অদম্য নারী

চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ব্যবসার আঙিনায়, হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা

অভিজিত রায় (কৌশিক)
অভিজিত রায় (কৌশিক) অভিজিত রায় (কৌশিক) , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৩ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২৬
জুয়েনা ফেরদৌসের ব্যাগের কারখানায় কাজ করছেন কয়েকজন কর্মী/ছবি: সংগৃহীত

একসময় রাজধানীতে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন প্রখ্যাত পরিচালক তারেক মাসুদের সঙ্গে। তবে বিশেষ কারণে আট বছর আগে এসব ছেড়ে নিজের শেকড় রংপুরে পাড়ি জমান। সেখানে চাকরির সংকটের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আঙিনায় আসা। যে পথ কখনো মসৃণ ছিল না। শুরুতেই ক্রয়াদেশ বাতিল ও লোকসানের মতো বাধার সম্মুখীন হন। কিন্তু থেমে যাননি। নানা বিপত্তি ডিঙিয়ে দেখা পেয়েছেন সফলতার।

বলছিলাম ব্যাগ, হোম ডেকর ও হস্তশিল্প পণ্য প্রস্তুত এবং বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান আহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌসের কথা। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরষ্কার-২০২৫’। গত বছর বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা (নারী) ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় তাকে।

চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ব্যবসার আঙিনায়, হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তাআহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌস/ছবি: সংগৃহীত

জুয়েনা ফেরদৌস এখন মূলত পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে নানা রকমের ব্যাগ তৈরি করছেন। চারটি গ্রামের প্রায় ৮০ জন নারী তার জন্য পাটের বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি করে দেন। পাশাপাশি যেখানে তার হস্তশিল্পের ব্যাগ তৈরি হয় সেখানে ১২ জন নিয়মিত কর্মী আছেন।

নিজের কর্মসংস্থানের তাগিদ

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আট বছর আগে একটা বিশেষ কারণে আমি ঢাকা থেকে নিজের বাড়িতে (রংপুরে) ফিরে আসি। আমি ঢাকাতে ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদের সঙ্গে কাজ করতাম। যখন আমাকে চলে আসতে হলো তখন নিজের যে অভিজ্ঞতা, সেটার সঙ্গে মিলে এমন কোনো চাকরি এখানে পাচ্ছিলাম না। আমরা নিজেদের আত্মকর্মসংস্থানের কথা বলি, যখন চাকরির বাজারে কোনো চাকরি থাকে না তখন নিজের কর্মসংস্থান নিজে করার যে তাগিদটা ওখান থেকেই শুরু।’

চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ব্যবসার আঙিনায়, হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তাসেলাই মেশিনে চলছে ব্যাগ তৈরির কাজ/ছবি: সংগৃহীত

সফল এ উদ্যোক্তা জানান, ২০১৭ সালে রংপুরে ফিরে যাওয়ার পর তিনি কোনো কাজ যখন পাচ্ছিলেন না, তখন জিআই পণ্য শতরঞ্জি বোনা শেখার জন্য একটি কারখানায় গেলেন। কিন্তু সেখানে তাকে কাজ শেখানো বা তার পেছনে সময় নষ্ট করার মতো সময় কারও ছিল না। এরপর তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে গ্রাফিক্স ডিজাইনের একটি বেসিক কোর্স করেন। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টেই কিছুদিন কাজ করেন। কিন্তু করোনার কারণে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
প্রতিকূলতা জয়: ঢাকা বিভাগে ৫ জন পেলেন ‘অদম্য নারী পুরস্কার’
মাত্র ২ বছরেই চামড়া শিল্পে বাজিমাত উদ্যোক্তা তাহমিনার
২৫ নারী উদ্যোক্তাকে নার্সারি স্থাপনে জায়গা বরাদ্দ দিলো উত্তর সিটি

