দানিউব ও সাভা নদীর রহস্যময় গতি
ইমদাদ হক
নদীর দুই তীরজুড়ে ঘন গাছপালা। আরেকটু দূরে এগোলে জনমানবহীন জঙ্গল। তবে জঙ্গলের মাঝে মাথা উঁচু করে কোথাও কোথাও দাঁড়িয়ে আছে বাণিজ্যিক কিছু ভবন। গাছপালার পাতার ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপর পাখির ডাক, সেই সঙ্গে নাম জানা, না জানা বিভিন্ন গাছের উপর দিয়ে বয়ে চলা সুবাসিত বাতাস মন জুড়িয়ে দেয়। প্রকৃতিতে তখনো বৃষ্টির রেশ। ভারি হয়ে আছে আকাশ, ভারি চারপাশও।
প্রকৃতিতেই আমার মনোযোগ। ছেদ পড়ে মিলিচা ক্রিভোকাপিচের ডাকে।
- কফি চলবে?
- শিউর।
বৃষ্টির এই ঠান্ডাক্ষণে সময়োপযোগী অফার। লুফে নেই। কফি আসতে সময় লাগে ১০ মিনিটের মতো। আমি প্রকৃতি দেখি। এই নিরব প্রকৃতি আকর্ষণের। পুরো জগতজুড়ে যেনো নিরবতা। ক্লান্তিময় দিনের ব্যস্ততা শেষে এমন শীতলতাই কাম্য।
‘আকাশের রং বোঝা দায়। ক্ষণে ক্ষণে তার রূপের বদল। বৃষ্টি শেষে ঝরঝরে আকার রূপ নিচ্ছে। আকাশটাও যেন জগতের সব নীল রং পান করে উপচে দিয়েছে। আজ তার দেবার দিন। নদীর তীর, তীরের জঙ্গল, গাছপালা, বনভূমি, লোকালয় আজ সব নিশ্চুপ। এদিন কাউকে দেখার জন্য উন্মুখ। নদীর বুকে ছন্দহীন তাল-লয়ে বয়ে যাওয়া পানির প্রবাহ।
অসাড় হয়ে পড়া এই নদীই এনে দেয় একটা নিশব্দ দিনের কোমলতা। পূর্ণ হয় মনোবাসনা, নদীর কাছে যাবার বা না যাবার যে আকুলতা তা ভাসে শ্রাবণের শেষ বাতাসে। প্রতিধ্বনিত হয় সব পারাপারে।

এ ঘোর কি আদৌ কাটবার? আমি কি সার্বিয়ার শীতে নির্জীব গাছের মতো প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছি? তাহলে এই যে, শিষ দিয়ে ডেকে যাওয়া, অনন্তকাল ধরে বয়ে যাওয়া দানিউবের গল্প কিভাবে বলবো? সাভার প্রকৃতি তুলে ধরবো কিভাবে? ক্রিভোর ছায়াপ্রেমকে কোথায় রাখবো?’
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তি এবার। তাতে অংশগ্রহণের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে দেখার আয়োজন। ট্যুর গাইড, গাড়ি, নিরাপত্তা সবকিছু স্বাগতিক সার্বিয়ার ব্যবস্থাপনাতেই। আমাদের টিমের সমন্বয়ক সার্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি মিলিচা ক্রিভোকাপিচ। ট্যুরের এই পর্বে বেলগ্রেড সিটি ট্যুর। কনফারেন্স রুমে বসে থেকে বিশ্ব নেতাদের বুলি শোনা। তার চেয়ে ঢের ভালো শহর দেখা। সারাদিনের কর্মসূচির সবকিছুই সাজানো, সময় ধরে ঠিকঠাক করা। তবুও আমার ভেতরে অস্থিরতা। নতুন নতুন নিদর্শন, জাদুঘর, জায়গা-এসব দেখার বাসনা।
বেলগ্রেডে আসার পর দানিউব-সাভার রাজত্ব টের পেলাম। শহরের যে প্রান্তেই যাই, ঘুরে ফিরে এদিক-ওদিক, সবদিকেই দানিউবের রেখা। পাহাড়, বন, জঙ্গল, উঁচু-নিচু ও সমতল ভূমির পথে বয়ে চলেছে। বয়ে চলেছে অবিরত এক নদী, যার নাম দানিউব। পৃথিবীতে দানিউবই একমাত্র নদী, যে নদীর অববাহিকায় রয়েছে অন্তত ১০টি দেশের রাজধানী শহর।
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড, হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাসহ ব্রাতিস্লাভা, বুখারেস্ট, সোফিয়া, জাগরেব, লুব্লুজানা, সারাজেভো এবং প্রিস্টিনা সবগুলোই একেকটি রাজধানী। দানিউবের অববাহিকায় অবস্থিত চতুর্থ বৃহত্তম শহর মিউনিখ, বাভারিয়ার রাজধানী ইসার এই নদীর উপর দাঁড়িয়ে আছে। দানিউব নদীর অববাহিকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বৈচিত্র্যময় আবাসস্থল। কার্প, স্টার্জন, স্যামন, ট্রাউট, ইউরিহালিন মাছের কয়েকটি প্রজাতি যেমন ইউরোপীয় সিবাস, মুলেট এবং ঈল, মাগুর ও মাগুর জাতীয় মাছ ইত্যাদি ব্যাপক পরিমাণে পাওয়া যায় এ নদীতে।
