সেলেরি বগ লেকপাড়ে ফিরে দেখা দুই বছর

ড. রাধেশ্যাম সরকার
ড. রাধেশ্যাম সরকার ড. রাধেশ্যাম সরকার , লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক।
প্রকাশিত: ০৪:২১ পিএম, ১৯ মে ২০২৬
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট লাফায়েত শহরের প্রকৃতি যেন অদ্ভুত শান্তির নাম। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়নগরীর ব্যস্ততার মাঝেও এখানে এমন কিছু সবুজ আশ্রয় আছে; যেখানে পৌঁছালে মনে হয় মানুষ আবার নিজের ভেতরে ফিরে যেতে পারে। সেলেরি বগ ন্যাচার এরিয়া তেমনই নীরব সৌন্দর্যের ঠিকানা। বিস্তৃত জলাভূমি, কাঠের তৈরি দীর্ঘ হাঁটার পথ, লেকের স্থির জলরাশি, পাখিদের মুক্ত বিচরণ আর প্রকৃতির নিবিড় নীরবতা এ এলাকাকে অন্যরকম আবহ দিয়েছে। গতকাল পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবার গিয়েছিলাম এখানে। ওয়েস্ট লাফায়েতের এই শান্ত জলাভূমি ও প্রকৃতিনির্ভর এলাকা আমার কাছে কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয় বরং সময়ের ভাঁজে জমে থাকা কিছু আবেগের ঠিকানা।

সেখানে পৌঁছানোর পর হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল দুই বছর আগের এক বিকেলের কথা। মনে হলো, প্রকৃতির এই শান্ত পথগুলো যেন মানুষের স্মৃতিও ধরে রাখতে জানে। এপ্রিল মাসের সেই দিনটি ছিল ২০২৪ সালের। ইন্ডিয়ানার আকাশজুড়ে তখনো শীতের রেশ রয়ে গেছে। বাতাস ছিল এতটাই ঠান্ডা যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই হাত জমে আসছিল। আকাশে সূর্যের আলো থাকলেও তার উষ্ণতা যেন মাটিতে পৌঁছাতে পারছিল না। সেই সময়ই প্রথমবার এখানে এসেছিলাম আমার ছোট্ট নাতনি বাঁশরীকে নিয়ে। তখন তার বয়স মাত্র সতেরো দিন। পৃথিবীকে ঠিকমতো দেখার আগেই সে যেন এসে পড়েছিল প্রকৃতির বিশাল প্রশান্ত পাঠশালায়।

সেদিন বিকেলে আমরা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ। হালকা বাতাস বইছিল পানির ওপর দিয়ে। দূরে কিছু জলচর পাখি ভেসে বেড়াচ্ছিল। ছোট্ট শিশুটিকে মোটা কাপড়ে জড়িয়ে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। এত ঠান্ডার মধ্যেও অবাক হয়ে দেখেছিলাম, সে একদম অস্থির হয়নি। বরং বাতাসের ছোঁয়া আর চারপাশের আলোছায়া যেন তাকে আনন্দ দিচ্ছিল। তার ছোট ছোট হাত নড়ছিল, চোখ দুটি বিস্ময়ে চারদিকে তাকানোর চেষ্টা করছিল। আমরা মজা করে বলেছিলাম, মেয়েটা বুঝি খুব শক্ত মনের মানুষ হবে। সেদিন থেকেই আদর করে তাকে ডাকা শুরু হয়েছিল ‘শক্ত বাঁশরী দিদিভাই’ নামে। প্রকৃতির কঠিন ঠান্ডাও যেন তার হাসিকে থামাতে পারেনি। শিশুরা সম্ভবত পৃথিবীকে আমাদের চেয়ে ভিন্নভাবে অনুভব করে। তারা বাতাসের শব্দেও আনন্দ খুঁজে পায়, পানির ঝিলিকেও বিস্ময় মনে করে। গতকাল যখন আবার সেই একই পথ ধরে হাঁটছিলাম; তখন মনে হচ্ছিল সময় কত দ্রুত বদলে যায়। যে শিশুটি একদিন কেবল কোলে শুয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে ছিল, আজ সে দুই বছরের চঞ্চল, প্রাণবন্ত এক ছোট্ট মানুষ। এখন সে নিজেই দৌড়ে দৌড়ে পথ পার হয়, পাখি দেখলে হাত তুলে চিৎকার করে, কাঠের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পানির দিকে তাকিয়ে হাসে।