বন্ধুর পরামর্শে ব্যাগ তৈরি

জুয়েনা ফেরদৌস বলেন, ‘আমার এক বন্ধু থাকে পর্তুগালে। সে আমাকে বললো- “পরিবেশবান্ধব ব্যাগ তৈরি করতে পারো কি না দেখ, কারণ বাইরে এই পণ্যের চাহিদা আছে। আমি এখানে বায়ারদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। অথবা কারা ব্যাগ তৈরি করে তা আমাকে জোগাড় করে দাও।” ওর জন্য ব্যাগ খুঁজতে গিয়েই বুঝতে পারলাম যে জিনিসটার সঙ্গে আমার একটা ভালো লাগা তৈরি হলো।’

চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ব্যবসার আঙিনায়, হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তাকর্মীদের সঙ্গে আহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌস/ছবি: সংগৃহীত

‘বিভিন্ন কারখানায় গেলাম, তারা কীভাবে ব্যাগ বানায় সেগুলো দেখলাম। এরপর সেটার সঙ্গে আমার একটা যোগসূত্র খুঁজে পেলাম এবং এই যাত্রাটা আমার সঙ্গে মিলছিল। পরে আমি অল্প দামে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি মেশিন কিনলাম ও একজন শ্রমিক নিয়ে ঘরে কাজ শুরু করলাম,’ যোগ করেন তিনি।

ক্রয়াদেশ বাতিল ও লোকসান

শুরুর দিকের প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২০ সালের দিকে প্রথম যখন তিনি ব্যাগ তৈরি করেন, বছরখানেক সেগুলো কোথাও বিক্রি করতে পারেননি। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, বিক্রির জন্য নানা জায়গা ঘুরেছেন, বাজার বুঝতে চেষ্টা করেছেন। এরপর একটি ক্রয়াদেশ পেলেও ৫০০ ব্যাগ বানানোর পর ক্রেতা আদেশটি বাতিল করে দেন। সেখানে তিনি বড় একটি বাধার সম্মুখীন হন। বেশকিছু লোকসানও হয়েছে।

আরও পড়ুন
সংসার চালানোর তাগিদ থেকে উদ্যোক্তা বগুড়ার কনক
স্বল্প সুদে ও সহজে ঋণ পেতে সরকারের সহযোগিতা চান নারী উদ্যোক্তারা
ব্যাংক ঋণ পেতে নারী উদ্যোক্তারা এখনো অবহেলিত

ঘুরে দাঁড়ানো

শুরুর ধাক্কা সামলে নিজের পণ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মেলায় অংশ নেওয়া শুরু করেন জুয়েনা ফেরদৌস। সেই সঙ্গে নানা ধরনের সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। এতে করে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও পরিচিতি বাড়তে থাকে। পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে পণ্যের মান নিশ্চিত করেন। পরে ২০২১ সালে তিনি প্রথম উল্লেখযোগ্য ক্রয়াদেশটি পান।

চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ব্যবসার আঙিনায়, হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তাপাট দিয়ে বানানো হচ্ছে হস্তশিল্পের পণ্য/ছবি: সংগৃহীত

জুয়েনা ফেরদৌস বলেন, ‘প্রথম অর্ডারটি ছিল আমার জন্য একটি প্লাস পয়েন্ট। জার্মান কালচারাল সেন্টারের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যাগের অর্ডার ছিল সেটি। ব্যাগগুলো আমি খুব মন দিয়েই তৈরি করেছিলাম। কাজটা আমাকে সুন্দর এক অভিজ্ঞতা দেয়। এর মাধ্যমে ভালো প্রচারও হয়েছিল। ওখানে যে ব্যাগগুলো দিয়েছিলাম সেগুলো এত সুন্দর হয়েছিল যে পরে জার্মান দূতাবাস আমাকে ডেকে নিয়েছিল। তাদের ব্যাগ এখন আমি তৈরি করি। এরপর আরও বিভিন্ন জায়গায় ব্যাগ দিয়েছি। এখন বাজারে আমার ব্যাগের চাহিদা বাড়ছে। এভাবেই একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতা পাই।’

কেআর/একিউএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।