নারী-পুরুষ সমঅধিকারেই টেকসই উন্নয়ন

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
ইব্রাহীম হুসাইন অভি ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত: ০৮:০৯ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২৬
জনসংখ্যার বড় অংশই এখন নারী/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

বর্তমানে দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ ৯৬ দশমিক ৩৩ জন। সে হিসাবে জনসংখ্যার বড় অংশই এখন নারী।

এমন বাস্তবতায় নারীর সম্ভাবনা ও সক্ষমতা পিছিয়ে রেখে বা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনোভাবেই একটি উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গত কয়েক দশকে দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবু কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য, আইনি সুরক্ষার ঘাটতি ও সামাজিক মানসিকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা এখনো অদৃশ্য ‘গ্লাস সিলিং’র মুখোমুখি।

নারী দিবস এলে জোরেশোরে আলোচনায় আসে নারীর অধিকার ও ন্যায্যতার বিষয়। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।

এটি শুধু একটি প্রতীকী আহ্বান নয়, এটি আইনি সমতা নিশ্চিত করা, বৈষম্যের কাঠামো ভাঙা ও নারী-পুরুষের ভেদরেখার ঊর্ধ্বে উঠে সমঅধিকারের সমাজ গড়ে তোলার একটি স্পষ্ট বার্তা।

এ ধারণা আরও দৃঢ় হয় নারীদের নিম্নমজুরির কাজের মধ্যে বেশি সংযুক্তি, লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত এবং কম নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের কারণে। স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, শুধু আইনই পর্যাপ্ত নয়, সামাজিক নীতি, কর্মসংস্থান ধরন এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ধরনও লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন

ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে মজুরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য বিদ্যমান, যা উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি বড় বাধা।

বিশ্বব্যাংকের উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ ২০২৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনি কাঠামো বা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ৩৮, যা বৈশ্বিক গড় ৬৭-এর তুলনায় অনেক কম।

এছাড়া সহায়ক কাঠামো বা সাপোর্টিভ ফ্রেমওয়ার্কস ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর ৩৫, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৩৬ দশমিক ৬১-এর নিচে।

প্রয়োগ সম্পর্কিত ধারণা বা এনফোর্সমেন্ট পারসেপশন বা প্রয়োগ সম্পর্কিত ধারণায় বাংলাদেশ স্কোর করেছে ২৭ দশমিক ৯২, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৫৩ দশমিক ৩১ এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।

আরও পড়ুন

সংরক্ষিত আসনের গণ্ডি পেরোতে পারছেন না নারীরা
নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় লজ্জা নয়
আইসিটিতে নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে মানসিকতা বদলানো জরুরি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব আইন এখনো দেশে কার্যকর হয়নি। ফলে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের লিগ্যাল প্রোটেকশন তুলনামূলকভাবে দুর্বল। জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের বড় অংশই মনে করে, দেশে নারীরা সমান কাজের জন্য পুরুষদের মতো সমান পারিশ্রমিক পান না।

এছাড়া বেকারত্বের ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে (এলএফএস) অনুযায়ী, নারী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যেখানে তাদের পুরুষ সমকক্ষদের ক্ষেত্রে এ হার ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

এই বৈষম্য তরুণদের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে নারীদের বেকারত্বের হার ৩৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ২৬ শতাংশ।

সুতরাং, এখানে বৈষম্য রয়েছে তা স্পষ্ট । কর্ম ও শিক্ষাক্ষেত্রে এ বৈষম্য দূর করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারীরা কোনো দয়া চান না, তারা কেবল তাদের যথাযথ ও সঠিক অধিকার এবং সুযোগই চান। যদি শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য সুযোগ পান, তারা আরও ভালো কাজ করবেন, শিল্পে নেতৃত্বের অবস্থান দখল করবেন। মালিক, সিনিয়র কর্মী ও ম্যানেজারদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। দিতে হবে সমান সুযোগ।’

নারীর জন্য বিনিয়োগ কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে অপরিহার্য। নারীদের শিক্ষা, সম্পদ ও নেতৃত্বের সুযোগ দিলে উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রা বাড়ে। যখন নারীরা অর্থনীতিতে পূর্ণভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তার সুফল ঘর, সম্প্রদায় ও পুরো জাতিতে ছড়িয়ে পড়ে।-অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

বাংলাদেশ এখনো লিঙ্গভিত্তিক সমান মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশে নারী ও পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করার জন্য পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো নেই। ফলে আইনগত সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, ‘এ ধারণা আরও দৃঢ় হয় নারীদের নিম্নমজুরির কাজের মধ্যে বেশি সংযুক্তি, লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত এবং কম নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের কারণে। স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, শুধু আইনই পর্যাপ্ত নয়, সামাজিক নীতি, কর্মসংস্থান ধরন এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ধরনও লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

ফাহমিদা বলেন, ‘এ বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু শক্তিশালী আইনই নয়, বরং কাঠামোগত এবং সাংস্কৃতিক সংস্কারও প্রয়োজন, যাতে নারীরা সত্যিকারের অর্থনৈতিক সমতার অধিকার অর্জন করতে পারে।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারীর উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষায়, প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন দক্ষতা বিকাশ ও পেশাগত প্রশিক্ষণে। এটি শুধু নারীদের সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং অর্থনীতি ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নারীর জন্য বিনিয়োগ কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে অপরিহার্য। নারীদের শিক্ষা, সম্পদ ও নেতৃত্বের সুযোগ দিলে উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রা বাড়ে। যখন নারীরা অর্থনীতিতে পূর্ণভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তার সুফল ঘর, সম্প্রদায় ও পুরো জাতিতে ছড়িয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘সত্যিকারের অগ্রগতি আসে তখন, যখন এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হয় যেখানে নারীরা সফল হতে পারে। কারণ তাদের সাফল্য শেষ পর্যন্ত সমগ্র সমাজকেই শক্তিশালী করে।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) নারী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান মোহাম্মদ হাতেম।

বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মক্ষেত্রে তাদের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে একসময় নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল। তবে সাম্প্রতিকসময়ে এ হার কিছুটা কমেছে। এর একটি কারণ হতে পারে শিল্পে নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমন, যার সঙ্গে অনেক নারী শ্রমিক এখনো পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি।’

কিছু নতুন স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) কারখানায় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে শিল্পে নারী শ্রমিকের সামগ্রিক অংশগ্রহণের হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারীর অবদান

বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারীরা বড় ভূমিকা রাখছেন। সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প, যেখানে ৬৫ শতাংশ নারী। এই খাতে কয়েক মিলিয়ন নারী কাজ করছেন এবং তাদের শ্রমই বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এছাড়া কৃষিখাতেও নারীর বড় অংশগ্রহণ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, কর্মরত নারীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ কৃষিখাতে যুক্ত।

তবে শিল্প ও সেবা খাতের অনেক উচ্চমূল্যের পেশায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম। প্রযুক্তি, আর্থিক খাত বা ব্যবস্থাপনায় নারীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীর সংখ্যা কম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মাত্র ৭ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নারী।

ভবিষ্যতে করণীয়

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জোরদার করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, নারীদের কর্মসংস্থান, পোশাক ও কৃষিখাতের বাইরে প্রযুক্তি, শিল্প ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেয়েদের প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবহন এবং শিশু পরিচর্যা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, নারীদের ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহজ ঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। সবশেষে নেতৃত্ব ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।

আইএইচও/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।