tour

মেফেয়ার ভিলেজ এলাকার শান্ত আবাসিক পথ পেরিয়ে আমরা যখন সেলেরি বগের দিকে যাচ্ছিলাম; তখন রাস্তার দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা বসন্তের সবুজ গাছগুলো চোখে কোমল প্রশান্তি এনে দিচ্ছিল। পরিচ্ছন্ন সড়ক, ছিমছাম বাড়িঘর আর ধীরস্থির পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল, এ শহর যেন ব্যস্ততার মাঝেও শান্তিকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছে। পথের মোড় ঘুরতেই দূরে দেখা যাচ্ছিল বিস্তৃত সবুজাভ জলাভূমি, যেন শহরের বুকের ভেতর প্রকৃতি নিজের জন্য নীরব পৃথিবী গড়ে তুলেছে। সেলেরি বগ ন্যাচার এরিয়ায় প্রবেশের পরই চোখে পড়ল বিস্তৃত জলাভূমি। শান্ত পানির ওপর আকাশের প্রতিচ্ছবি এমনভাবে ভেসে ছিল, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের ছবি আঁকছে। কাঠের তৈরি দীর্ঘ হাঁটার পথটি জলাভূমির বুক চিরে সামনে এগিয়ে গেছে। সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আমাকে আরও গভীর কোনো নীরবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

চারপাশে পাখিদের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কোথাও সাদা বক জলের ধারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও অচেনা ছোট পাখিরা ঝোঁপের আড়ালে ডানা ঝাপটাচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছিল পাখির ডাক, যা শহুরে জীবনের যান্ত্রিক শব্দ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করছিল। প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা আলোকচিত্রীদের জন্য এ স্থান যে কতটা আকর্ষণীয়, তা সেখানে কয়েক মুহূর্ত কাটালেই সহজে বোঝা যায়। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল এখানকার পরিবেশ সচেতন পরিকল্পনা। শিশুদের জন্য বিভিন্ন তথ্যফলক ও শিক্ষামূলক উপস্থাপনা ছিল, যেখানে জলাভূমির জীববৈচিত্র্য, পাখি এবং স্থানীয় উদ্ভিদ সম্পর্কে সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছিল, এখানে প্রকৃতিকে শুধু সংরক্ষণই করা হয় না, নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও আন্তরিক চেষ্টা করা হয়।

সেলেরি বগের কাঠের হাঁটার পথগুলো যেন গত দুই বছরে খুব একটা বদলায়নি। একইভাবে জলাভূমির ওপর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসও যেন সেই পুরোনো গল্পগুলো মনে রেখেছে। তবে বদলে গেছে আমাদের সময়, বদলে গেছে ছোট্ট মানুষটির পৃথিবী দেখার ভঙ্গি। সে কখনো ঘাসের ওপর বসে শুকনো পাতা কুড়াচ্ছিল, কখনো পানির ধারে দাঁড়িয়ে হাঁস দেখছিল। মাঝে মাঝে ছোট্ট পায়ে দৌড়ে আবার ফিরে আসছিল আমাদের কাছে। তার হাসির শব্দে চারপাশের নীরব প্রকৃতিও যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছিল। পরিবারের সবাই তাকে ঘিরে আনন্দ করছিল, আর আমি দাঁড়িয়ে সময়ের এই আশ্চর্য পরিবর্তন দেখছিলাম।

tour

প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলে মানুষ আসলে নিজের জীবনকেও নতুনভাবে দেখতে শেখে। একই স্থান, একই লেক, একই বাতাস, অথচ সময়ের ব্যবধানে অনুভূতির কত পরিবর্তন। দুই বছর আগে এখানে ছিল এক নবজাতকের নিঃশব্দ উপস্থিতি। আর আজ সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছে এক দুরন্ত শিশু, যার হাসিতে পুরো বিকেল আলোকিত হয়ে উঠছে।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছিল। লেকের পানিতে তখন সূর্যাস্তের সোনালি আভা পড়েছে। বাতাসে ভেসে আসছিল ভেজা ঘাসের গন্ধ। দূরে পাখিরা নীড়ে ফিরছিল ধীর ডানায়। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির এই শান্ত বিকেল যেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে কোমল অনুভূতিগুলোকে আরও গভীর করে তোলে।

ফেরার সময় লেকের জলের দিকে শেষবার তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো হয়তো এমনই সাধারণ দৃশ্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। কোনো বিশাল আয়োজন নয় বরং পরিবারের মানুষদের সঙ্গে প্রকৃতির মাঝে কাটানো কিছু শান্ত বিকেলই একসময় স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হয়ে ওঠে। সেলেরি বগ ন্যাচার এরিয়া তাই আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়। এটি সময়ের জীবন্ত অ্যালবাম, যেখানে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প নিঃশব্দে জমা হয়ে আছে বাতাস, জল আর সবুজ পথের ভেতরে।

tour

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।