ইস্তাম্বুলে বসফোরাস প্রণালীর তীরে যেমন গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতার সব স্থাপনা; তেমনি দানিউব-সাভা নদীও ইউরোপের আধুনিকতার ভিত্তি বললে কম বলা হবে না। দানিউবের তীরেই মনজুড়ানো সব রেস্টুরেন্টও। গত রাতে অ্যাম্বাসেডর শামীম স্যারও টিমের সবাইকে খাওয়াতে দানিউবের তীরের কোনো এক রেস্টুরেন্টে নিয়েছেন। আমি যাইনি বলে না কী মিস করেছি! এখন আবার ল্যাঙ্গোস্টে বসে যখন বিরক্ত হচ্ছি, তখন পাশে বয়ে যাওয়া দানিউবকে আগ্রহ নিয়ে দেখাই শ্রেয় মনে করি।
নদীর দুপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা। হালকা যানের থেমে থেমে চলাচল। গাড়ির চাপ নেই খুব একটা। নদীর দুপাশ এত শক্ত করে বাঁধাই করা, প্রবল স্রোতের বন্যায় বাঁধ ভাঙার কোনোই সম্ভাবনা নেই। অদূরে একটি সেতু, যা পুরাতন বেলগ্রেডের সাথে সংযুক্ত করেছে নতুন বেলগ্রেডকে।
এ নদী, ভাববাদের নদী। এ পরিবেশ, প্রেমকে জাগ্রত করার পরিবেশ। ভালো-মন্দের মিশেলে মনে প্রকট দ্বন্দ্ব।
ক্রিভোকাপিচকে কি পাত্তা দিচ্ছি না?
কি জানি, হবে হয়তো! এতো সুন্দরী রমণী। কী-ই বা লাভ দুদিনের সখ্য করে? আমার ভাবুক চেহারা ধরা পড়ে তার রাডারে। নদীর প্রতি ভালোলাগার কথা শোনায় সেও। সমুদ্র তার পছন্দ। ইচ্ছে থাকা সত্বেও তার সমুদ্রস্নান সহজ হয়ে উঠে না, দানিউব-সাভা-ই তার ভরসা।
পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল কয়েকটি স্থানে। সেসবের মধ্যে দানিউবের উপত্যাকা অন্যতম। পৃথিবী বিখ্যাত বিভিন্ন গল্পে, কবিতায় যে নদীর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি, সেটা দানিউব। দানিউবের কথা এসেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি লেখকের ভ্রমণকাহিনীতেও।

দানিউব ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। ভলগা নদীর পর এর অবস্থান। এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য নিদর্শন। এটি ইউরোপ মহাদেশের অন্যতম প্রধান পরিবহন পথ। ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে কেবল দানিউবই একমাত্র নদী যা পূর্ব-পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট অঞ্চলে হয়েছে এর উৎপত্তি। সেখান থেকে এটি পূর্বদিকে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে রোমানিয়ার উপকূলে কৃষ্ণসাগরে পতিত হয়েছে। রোমানিয়ায় নদীর মোহনা থেকে জার্মানির উল্ম শহর পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীটি নৌ-পরিবহনের জন্য উপযুক্ত।
ইতিউতি দেখে নদীর তীরে নামতে চাই। নদীর পানি হতে অন্তত ৩০০ ফুট উপরে আমাদের রেস্টুরেন্ট। ক্রিভোকাপিচ না করলো। ঠান্ডার মধ্যে তাল রেখে নিচে নামাও কঠিন। এই নদীর তলদেশ থেকে উপরের পাড় পর্যন্ত রকমভেদে নানান ধরনের কংক্রীটের আস্তরণ। এখানে সবুজ ঘাস নেই, নেই কাদা জল। আবার গাছ আছে, ঘন জঙ্গল আছে। আমার প্রাণের বাংলার নদীর রূপের সঙ্গে কিছু মেলে আবার অনেক কিছু মেলে না।
এই নদী শীতকালের নদী। আমার বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া বড়াল নদীর মতোই। বড়াল নদীতে ভাটার টান আছে। কাদা, জল আছে। নদীর দুপাশে জঙ্গল আছে। রহিমা, শাহানারা, আক্কাছ আলীদের ঘামে গজে উঠা সিমের বাগান আছে, বেগুনের ক্ষেত আছে। সোঁদা মাটির গন্ধে পরম মমতা আছে। বিদেশের নদী তীরে বসে ভাবি, কেন আগে আরো মমতা নিয়ে বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরিনি।
বাংলার নদী তীরের তরমুজের ক্ষেত, কাশবনে এই যে মায়া, এতো জাদু, তা তো পৃথিবীর অন্য কোথাও কি আছে? নেই। দানিউব-সাভা যত বড় নদীই হোক, যতই ঐতিহ্য-ইতিহাস থাকুক, তা কি বাংলার পলিমাটিতে ভরাট হওয়া নদীর মতো এতো মায়াজাল তৈরি করতে পারে? আমাদের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র, আমাদের বড়াল বা বুড়িগঙ্গাই কম কীসে?
দানিউবের ইতিহাস আছে, আছে শাখা প্রশাখা। প্রায় ৩০০ মতো উপনদী আছে দানিউবের। এদের মধ্যে ৬০টি নৌ-পরিবহনের অনুকূল। দানিউব নদীর উপত্যকার আয়তন প্রায় ৭ লাখ ৭৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বিশাল এই উপত্যকার অস্তিত্ব জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, স্লোভেনিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ও ইউক্রেনজুড়ে। খালের মাধ্যমে মাইন, রাইন ও ওডার নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দানিউব। এর ফলে কৃষ্ণ সাগর ও উত্তর সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। লিন্ৎস ও ভিয়েনার মধ্যবর্তী দানিউব উপত্যকা এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। দানিউব প্রায় ২ কোটি মানুষের পানীয় জলের উৎস।
ক্রিভোর সঙ্গে তখনো ছোটোখাটো কথা। বেশিরভাগই হুঁ, হ্যাঁ। তার ফোন বেজে উঠে, কানে ধরে উঠে পড়ে সে। নদীর ওপাশে তাকাই। পাইন গাছের দীর্ঘ সারি।
প্রাচীনকাল থেকে, দানিউব সমগ্র ইউরোপের একটি ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য পথ। বহু মানুষ দানিউব নদী কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। এ নদী জলবিদ্যুতের বড় উৎস। এর মোহনায় অবস্থিত বেলগ্রেডের একমাত্র নদী বন্দর। কার্গো ও যাত্রীবাহী এ বন্দরটি বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে প্যানচেভো ব্রিজের কাছে।
যা সাভা নদীর যাত্রী টার্মিনালও পরিচালনা করে। বন্দরের স্থানান্তর ক্ষমতা বছরে প্রায় তিন মিলিয়ন টন। এটিতে ৩ লাখ বর্গমিটার গুদাম ও ৬ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার উন্মুক্ত স্টোরেজ এলাকা রয়েছে। লবণ, চিনি, কংক্রিট লোহা, কাগজ, পাইপ এবং কৃত্রিম সার বেলগ্রেড নদীবন্দরের প্রধান পণ্য।
ভাবনার জটে বাঁধা পড়ি। আমাদের নদীর মায়া আছে, জাদু আছে। কিন্তু পেটে ভাত না থাকলে রোমান্স থাকে কতক্ষণ? এই যে, বাংলাদেশে বড়-ছোট সব মিলিয়ে সাড়ে ৭০০ নদী আছে। আমরা কি তার যথাযথ ব্যবহার করতে পারছি? অথচ নদীর সঙ্গে আমাদের কত সখ্য। জীবন-প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য নদী বাঁচানো দরকার। নদী পথের যোগাযোগে খরচ কম ও জ্বালানি সাশ্রয়ী। এটা পরিবেশবান্ধব ও দুর্ঘটনামুক্ত তুলনামূলক নিরাপদ। আমাদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা উন্নয়নের জন্য কত কিছু করছেন, কত ভাবছেন। নদী নিয়ে তারা কবে ভাববেন?
