পাইলট-বাশারের স্মৃতিতে আমিরাতের অভিষেক ম্যাচ

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৩১ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

২৩ বছর পর আবার আরব আমিরাতে এশিয়া কাপ। তখনকার 'শিশু' বাংলাদেশ এখন পুরোদুস্তোর 'যুবা'। ওই আসরে শচিন টেন্ডুলকার, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সনাথ জয়সুুরিয়া, মুত্তিয়া মুরালিধরনদের খ্যাতি-যশ-নাম-ডাকের পাশে আকরাম খানের বাংলাদেশ ছিল নেহায়েত জীর্ণশীর্ণ ও দুর্বল।

ওই আসরে আকরাম খান (বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান), মিনহাজুল আবেদীন নান্নু (বর্তমান প্রধান নির্বাচক), আমিনুল ইসলাম বুলবুল (আইসিসির গেম ডেভেলপম্যান্ট ম্যানেজার), আতহার আলী (আন্তর্জাতিক টিভি ধারাভাষ্যকার)-এই চার সিনিয়র পারফরমারের সাথে আট তুর্কি তরুণ-জাভেদ ওমর, সাজ্জাদ আহমেদ শিপন, হাবিবুল বাশার সুমন, নাইমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাসুদ পাইলট, আনিসুর রহমান, হাসিবুল হোসেন শান্ত ও মোহাম্মদ রফিকের ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল।

১৯৯৫ সালের এশিয়া কাপে অভিষিক্ত আট ক্রিকেটারের তিনজন সুমন, পাইলট ও দুর্জয় পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়কও হয়েছিলেন। আজ ২৩ বছর পর মাশরাফির দল আবার আরব আমিরাতে এশিয়া কাপ খেলতে মাঠে নামছে। ছোট ভাইদের শুভকামনা জানিয়ে ওয়ানডে অভিষেকের স্মৃতিচারণ করেছেন হাবিবুল বাশার সুমন ও খালেদ মাসুদ পাইলট। জাগো নিউজের সাথে আজ একান্ত আলাপে তারা দুজন বলেছেন অনেক খোলা-মেলা কথা। আসুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক তাদের সেই স্মৃতিচারণ...

হাবিবুল বাশার সুমন
অভিষেকের কথা ভুলি কি করে? ওটা তো জীবনের এক অন্যরকম স্মৃতি। তবে সত্যি কথা বলতে কি, আমার অভিষেক ম্যাচের তেমন কোন স্মরণীয় স্মৃতি নেই। ভারতের সাথে প্রথম ম্যাচ খেলি নাই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেকেন্ড ম্যাচ খেলছিলাম। তখন শ্রীলঙ্কা দুর্দান্ত দল। অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা, জয়সুরিয়া, চামিন্দা ভাস আর মুরলিধরন- সব নামী তারকায় ভরা। আমি মনে হয় ১৭ রান করেছিলাম (আসলে ১৬ রান)। খুব নার্ভ কাজ করছিল। প্রথম ম্যাচের স্মৃতির চেয়ে সব দল একই হোটেলে থাকা আর স্টারদের খুব কাছ থেকে দেখার কথাই বেশি মনে অছে।

শুরুতে কখনো ভাবিনি আমি টেস্ট খেলবো, স্বপ্নেও ভাবিনি। ম্যাচের কোন স্মৃতি মনে নেই। কথা বলতে ভয় পেতাম। ছবি টবিও তুলিনি। শারজার ড্রেসিংরুম পাশাপাশি ছিল। আমি আসলে ওদের খেলা দেখেছি ড্রেসিং রুমে বসে বসে।

খালেদ মাসুদ পাইলট
আসলে জাভেদ ওমর, আমি, দুর্জয়, সুমন ও শান্ত তখন জাতীয় দলের হয়ে এক বছরের বেশি সময় ভালো খেলে এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে নজর কাড়া পারফরম করেই প্রথমবার জাতীয় দলে জায়গা পাই। প্রথম বার জাতীয় দলের হয়ে আমরা যখন ১৯৯৫ সালে এশিয়া কাপ খেলতে আরব আমিরাতের শারজা যাই, তখন ম্যানেজার ও শেফ দ্য মিশন ছিলেন সাবের ভাই (পরবর্তীতে বিসিবি সভাপতি ও জাতীয় সংসদ সদস্য)।

আমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, আমাদের অভিষেক হওয়া তরুণদের কাছে খেলার মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের স্মৃতিই জাগরুক আছে বেশি। না থেকে উপায় কি? আমাদের প্রতিপক্ষ দল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা তখন তারকায় ঠাসা। সেখানে আমরা ‘চুনোপুটি।’ ভারতে শচীন টেন্ডুলকার, মোহাম্মদ আজহার উদ্দীন, মাঞ্জেরকার। পাকিস্তান লাইন আপে ওয়াসিম আকরাম, সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম উল হক। আর শ্রীলঙ্কায় রানাতুঙ্গা, ডি সিলভা, জয়সুরিয়া। এদের বিপক্ষে খেলা ছিল রীতিমত পুলক জাগানো অনুভূতি। কারন আমরা তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার চেয়ে তাদের খেলা টিভিতেই দেখেছি বেশি।

সেই সব বিশ্ব তারকারা আমাদের বিপক্ষে খেলবেন, তা ভাবতেই অন্যরকম ভালো লাগায় আচ্ছন্ন ছিলাম। আমার মনে হয় আমরা তখনো স্কিল, টেকনিক ও ক্রিকেটীয় মেধায় খুব পিছনে ছিলাম না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ম্যাচ খুব কম খেলার কারণে মনের দিক থেকে আমরা প্রচন্ড দুর্বল ছিলাম। যে কারণে ডিফেন্সিভ ছিলাম বেশি। মনে আছে আমাদের তখনকার শেফ দ্য মিশন সাবের ভাই নানা ভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা জুুগিয়েছেন। ভালো খেলতে অনুপ্রাণিত করেছেন।

আমরা তখন শক্তি-সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতায় এতটাই পিছনে ছিলাম যে, জয়ের কথা ভাবা ছিল আকাশ কুসুম কল্পনা। আমাদের ভালো খেলতে সাবের ভাই নানা রকম বোনাস ঘোষণা করেছিলেন। বলেছিলেন অলআউট না হলেও থাকবে অর্থ পুরস্কার। আমরা পাকিস্তানের সাথে অলআউট না হয়ে অর্থ পুরস্কার পেয়েছিলাম।

মাঠের বাইরের অভিজ্ঞতাও ছিল প্রচুর। আমার এখনো মনে আছে আমরা চার দল একই হোটেলে ছিলাম। পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম আর তার স্ত্রী হোমাসহ আমরা হোটেল লবিতে একসাথে বসে অনেক গল্প করেছি। নির্মল আড্ডা দিয়েছি। সেই স্মৃতিটা আমার মনে গেঁথে আছে। এখন বিশ্ব তারকাদের সাথে বসে চা খাওয়া, লাঞ্চ ও ডিনার করা এবং হোটেল লাউঞ্জে আড্ডা দেয়া নেহায়েতই সাধারণ ঘটনা। তবে আমাদের যখন অভিষেক ঘটে তখন ছিল অনেক বড় ঘটনা। কারণ আমরা শচিন, ওয়াসিম আকরাম, সাঈদ আনোয়ার, রানাতুঙ্গা, ডি সিলভা ও জয়সুরিয়াদের তার আগে শুধু টিভিতেই দেখতাম। তাদের সাথে খেলার আগে তাদের খুব কাছ থেকে দেখা ও একই হোটেলে থাকতে পারাও ছিল অন্যরকম ভালো লাগা।

আমার নিজের শুধু নয়, ১৯৯৫ সালের এশিয়া কাপ আমার কাছে অন্য কারণে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে। ঐ আসরে আমাদের সাত- আটজনের (আটজনের) অভিষেক হয়েছিল। যার মধ্যে জাভেদ ওমর, সুমন (হাবিবুল বাশার), দুর্জয়, আমি আর রফিক দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলতে পেরেছি। মানে সার্ভিস দিয়েছি। এক সঙ্গে এক আসরে অভিষেক হওয়া আমরা ঐ কজন অন্তত পরের সাত আট বছর ছিলাম বাংলাদেশ দলের নিউক্লিয়াস। এক সিরিজ বা আসরে অভিষেক হওয়া এতগুলো ক্রিকেটারের এত দীর্ঘ সময় একটানা ভালো খেলা এবং জাতীয় দলের মূল চালিকাশক্তি হওয়ার নজির খুব কম।

এআরবি/এমএমআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :