এবারও অপ্রতিরোধ্য দিদার বলী
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলার ১০৬তম আসরের চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী। এ নিয়ে জব্বারের বলী খেলায় দ্বাদশবারের মত চ্যাম্পিয়ন হলেন দিদার। শনিবার ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অলি বলীকে ৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে পরাজিত করে শিরোপা ধরে রাখেন দিদার।
এর আগে সেমিফাইনালে মাত্র এক মিনিটে গত বছরের রানার্সআপ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের হাবিবুর রহমান বলীকে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠেন দিদার বলী। অপর সেমিফাইনালে অলি বলী কক্সবাজার মহেশখালীর হাশেমকে পরাজিত করতে সময় নেন সাড়ে চার মিনিট।
খেলায় অংশ নিতে বিভিন্ন বয়সের বলীরা আসেন চট্টগ্রামের বাকলিয়া, ফিরিঙ্গিবাজার, পতেঙ্গা, রাউজান, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড, পটিয়া, বাঁশখালী, কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান, কুমিল্লা, ভোলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
সারাদেশ থেকে আসা ১৫ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৭৮ জন বলী প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডে অংশ নেন। এ প্রতিযোগিতায় যেমন লড়েছেন ফটিকছড়ি উপজেলার করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বেলাল তেমনি রাঙ্গুনিয়ার সফরঘাটা থেকে আসা ৭৯ বছরের নুরচ্ছাফা বলী। ৭৮ জন বলীর মধ্যে থেকে নক আউট ভিত্তিতে রাখা হয় ৪০ জনকে। সর্বশেষে শুরু হয় চ্যালেঞ্জ রাউন্ড। এতে অংশ নেন রামুর দিদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অলি, নারায়ণগঞ্জের হাবিবুর রহমান, মহেশখালীর হাশেম।
শনিবার দুপুর থেকেই লালদীঘির ময়দানে আসতে শুরু করেন বলীখেলার প্রতিযোগীরা। দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ময়দান। এছাড়া লালদীঘির ময়দানের আশপাশের সবগুলো ভবনের ছাদে অবস্থান নেন কৌতূহলী দর্শক। ঢাকঢোল বাজিয়ে বলীখেলার মঞ্চের চারপাশে ঘুরছিলেন বাদক দল। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ঢোলের তালে তালে শুরু হয় জব্বারের বলী খেলা।
খেলা পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর আবদুল মালেক। খেলা উদ্বোধন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আয়োজক কমিটির সভাপতি জহরলাল হাজারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলালিংকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক সৌমেন মিত্র, নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) কামরুল আমিন, জব্বারের নাতি শওকত আনোয়ার প্রমুখ।
জয়ের পর রামুর দিদার বলী বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমাকে একবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। ওই সময় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে না পারার বেদনা এখনো আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আমার ভাগ্য সব সময় সুপ্রসন্ন হয়। অংশগ্রহণ করতে পারলেই জয়ী হতে পারি।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যেকবার আশা নিয়ে আসি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। এজন্য সারা বছর পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করি শুধু লালদীঘির মাঠে সেরাটা প্রদর্শন করার জন্য। আল্লাহ তাই আমাকে বারবার জয়ী করেন।’
পরাজয়ের পর রানার্সআপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অলি বলী বলেন, সেমিফাইনালে অনেক সময় নিয়ে খেলেছি। সঙ্গে সঙ্গে আবার ফাইনাল খেলা শুরু হয়েছে। আর দ্রুত খেলা শেষ করার জন্য পরিচালক বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। তাই দিদার বলী আমাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, ‘এবারসহ তিনবারের মতো খেলতে এসেছি। জয়ী হতে না পারলেও রানার্সআপ হয়ে আমি আনন্দিত।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘জব্বারের বলী খেলা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। আর এ ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে আছে বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হচ্ছে সুখী ও সমৃদ্ধশালী, শান্তিপ্রিয় জনপদ। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এ চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয়েছে। ইনশাল্লাহ এ ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা অব্যাহত থাকবে।’
উল্লেখ্য, ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে স্থানীয় বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এ কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারেই এ খেলার নামকরণ করা হয় ‘জব্বারের বলী খেলা’।
এদিকে জব্বারের ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা উপলক্ষ্যে শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের বৈশাখী মেলাও। নগরীর লালদীঘির মাঠকে ঘিরে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে এ মেলা।
এমজেড/আরআই