যে গল্পে শান্ত-মুমিনুল দুই ভূমিকায়

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:৩৩ পিএম, ০৮ মে ২০২৬

২০২৬ সালের ৮ মে হতে পারতো সাফল্যের সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো এক দিন। দুই সেঞ্চুরির গল্পে সাজানো এক স্মরণীয় দিন। কিন্তু তা আর হলো না।

বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরির দিন হয়েই থাকলো আজ ঢাকা টেস্টের প্রথম দিন। সাথে মুমিনুল হকের নিশ্চিতপ্রায় শতক হাতছাড়ার ট্র্যাজেডিটাও মিশে গেল।

তবে এই দুই বিপরীতমুখী গল্পটাকে এক করতে গিয়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন মিরপুর টেস্ট কভার করা সাংবাদিকরা। অনেকেই লেখার উপজীব্য তৈরি করে রেখেছিলেন। যেখানে শান্তর শতরানের পর মুমিনুলের সেঞ্চুরির গল্পের মিশেল ছিল।

কিন্তু শতক থেকে মুমিনুল হক মাত্র ৯ রান দূরে আউট হওয়ার পর তা পাল্টাতে হলো। এখন ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনের কাহিনীর নায়ক হয়ে থাকলেন বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। আর মুমিনুল হয়ে থাকলেন ‘ট্র্যাজেডি কিং।’

টেস্টে খুব দারুণ সময় কাটছে টাইগার টেস্ট ক্যাপ্টেনের। শেষ ১১ মাসে ৫ টেস্টে ৮ বার ব্যাট করে চারটি সেঞ্চুরি। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গত জুনে গল টেস্টে উভয় ইনিংসে (১৪৮, ১২৫*) শতকও আছে। তারপর নভেম্বরে সিলেটে আয়ারল্যান্ডের সাথে টেস্ট ম্যাচটি ভালো কাটেনি। যথাক্রমে ৮ আর ১ রানে ফিরে গেছেন। কিন্তু মিরপুর টেস্টের প্রথম ইনিংসেই সে ঘাটতি পুষিয়ে নিলেন শান্ত।

টেস্টে এটা তার নবম সেঞ্চুরি। কিন্তু অনেকের চোখে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার আলোকে আজ পাকিস্তানের সাথে ১০১ রানের ইনিংসটিই শান্তর সবচেয়ে দাপুটে শতক।

ক্রিকেটের, বিশেষ করে টেস্টের খুঁটিনাটি তথ্য-উপাত্ত যাদের নখদর্পণে, তারা হয়তো বলবেন, টেস্টে শান্তর এরচেয়ে আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক সেঞ্চুরি আছে।

যেমন ২০২১ সালের হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটে ১১৮ বলে ওয়ানডের মেজাজে খেলে হাফ ডজন ছক্কা ও ৫ বাউন্ডারিতে ৯৯.১৫ স্ট্রাইক রেটে ১১৭ রানের দারুণ ইনিংস খেলার রেকর্ড আছে।

এর বাইরে এই শেরে বাংলায় ২০২৩ সালের জুনে আফগানিস্তানের সাথে ৮০+ স্ট্রাইক রেটে এক টেস্টের উভয় ইনিংসে শতরানের (৮৩.৪২ স্ট্রাইক রেটে ১৪৬ আর ৮২.১১ স্ট্রাইক রেটে ১২৪ রানের) কৃতিত্ব দেখিয়েছেন শান্ত। সেখানে আজকের শতকটি ৭৭.৬৯ স্ট্রাইক রেটে করা।

শুক্রবারের সেঞ্চুরিটিই টেস্টের এক ইনিংসে শান্তর সবচেয়ে বেশি বাউন্ডারি দিয়ে সাজানো নয়। টেস্টে এক ইনিংসে শান্তর ব্যাট থেকে সবচেয়ে বেশি ২৩টি বাউন্ডারিও আছে। ১৭ বার মাটি কামড়ে সীমানার ওপারে পাঠানোর রেকর্ড আছে। ১৫টি করে চারের মারও আছে দুইবার।

সেখানে আজ ১০১ রান করতে শান্ত হাঁকিয়েছেন এক ডজন বাউন্ডারি ও ২ ছক্কা। তাহলে আজকের ইনিংসটিকে সবচেয়ে দাপুটে বলা হচ্ছে কেন?

বলা হচ্ছে এই কারণে যে, শান্ত যখন উইকেটে যান, তখন বাংলাদেশ মোটেই ভালো অবস্থায় ছিল না। দুই ওপেনার সাদমান আর মাহমুদুল হাসান জয় সাজঘরে। বোর্ডে রান মোটে ৩১।

পাকিস্তানের ৩ দ্রুতগতির বোলার শাহিন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ আব্বাস আর হাসান আলির বল দুই দিকেই মুভ করছিল। তখন আর একটি উইকেট বেশি পড়লে হয়তো দিনের খেলার চালচিত্র ভিন্ন হতে পারতো। ওই রকম পরিস্থিতিতে সবার আগে দরকার ছিল উইকেটে থিতু হওয়া। মানে বেশি সময় ক্রিজে পড়ে থাকা। নাজমুল হোসেন শান্ত আর মুমিনুল হক ঠিক ওই কাজটিই করেছেন। বড় জুটি গড়ে। লক্ষ্য এক থাকলেও দুইজনের চলার গতি ছিল ভিন্ন।

এরকম অবস্থায় মুমিনুল হককে নিয়ে জুটি গড়ে ইনিংসের প্রাথমিক ক্ষত সারায় মনোযোগী হতে গিয়ে শান্ত নিজের মতো করে খেলেছেন। কিছুটা সময় উইকেট আগলে একসময় পাকিস্তানি বোলারদের ওপর চড়াও হয়েছেন। পাকিস্তানের যে দুই পেসারের বলে মুভমেন্ট বেশি, সেই আব্বাস ও হাসান আলীকে ইমপ্রোভাইজ করে খেলে তাদের লাইন ও লেংথ নষ্ট করে দিয়েছেন।

কখনো পপিং ক্রিজের ফুট দুয়েক সামনে দাঁড়িয়ে খেলেছেন। আবার কখনো বোলার রানআপ থেকে দৌড় শুরুর পর নিজে কয়েক পা সামনে এগিয়েও হাফ ভলি বানিয়ে ড্রাইভ খেলার চেষ্টা ছিল। ওভাবে খেলেই পাকিস্তানি বোলারদের চেপে বসতে দেননি শান্ত।

অপর প্রান্তে মুমিনুল ছিলেন অনেক বেশি সতর্ক, সাবধানী, সংযত। শট খেলার চেয়ে ইনিংসের একদিক আগলে উইকেটে পড়ে থাকাই ছিল মুমিনুলের লক্ষ্য।

একদিকে শান্তর আগ্রাসন, অন্যদিকে মুমিনুলের সতর্ক, সাবধানী ও সংযত ব্যাট চালনা—আর তাতেই গড়ে ওঠে ১৭০ রানের বড় জুটি। শুরুর ধাক্কা সামলে যা গড়ে দেয় টাইগারদের মজবুত অবস্থান। তাই দিন শেষে শান্ত বাহিনীর স্কোর ৪ উইকেটে ৩০১।

এআরবি/এমএমআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।