটলা, যার একটির কেন্দ্রবিন্দু খালেদ মাহমুদ সুজন।

তার সঙ্গে তিন বোর্ড পরিচালক শেখ সোহেল, নাইমুর রহমান দুর্জয় আর ইসমাইল হায়দার মল্লিক এবং প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু।

আর ১০-১৫ গজ দূরে আরেক জটলায় বোর্ডের সিনিয়র পরিচালক জালাল ইউনুস, লোকমান হোসেন, সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী।

সুজনরা কথা বললেন। একপর্যায়ে সবাই একে একে খালেদ মাহমুদ সুজনের সঙ্গে এসে করমর্দণ করলেন। তাকে অভিনন্দন জানালেন , ‘ওয়েল ডান চাচা।’

খালেদ মাহমুদ সুজন সবার উষ্ণ ভালবাসা অভ্যর্থণায় সিক্ত হতেই পারেন। এখনো ত্রিদেশীয় আসর সবে মাঝপথে। এখনো অর্ধেকটা বাকি আছে। তবে হাথুরুসিংহের অবর্তমানে দায়িত্ব কাঁধে এখন পর্যন্ত শতভাগ সফল সুজন।

হাথুরুসিংহের চলে যাবার পর একটা অষ্ফুট সঙ্কটের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। অনেকেরই মনে জেগেছিল বড় প্রশ্ন, আচ্ছা হাথুরুর অনুপস্থিতিতে সুজন আর হ্যালসলরা কি হাল ধরতে পারবেন ?

দক্ষিণ আফ্রিকায় চরম বিপর্যয় আর বিধ্বস্ত অবস্থা কি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে ? অনেক বছর বিদেশি কোচদের কঠোর অনুশাসনে বেড়ে ওঠা মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ আর মুশফিকরা কি দেশি কোচ সুজনকে মানবেন? তাদের ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারবেন সুজন? নাকি ব্যর্থ হবেন? আর সঠিক দিক-নির্দেশনা আর কৌশল নির্ধারণের অভাবে দল আরও নিচের দিকে ধাবিত হবে?

বেশ কিছু প্রশ্ন উকি-ঝুকি দিচ্ছিল অনেকের মনেই। তবে আসর শুরুর আগের দিন অধিনায়ক মাশরাফি ভক্ত-সমর্থকদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, আমাদের ড্রেসিং রুম এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নির্ভার। আমরা অনেক বেশি স্বাধীনতাও উপভোগ করছি।’

টাইগার অধিনায়কের পাশে বসে একই প্রেস ব্রিফিংয়ে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের তকমায় দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ সুজন বলেছিলেন, সিনিয়র ক্রিকেটারদের ওপর অনেক কিছুই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা এখন পরিণত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে বেশ অনেক বছর। নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য ভালোই জানা সবার। কখন কি করতে হবে- সেটাও জানা হয়ে গেছে। তাই আমরা তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছি। আশা করছি মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজ থেকে তাগিদ অনুভব করবে, ভালো খেলে দলকে কার্যকর সার্ভিস দেবে।

এই যে সিনিয়র ও পরিণত ক্রিকেটারদের ওপর নির্ভরতা এবং তাদের নিজেদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া, সেটাই হাথুরুর সময় ছিল না। সিনিয়র আর জুনিয়র নেই, হাথুরু পুরো দলকে কঠোর অনুশাসনে রাখতেন। দায়িত্ব ও কর্তব্য ভাগ করে দিলেও কারো ওপর কিংবা সিনিয়রদের বাড়তি স্বাধীনতা দেয়া ব্যাপারে বড্ড কৃপণ ছিলেন হাথুরু। ঠিক সেই জায়গা থেকে সড়ে এসেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন।

সেই সিনিয়রদের ওপর নির্ভরতা এবং তাদের বাড়তি স্বাধীনতা দেয়া এবং নিজেদের মতো করে ভাবার ও সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সাকিবকে তিন নম্বরে খেলানোর সিদ্ধান্ত একান্তই খালেদ মাহমুদ, মাশরাফি আর সাকিবের বসে নেয়া। বলেই দেয়া যায়, যেটা কোনোভাবেই হাথুরু হয়ত সমর্থণ করতেন না।

তার মানে সুজন, হ্যালসল এবারের তিন জাতি আসরে কিছু নতুন চিন্তা-ভাবনা করেছেন। তাদের নেয়া পরিকল্পনা ও কিছু ছক বাংলাদেশের ভালো খেলার পেছনে রেখেছে বড় ভূমিকা।

আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় পাবার পর সাকিবের কাছে জানতে চাওয়া হলো এ আসরে ভালো খেলার রহস্য কী?

তার জবাবে অনেক কথার ভিড়ে সাকিব জানিয়ে দিলেন, দলের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। ‘ হ্যা নুতন কোচিং স্টাফ দায়িত্ব নিয়েছেন। চিন্তা-ভাবনা ও কৌশলেও নতুনত্ব এসেছে। যেহেতু আমাদের কোচের পরিবর্তন এসেছে, সবকিছু একটুতো ভিন্ন হবেই। যারা আমাদের পরিকল্পনা করেন তাদের চিন্তা-ভাবনায়ও পরিবর্তন এসেছে। তাদের নতুন কিছু চিন্তা-ভাবনা থাকবে।’

এটুকু বলেই থামেননি সাকিব। এরপরই একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপ বেরিয়ে এসেছে তার মুখ থেকে। ‘আমি বলবো না আগে আমরা স্বাধীনভাবে খেলতে পারতাম না। পারতাম। আগেও স্বাধীনতা ছিল। আমরা এখনো স্বাধীনভাবে খেলছি। আর পাশাপাশি সিদ্ধান্তও নিতে পারি। আমাদের কাছে মনে হয়, এটা একটা অ্যাডভানটেজ। সুজন ভাই আছেন, রিচার্ড আছেন, দুইজনই জানে আমাদের কী দরকার। দুইজনই এগুলো সরবরাহ করতে পারছেন, আমরা মাঠে পারফরম্যান্স করছি।’

ওপরের কথোপকথনে সাকিব বুঝিয়ে দিলেন, আগে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। সব সিদ্ধান্ত নিতেন কোচ হাথুরু। এখন নিজেরা স্বাধীনভাবে খেলার পাশাপাশি সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন। সেটাই তাদের ভালো খেলার পথে এগিয়ে দিয়েছে।

এই যে মাশরাফি, সাকিব ও তামিমদের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা প্রাপ্তি, তাতেই সম্প্রীতি, সংহতি বেড়েছে বহুলাংশে। আর কারো চাপিয়ে দেয়া নয়, নিজ থেকে ভালো খেলার তাগিদ ও ইচ্ছেও বেড়েছে বহুগুণে। আর সে কারণেই পরপর দুই খেলায় পুরো দল যেন এক পরিবার। সন্মিলিত পারফরমেন্স হচ্ছে। ব্যাটিং আর বোলিংয়েও কমবেশি সবার অবদান থাকছে।

এআরবি/জেডএ

আপনার মতামত লিখুন :