দানিউব নদীর জলপথ, অর্থাৎ প্যান-ইউরোপিয়ান করিডোর-৭ কে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অথচ বাংলাদেশের চিত্রটা ভিন্নরকম। ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে নৌপথের দৈর্ঘ ছিল ১৪ হাজার ৩৮ কিলোমিটার। ২ হাজার কিলোমিটার কমে পাকিস্তান আমলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার কিলোমিটার, শুকনো মৌসুমে যা দাঁড়ায় ৮ হাজার কিলোমিটারে।
আশির দশকের শেষ ভাগে পানির মৌসুমে নৌপথ ছিল ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটার, আর শুকনোর সময় ৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। গত কয়েক বছরে নদী খননের বেশ কিছু প্রকল্প দেখা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, এসব প্রকল্পের ফলে নৌপথের দৈর্ঘ প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারে ঠেকেছে।
সার্বিয়াতে দানিউব নদীর উপনদীগুলো হলো দ্রভা, তিসা, সাভা, তামিস, ভেলিকা মোরাভা, টিমোক এবং নেরা। পরিবহন, পুনর্ণবায়নযোগ্য শক্তি, পানীয় জলের উৎস, সেচ ও শিল্প, মৎস্য সম্পদের প্রধান উৎস দানিউব। যদিও এখনো সার্বিয়ার নিজস্ব জল সম্পদের ব্যবহার তুলনামূলক কম।

তারপর এ নদীর অবদান কোনো অংশে কম নয়। দানিউব নদীতে সার্বিয়ার দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত। এ দুটি কেন্দ্র মিলে বছরে প্রায় ১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। দানিউব নদীতে উৎপাদিত এসব জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ পূরণ করা হয়।
সার্বিয়ার প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষ প্রতিদিনের পানি ব্যবহারের জন্য দানিউব নদীর ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের মানুষ কৃত্রিম হ্রদ, মৎস্য, শিল্প এবং কৃষি সরবরাহের জন্য যে জলের প্রয়োজন তার বেশিরভাগই দানিউব নদী এবং দানিউব-টিসা-ড্যানিউব খাল (ডিটিডি) থেকে নিয়ে থাকে। সার্বিয়ার মোট আবাদযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন হেক্টর সেচের জন্য উপযুক্ত, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ দানিউব নদীর ক্যাচমেন্ট এলাকার মধ্যে অবস্থিত।
দানিউবের বলকান অঞ্চলে বিশাল আকৃতির একটা মাছ পাওয়া যেতো। এখনও পাওয়া যায়, তবে সংখ্যায় কম। ‘দানিউব স্যামন’ নামের এই মাছ আকারে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমান হতে পারে। আবার বাঁচেও প্রায় অনেক দিন, ৩০ বছর পর্যন্ত। স্লোভেনিয়া ও মন্টিনিগ্রোর উপত্যকার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকা-বাঁকা নদী ও জলপ্রবাহের মাঝেই বসবাস করে দানিউবের এই দানবেরা।
কফি শেষ করে আসে ক্রিভো। বাংলাদেশের নদী নিয়ে আক্ষেপ শোনাই তাকে।
‘বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে ৩৭ শতাংশ মালামাল পরিবহন হতো নদীপথে। তখন ১৬ শতাংশ যাত্রী নৌপথে যাতায়াত করত। এখন এ হিস্যা কমে মালামাল পরিবহন দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশে, আর নৌপথের যাতায়াত ৮ শতাংশ।’
নদীর প্রতি ভালোলাগার কথা শোনায় ক্রিভো। তার পছন্দের নদী এই দানিউব আর সাভা। বাংলাদেশের নদ-নদীর হতাশা তাকে ছোঁবে কিভাবে?
