গৃহযুদ্ধ থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে স্পেন!

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা মস্কো, রাশিয়া থেকে
প্রকাশিত: ০৫:১২ পিএম, ১৪ জুন ২০১৮ | আপডেট: ০৫:৫০ পিএম, ১৪ জুন ২০১৮

ইউরোপিয়ান মিডিয়া একে ‘স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ)’ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। না, বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যে কোনো যুদ্ধ নয়। কিংবা কাতালুনিয়ার স্বাধীনতার দাবি নিয়েও রাশিয়ার রেড স্কয়ারে কেউ আন্দোলন-সংগ্রাম করছে না। গৃহযুদ্ধটা লাগিয়ে দিয়েছে মূলতঃ রিয়াল মাদ্রিদ। রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে। জিনেদিন জিদানের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে স্পেন কোচ হুলেন লোপেতেগুইয়ের নাম ঘোষণা করে।

rafikবিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুইদিন আগে এমন আত্মঘাতি ঘোষণা দেয়াটা সম্ভবত, ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারেরই ফসল। রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ নিজেকে হয়তো স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর মনে করেছেন। এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বকাপে স্পেন দলের জন্য।

স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লুই রুবিয়েলেস বিষয়টাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। মস্কো থেকে তাই তিনি দ্রুত বিমান নিয়ে চলে গেলেন ক্রাসনোদারে। যেখানে ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছে স্পেন ফুটবল দল। সেখানে গিয়ে তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বললেন। আলাচনা করলেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। যদিও দলের ভেতর থেকে তুমুল প্রতিবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। খেলোয়াড়রা অনুরোধ করেছেন; কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল নড়লেন না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই ঘোষণা দিলেন, লোপেতেগুই বহিস্কার।

বিশ্বকাপের ঠিক একদিন আগে আর নিজেদের মাঠে নামার ঠিক দু’দিন আগে এভাবে কোচকে বরখাস্ত করার নজির ফুটবল ইতিহাসে আর নেই। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ আর স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট লুই রুবিয়েলেসের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে গিনিপিগ হয়েছেন কেবল স্পেনের সদ্য বিদায়ী কোচ হুলেন লোপেতেগুই।

যদিও রিয়াল মাদ্রিদ ভিত্তিকই আরেকজনকে নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্পেন। ফার্নান্দো হিয়েরো। রিয়ালের সাবেক অধিনায়ক। সর্বশেষ স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আপতকালীন হিসেবে তার হাতেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে ইনিয়েস্তা-রামোস-পিকেদের দায়িত্ব। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে যে ঝড় বয়ে গেছে, কিংবা বয়ে যাচ্ছে- তাতে কী একটি দেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন অচীরেই শেষ হয়ে গেলো না! যারা কি না বিশ্বকাপের টপ ফেবারিটদের একজন? এমন প্রশ্ন এখন ফুটবল দুনিয়ায়।

স্পেনের কিংবদন্তি সাংবাদিক হোসে মারিয়া গার্সিয়া রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এবং কোচ হুলেন লোপেতেগুইকে অভিহিত করেছেন দেশদ্রোহী হিসেবে। গার্সিয়া মনে করেন, এ দু’জন দেশের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে কোনো ক্লাবের কোচ হিসেবে কোনো জাতীয় দলের কোচের নাম ঘোষণা করাটা মোটেও ঠিক হয়নি।

সব মিলিয়ে ১৯ থেকে ২৪ ঘণ্টার একটা শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থা পার করেছে স্পেন। এরই মধ্যে ঘটে গেছে মহা ভূমিকম্প। বরখাস্ত করা হয় কোচকে। নতুন কোচেরও নিয়োগ হয়ে গেলো। সব মিলিয়ে এখন খুবই শান্ত পরিবেশ। এই শান্ত পরিবেশ দেখেই ফ্রান্স সেনসেশন কাইলিয়ান এমবাপে বলে দিয়েছেন, ‘এই স্পেনও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ফেবারিট।’

অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে ঐক্যের ডাক দিয়েছে অধিনায়ক সার্জিও রামোস। যদিও তিনি লোপেতেগুইকে বরখাস্ত না করার জন্য সরাসরি দ্বারস্থ হয়েছিলেন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লুই রুবিয়েলেসের। তবুও, বিশ্বকাপে দলের স্বার্থে, ঐক্যটা খুবই জরুরী। এ কারণে নতুন কোচের অধীনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বকাপে লড়াই করার আহ্বান জানান রামোস।

শুধু রামোসই নন, নিজেদের একতাবদ্ধ রেখে বিশ্বকাপে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বার্সেলোনার ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে। তার বিশ্বাস, বিশ্বকাপে ম্যাজিক দেখাতে পারবে। ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লুই রুবিয়েলেস জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন কোচ হিয়েরোর অধীনেও জীবনবাজি রাখতে প্রস্তুত স্পেন খেলোয়াড়রা।

অন্যদিকে নতুন কোচ ফার্নান্দো হিয়েরো দলের দায়িত্ব নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তার কাজে। প্রথমদিনই অনুশীলন করিয়েছেন দলকে। মিডিয়ার মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। এক কথায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘গত দুই বছর ধরে যেভাবে এই দলটি গড়ে উঠেছে তার কোনো কিছুই পরিবর্তন হবে না। মাত্র দুইদিনে কোনো কিছুই পরিবর্তন হতে পারে না। দল আগের মতই আছে এবং থাকবে।’

স্পেন দলের ভেতরের এসব কথা-বার্তা শুনে মনে হচ্ছে, যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল মঙ্গলবার থেকে বুধবার, সেই ঝড় থেমে গেছে। আপাতত শান্তি বিরাজ করছে পুরো দলের মধ্যেই। তবে এই ঝড়ের প্রভাব মাঠের পারফরম্যান্সে কতটা পড়ে, সেটাই দেখার বিষয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের বিপক্ষে সোচির ফিশ্ট স্টেডিয়ামে,বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ১২টায় মাঠে নামবে স্পেন। এই ম্যাচেই বোঝা যাবে, ঝড়ের পর নিজেদের কতটা গুছিয়ে নিতে পেরেছে স্পেন।

আইএইচএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :