শাহীন আনাম
পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন নারীরা, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে এখনো তারাই
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেছেন, সবার জন্য মর্যাদাসম্পন্ন সমঅধিকারই ছিল আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মূল কথা। পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন নারীরা, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে এখনো তারাই।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের আলোক অডিটরিয়ামে এক টাউন হল আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এ বছরের নারী দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন: ফর অল উইমেন অ্যান্ড গার্লস’-কে সামনে রেখে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ‘হার ভয়েস, হার রাইটস’ শীর্ষক এই টাউন হলটি আয়োজন করে।
শাহীন আনাম আরও বলেন, বাংলাদেশে নারীরা বহুবার সাহস, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিলেও তারা বিভিন্ন সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে বারবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। নারীরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে এখনো তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
তার মতে, অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বানও জানান তিনি।
আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহেশন প্রোগ্রামের প্রধান ওয়াসিউর রহমান তন্ময় বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল, কিন্তু সংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রগুলোতে তারা এখনো প্রতিনিধিত্বের জায়গায় পিছিয়ে। ২০২৫ সালে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ২ হাজার ৮০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৮৬টি ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া বর্তমান বা অতীতে বিবাহিত নারীদের ৭২ শতাংশ স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন, ৬৩ থেকে ৭৮ শতাংশ নারী অনলাইনে সহিংসতার মুখে পড়েছেন, প্রায় ৫১ শতাংশ নারীর বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে গেছে, আর দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা মাত্র সাত।
তিনি আরও বলেন, এই আয়োজনের লক্ষ্য ছিল এমন একটি নাগরিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সংস্কার-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো সরাসরি তুলে ধরতে পারে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামসের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল অধিকার, কণ্ঠস্বর ও মর্যাদার সংগ্রামও। মানুষকে শুধু প্রশ্ন করতে শিখলেই হবে না, এ-ও জিজ্ঞাসা করতে হবে যে বাস্তবে সমতা নিশ্চিত হচ্ছে কি না। প্রতিদিনের জীবনে অধিকার কীভাবে খর্ব হয়, তা বোঝার সামাজিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বাধাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে।
এই টাউনহলে তরুণদের পাশাপাশি দলিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিভিন্ন বিশ্বাস ও জেন্ডারের মানুষ এবং তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। খোলামেলা নাগরিক পরিসরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তারা সরাসরি আলোচক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
অনুষ্ঠান শুরু হয় শাহীন আনামের স্বাগত বক্তব্য দিয়ে এবং পরে ইন্টারঅ্যাকটিভ টাউন হল আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।
উই ক্যান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, আইন থাকলেও পশ্চাৎমুখী মানসিকতা পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। মেয়েদের এমনভাবে বড় করা যাবে না যাতে তারা মনে করে বিয়েই তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধু প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সব সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া উপস্থিত শ্রোতা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন ও অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বঞ্চনার বহুমাত্রিক বাস্তবতা উঠে আসে। কেউ তুলে ধরেন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতিদিনের অপমান ও অনিরাপত্তার কথা, কেউ বলেন প্রত্যন্ত ও তৃণমূল এলাকায় নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সীমিত সুযোগের কথা।
আলোচনায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিস্তার, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়ে থাকা, রাজনীতিতে নারীর নগণ্য অংশগ্রহণ, এবং শিশুদের জীবনের শুরু থেকেই অধিকারবিষয়ক শিক্ষা শুরু করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলোও উঠে আসে।
অংশগ্রহণকারীরা প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি অপমানজনক আচরণ, যৌতুক, নির্যাতন, সামাজিক অবহেলা ইত্যাদির কথাও তুলে ধরেন। আলাদাভাবে উঠে আসে খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় বাল্যবিবাহের স্থায়ী উপস্থিতির বিষয়টিও।
ইএইচটি/এমএমএআর