এস্তাদিও আজতেকা

যে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন পেলে-ম্যারাডোনা

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ পিএম, ১৮ মে ২০২৬

মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘এস্তাদিও আজতেকা’ শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের জীবন্ত এক অধ্যায়। ১৯৬৬ সালে উদ্বোধন হওয়া এই স্টেডিয়ামটি যুগে যুগে ফুটবল কিংবদন্তিদের সাক্ষী হয়েছে। পেলে থেকে দিয়েগো ম্যারাডোনা—বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর অনেকটাই জন্ম নিয়েছে এই মাঠে।

মেক্সিকো সিটির কোয়োআকানে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি ক্লাব আমেরিকা এবং মেক্সিকো জাতীয় ফুটবল দলের অফিসিয়াল হোম ভেন্যু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার (৭,২০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৮৭,৫২৩। এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল স্টেডিয়াম।

বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ও আইকনিক ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এস্তাদিও আজতেকা, ইতিহাসের প্রথম স্টেডিয়াম যেটি দুটি ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন করেছে। ১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনালে এখানে ব্রাজিল ইতালিকে ৪-১ গোলে হারায় এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে।

এছাড়া ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচটিও এখানে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দিয়েগো ম্যারাডোনা করেন বিখ্যাত সেই ‘হাতের গোল’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’।

এস্তাদিও আজতেকা বিশ্বের একমাত্র ফুটবল স্টেডিয়াম যেখানে পেলে (১৯৭০) এবং দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬) ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন। স্টেডিয়ামটি আরও আয়োজন করেছিল ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’, যেখানে ১৯৭০ বিশ্বকাপের এক সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ইতালি পশ্চিম জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারায়।

১৯৬৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রধান ভেন্যু হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল এই স্টেডিয়াম। এছাড়া ১৯৭১ নারী বিশ্বকাপও এখানে অনুষ্ঠিত হয়।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত হবে মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী ম্যাচ। ফলে এটি হবে ইতিহাসের একমাত্র স্টেডিয়াম, যেখানে তিনটি পৃথক ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজিত হবে।

ইতিহাস

মেক্সিকো ১৯৬৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আয়োজক হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আদোলফো লোপেস মাতেওসের সময়ে একটি বড় ক্রীড়া ভেন্যু হিসেবে এস্তাদিও আজতেকার পরিকল্পনা করা হয়। অলিম্পিক ফুটবল ফাইনালও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

স্টেডিয়ামটির নকশা করেন স্থপতি পেদ্রো রামিরেস ভাসকেস এবং রাফায়েল মিজারেস আলকেরেকা। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালে।

১৯৬৬ সালের ২৯ মে ক্লাব আমেরিকা ও ইতালির তোরিনো এফসির মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন হয়। তখন ধারণক্ষমতা ছিল ১,০৭,৪৯৪ দর্শক। প্রথম গোল করেন ব্রাজিলিয়ান আরলিন্দো দস সান্তোস এবং দ্বিতীয় গোল করেন ব্রাজিলিয়ান হোসে আলভেস। পরে ইতালিয়ানরা সমতা ফেরায় এবং ম্যাচটি ২-২ ড্র হয়।

Stadio Azteca

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো দিয়াস অর্দাস উদ্বোধনী কিক করেন এবং ফিফা সভাপতি স্যার স্ট্যানলি রাউস তখন অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

১৯৬৬ সালের ৫ জুন আধুনিক আলোকসজ্জা ব্যবস্থা উদ্বোধন করা হয়। প্রথমবার রাতের ম্যাচে স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়া সিএফ মুখোমুখি হয় নেকাক্সার। ম্যাচের প্রথম গোল করেন ভ্যালেন্সিয়ার হন্ডুরান ফুটবলার হোসে কার্দোনা। ‘কানিয়া ব্রাভা’ নামে পরিচিত রবার্তো মার্তিনেজ নেকাক্সার হয়ে গোল করে স্টেডিয়ামে প্রথম মেক্সিকান গোলদাতা হন। ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়া ৩-১ ব্যবধানে জয় পায়।

১৯৭৮ সালে স্টেডিয়ামটি কোপা ইন্টারআমেরিকানার ফাইনাল আয়োজন করে, যেখানে আমেরিকা মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্সের। ১৯৯০ সালে আবারও এখানে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়, তখন আমেরিকার প্রতিপক্ষ ছিল প্যারাগুয়ের ক্লাব অলিম্পিয়া।

এস্তাদিও আজতেকাই সেই স্টেডিয়াম, যেখানে পেলে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনা যথাক্রমে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন।

সংগীত ও অন্যান্য অনুষ্ঠান

ইতিহাসজুড়ে স্টেডিয়ামটি নানা সংগীতানুষ্ঠানের ভেন্যু হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। মাইকেল জ্যাকসন (১৯৯৩ সালে পাঁচটি হাউজফুল শো), মেনুদো (১৯৮৩), ইউটু (২০০৬ ও ২০১১), লুইস মিগেল (২০০২), পল ম্যাককার্টনি (২০১২ ও ২০১৭), এলটন জন, মানা, হুয়ান গ্যাব্রিয়েল, গ্লোরিয়া এস্টেফান, জাগুয়ারেস, লেনি ক্রাভিটজ, হ্যানসন, আনা গ্যাব্রিয়েল এবং দ্য থ্রি টেনরসসহ অনেক তারকা এখানে পারফর্ম করেছেন।