‘পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমি গঠিত হয়েছে পলি মাটি দিয়ে। এরপর এই ভূমির উর্বরাশক্তি ধরে রাখতেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ভূমিকা রেখেছে সেই পলি মাটি। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জমা হচ্ছে কিছু পলি, সেখানে মহাকালের ধারাবাহিকতায় জেগে উঠছে নতুন নতুন ভূমি। সন্দ্বীপ-হাতিয়া থেকে সুন্দরবন পুরো এলাকাতেই জাগছে বড় বড় চর। বড় হচ্ছে বাংলাদেশের ভূমি সীমানা। আবার বাংলাদেশে সবচেয়ে সুলভ মাছ ইলিশ। বাঙালির ইলিশ নিয়ে, ইলিশের রসনা বিলাস নিয়ে কত গল্প কবিতা হয়েছে, তা কি গুনে শেষ করা যাবে? আমরা যদি একটু মনোযোগী হই নদীর দিকে, আমাদের নদীর দিকে, আমরা বাঁচবো, অস্তিত্ব শক্ত হবে পরের প্রজন্মের। মহাকালে শক্ত ভিত হবে বাংলাদেশের।’
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসি। দানিউব-সাভার তীর ধরে হাঁটি। কখনো গাড়ি সাঁ করে চাকা ঘুরায় নদীর তীর ধরে বেয়ে যাওয়া আঁকা-বাঁকা সড়কে। তীরের ধারে ছোট-বড়, মাঝারি সাইজের ঘর-বাড়ি। লোকজন হাঁটছে ফুটপাত ধরে। তাদের সুশৃঙ্খল হাঁটা। কিছু খাবারের দোকানও খোলা। চা-বিস্কুকেটর কয়েকটা দোকান, ঢাকার টং দোকানের মতো। জঙ্গল আর গাছপালা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। মাঝে মাঝে পাখির ডাক। বৃষ্টিস্নাত পরিবেশে কি পাখি ডাকে? কি জানি? তবে আছে শিরশিরে বাতাস। আকাশে সূর্যের দেখা নেই।
শীতকালে যখন তাপমাত্রা মাইনাসের নিচে থাকে, তখন দানিউবের বড় একটা অংশ বরফে পরিণত হয়। বরফের আঘাতে টাইটানিক ডুবে গিয়েছিল, এটা সবার জানা। কিন্তু গভীরতা সম্পন্ন একটি চলমান নদীও যে শক্ত বরফে পরিণত হতে পারে- তা বিস্ময়ের। যেখানে গ্রীষ্মকালে মানুষ গোসল ও অবিরাম সাতাঁর কাটে, সেই নদী সম্পূর্ণ বরফে পরিণত হয়েছে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিনই বটে! দানিউব নদীর বরফ হওয়ার সুযোগ কাজে লাগায় স্কেটিং প্রিয় ছেলে-মেয়েরা। তারা স্কেটিং সু পরে নেমে পড়ে স্কেটিংয়ে।

সাভা নদী
বেলগ্রেডের কেন্দ্রে দানিউবের সাথে মিলিত হয়েছে সাভা নদী। দানিউব-সাভা নদীর মিলনে যে মোহনা গড়ে উঠেছে বেলগ্রেডে, তা সমগ্র ইউরোপের সবচেয়ে রোমান্টিক দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। ইউরোপজুড়ে দানিউব নদী যেমন, যুগোস্লাভিয়ায় প্রবেশের সময় সাভা নদী অনেকটা তেমন রূপ লাভ করে। অনেকেই একে দানিউবের সমতুল্য বিবেচনা করে।
এটি স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়ে অবশেষে সার্বিয়ার মধ্য দিয়ে রাজধানী বেলগ্রেডে এসে দানিউবের সাথে মিশে যায়। সাভা প্রায় ৯৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যার মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার সাভা ডলিঙ্কা হেডওয়াটার জেলেনসি, স্লোভেনিয়ায় উঠছে। জলের আয়তনের দিক থেকে এটি দানিউবের বৃহত্তম উপনদী, এবং এর ক্যাচমেন্ট এলাকা ৯৭ হাজার ৭১৩ বর্গকিলোমিটার। দৈর্ঘের দিক থেকে এটি টিসজার পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম। সাভা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনসংখ্যা ৮০ লাখেরও বেশি।
দানিউবের তীর ঘেঁষে কয়েল লেয়ারের রাস্তা। উপরের সড়ক দিয়ে হাঁটার সময় চোখ যায় নিচের সড়কে। নিচে হাঁটলে মনে হয়, যেনো উপরের রাস্তাটাই সুন্দর। অনন্তকাল এই পথ ধরে হাঁটার ইচ্ছে জাগে।
পৃথিবীটা সুন্দর, সুন্দর এর প্রকৃতি। ঘুরে বেড়ালে মনের দৃষ্টি বড় হয়। কিন্তু ঘোরাঘুরির জন্য সময় বেঁধে দেওয়াটা কেমন বেখাপ্পা না? রেস্টুরেন্টে ফিরতে হবে। মোবাইল ফোন বের করি, টপাটপ কয়টা ছবি তুলে রাখি। স্মৃতির খাতা বড় হোক।
এমএমএফ/এএসএম