মুস্তাফিজুরের বেড়ে ওঠার গল্প


প্রকাশিত: ১০:৪৬ এএম, ২০ জুন ২০১৫

ভারতের বিপক্ষে অভিষেকেই জয়ের নায়ক বনে গেলেন পাতলা লিকলিকে শরীরের মুস্তাফিজুর রহমান। প্রথম দর্শনে তাকে পেস বোলার হিসেবে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও বাঁ-হাতি এই পেসারের তোপেই ভারতের বিপক্ষে ৭৯ রানের বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ তে অভিষেকে যোগ্যতার প্রমাণ রাখা ১৯ বছর বয়সী এই বোলার ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে দেখা দিলেন আরো উজ্জ্বল হয়ে। সেই উজ্জ্বলতার ফলও পেলেন অভিষেকেই ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়ে। জাতীয় দলের খেলার পর তিনি সাতক্ষীরাবাসীর নয়নের মনি হয়ে উঠেছেন। নানান কৌতুহল জন্ম নিয়েছে তাকে ঘিরে। মুস্তাফিজুরের বাড়িতে চলছে আনন্দ উৎসব। সবাই তার বাবা মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, অভিবাদন জানাচ্ছেন।

আজ বলবো সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসা মুস্তাফিজের জানা অজানা অনেক কথা।

সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের ছেলে মুস্তাফিজ। ব্যবসায়ী বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম গাজী, মা মাহমুদা খাতুনের শেষ ছেলে মুস্তাফিজ ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন। চার ভাই ও দুই বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা তার।

তবে ক্রিকেট পরিবারে জন্ম নেওয়া মুস্তাফিজের ক্রিকেট খেলায় আসার পেছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান অনেকটাই।  তার বড় ভাই এক সময় ক্রিকেট খেলতেন, মেজ ভাইও কম যান না, আর সেজ ভাই এখনও ক্রিকেট খেলেন।

সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান পল্টু জাগো নিউজকে জানান, এই তো বছর পাঁচেক আগের কথা। সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে বাছাই পর্বে মুস্তাফিজ নজর কাড়ে সবার।

এরপর জেলা পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট খেলায় সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম মাঠে নামেন মুস্তাফিজুর রহমান। পড়াশোনায় অতটা মন তাঁর কখনোই ছিল না। স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলতে যেতেন তিনি। বাসায় তো বলেই দিয়েছিলেন, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তোমরা আর জোর করো না। এরপর থেকে ক্রিকেটই তার ধ্যানজ্ঞান। কালিগঞ্জের বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্র্যাকটিস করতেন মুস্তাফিজ।

সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের প্রতিভা। এরপর জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু। তবে জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশিদিন তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার জন্য।

বছর তিনেক আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এলে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভবনার দ্রুতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। তার ঝুলিতে ছিল ৯ উইকেট। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী।

গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। রীতিমতো চমক দেখিয়েছিলেন তিনি। মুস্তাফিজ প্রথম শ্রেণিতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। এই তো ছয় মাস আগে অভিষেক হয়েছে ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে।
অভিষেক ম্যাচের চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্স নতুন দিনের বাংলাদেশ দলে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবে বলেই পূর্বাভাস দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায় নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভুত হলেন এই তরুণ পেসার।

ছোট্ট এ ক্যারিয়ারে উজ্জ্বল পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে মুস্তাফিজ কতটা প্রতিভাধর। এখন সে প্রতিভার বিকাশ দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ। ১৯বছর বয়সী মুস্তাফিজ সে আশার গানই শোনালেন অভিষেকে। বাঁহাতি পেসারের যে ঘাটতি অনুভব করছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, তা হয়তো পূরণ করতে সক্ষম হবে এই সাতক্ষীরা এক্সেপ্রেস। মুস্তাফিজের স্বপ্ন পূরণে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন তার বাবা মাসহ গোটা জেলাবাসী।

মুস্তাফিজের সাথে ফোনে কথা বললে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, দলে টিকে থাকতে হলে ভালো পারফমেন্স করতে হবে। না হলে দলে থাকা যাবে না। তিনি আরো বলেন, পরের ম্যাচগুলোতে খেলার সুযোগ পেলে তিনি আরো ভালো কিছু দেবেন। তিনি সাতক্ষীরাবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

মুস্তাফির রহমানের ক্রিকেট কোচ আলতাফ হোসেন বলেন, সৌম্য এবং মুস্তাফিজ দু’জনই আমার ছাত্র। দু’জনই যে একসাথে জাতীয় দলে খেলছে, একজন বোলার আরেকজন ব্যাটসম্যান, এর চেয়ে আনন্দের কিছু হতে পারে না।

মুস্তাফিজের আরেক কোচ তপু বলেন, মুস্তাফিজের সেজ ভাই তাকে অনূর্ধ্ব ক্যাম্পে নিয়ে আসে।  প্রথমেই তার বোলিং দেখে বুঝেছিলাম সে ভালো করবে। সে তো প্রথমে ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম বোলার হওয়ার জন্য। আমার ছাত্র জাতীয় দলে খেলছে এতে আমি গর্বিত।

দলে টিকে থাকার বিষয়ে মুস্তাফিজের বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম আবেগ জড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। তিনি আরো বলেন, মুস্তাফিজ আজকে আমার একার ছেলে নয়, গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের রণাঙ্গনে সে লড়বে। তিনি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।

এমআর/আরআই/এসআরজে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।