স্টেডিয়ামটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও ব্যবহৃত হয়েছে। ২০০৬ সালে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফেলিপে কালদেরনের নির্বাচনী প্রচারণার সমাপনী অনুষ্ঠানও এখানে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া জেহোভাস উইটনেস কনভেনশন এবং ১৯৯৯ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয়ের উপস্থিতিও ছিল এখানে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ও সংস্কার কাজ

২০২০ সালের জুনে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে মেক্সিকো সিটিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক শহর হিসেবে ঘোষণা করে। মেক্সিকোর তিনটি এবং পুরো টুর্নামেন্টের ১৬টি আয়োজক শহরের একটি এটি।

২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয়, ১১ জুন ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ এই স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে খেলতে নামবে স্বাগতিক মেক্সিকো। মোট পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এখানে: তিনটি গ্রুপ ম্যাচ, একটি রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচ এবং একটি রাউন্ড অব ১৬ ম্যাচ। মেক্সিকো যদি গ্রুপ ‘এ’ চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে তাদের চারটি ম্যাচই এখানে হবে।

অর্থায়ন ও প্রবেশসংক্রান্ত সমস্যার কারণে একাধিকবার বিলম্বিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের মে মাসে স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য বন্ধ করা হয়। দর্শক ধারণক্ষমতা ৮৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮৭ হাজার ৫০০ করা হয়, নতুন ভিডিও স্ক্রিন বসানো হয় এবং হাইব্রিড টার্ফ স্থাপন করা হয়।

সংস্কার পরিকল্পনার মধ্যে ছিল স্টেডিয়ামের বাইরের অংশ নবায়ন, এলইডি লাইটিং স্থাপন, নতুন ড্রেসিংরুম ও খেলোয়াড়দের টানেল নির্মাণ। পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে উচ্চ রেজুলেশনের এলইডি স্ক্রিন বসানো এবং আসন পরিবর্তনের কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। গ্যালারির নিচের বিশেষ লাউঞ্জগুলো সরিয়ে অতিরিক্ত আসনের জায়গা তৈরি করা হয়।

২০২৬ সালের ২৮ মার্চ মেক্সিকো ও পর্তুগালের মধ্যকার প্রীতি ম্যাচ দিয়ে পুনরায় খুলে দেওয়া হয় স্টেডিয়ামটি। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। ম্যাচপূর্ব অনুষ্ঠানের সময় একটি বক্স স্যুট থেকে পড়ে এক দর্শকের মৃত্যু হয়।

নামকরণ

‘আজতেকা’ নামটি মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাখা হয়। বর্তমানে স্টেডিয়ামটির মালিক মেক্সিকান মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠান টেলেভিসা।

১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে ফিফা নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি গিয়ের্মো কানিয়েদো দে লা বারসেনার সম্মানে টেলেভিসা স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ‘এস্তাদিও গিয়ের্মো কানিয়েদো’ রাখা হয়। তবে সাধারণ মানুষের অপছন্দের কারণে পরে আবার ‘এস্তাদিও আজতেকা’ নামেই ফিরে যায় টেলেভিসা।

স্টেডিয়ামটির আরেকটি জনপ্রিয় ডাকনাম ‘কলোসো দে সান্তা উরসুলা’ (সান্তা উরসুলার দৈত্য), কারণ এর বিশাল কাঠামো এবং এটি সান্তা উরসুলা এলাকায় অবস্থিত।

২০২৫ সালের ১৪ মার্চ বানোর্তে স্টেডিয়ামের নামকরণের স্বত্ব কিনে নেয়, যা ২০২৬ বিশ্বকাপ সংস্কারকাজে অর্থায়নে সহায়তা করে। এরপর নাম বদলে রাখা হয় ‘এস্তাদিও বানোর্তে’। তবে নতুন নামটি ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে।

ফিফার করপোরেট স্পন্সরশিপ নীতিমালার কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামটির নাম হবে ‘মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম’।

স্মৃতিফলক ও স্মারক

স্টেডিয়ামে ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানির ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’ ম্যাচ এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’” স্মরণে একটি ব্রোঞ্জ স্মারক ফলক রয়েছে। এছাড়া উদ্বোধনী ম্যাচের প্রথম গোলদাতা এবং প্রথম রাতের ম্যাচের প্রথম গোলদাতার নাম সংবলিত স্মারক ফলকও রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ইভেন্ট: ফিফা বিশ্বকাপ

এস্তাদিও আজতেকা দুইবার ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে এবং মোট ১৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে এখানে। ১৯৭০ বিশ্বকাপে এখানে ১০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ফাইনালও ছিল।

১৬ বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে এখানে ৯টি ম্যাচ হয়, যার মধ্যে ছিল ফাইনালও। ফলে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজনকারী স্টেডিয়ামে পরিণত হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপেও এস্তাদিও আজতেকায় ম্যাচ হবে, যার মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি হবে ইতিহাসের একমাত্র স্টেডিয়াম, যেখানে তিনটি পৃথক ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এস্তাদিও আজতেকা: বিশ্বকাপ ২০২৬ সূচি

* সব ম্যাচের সূচি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী।

গ্রুপ পর্ব
১১ জুন, মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা, রাত ১টা (১২ জুন)
১৭ জুন, উজবেকিস্তান-কলম্বিয়া, সকাল ৮টা (১৮ জুন)
২৪ জুন, চেক প্রজাতন্ত্র-মেক্সিকো, সকাল ৭টা (২৫ জুন)

নকআউট (শেষ ৩২)
৩০ জুন, ম্যাচ-৭, সকাল ৭টা (১ জুলাই)

নকআউট (শেষ ১৬)
৫ জুলাই, ম্যাচ ৪, সকাল ৬টা (৬ জুলাই)

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।