নানান ভাবনায় নারীও নিজেকে পিছিয়ে রাখে

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৫৭ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম। প্রশাসনের নারী ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের সভাপতি। তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিসিএস ১৯৮৬ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা নাজমানারা দেশের প্রথম নারী বিভাগীয় কমিশনার।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান। অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির পর হন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার। পরে কৃষি বিপণন অধিদফতরের মহাপরিচালক হন নাজমানারা। সেখান থেকে আসেন কৃষি মন্ত্রণালয়ে। এরপর হন খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়।

এর আগে নওগাঁর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ময়মনসিংহ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এই নারী।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে তিনি প্রশাসনে নারীদের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মাসুদ রানা

জাগো নিউজ: বর্তমানে প্রশাসনে নারীর অবস্থান মূল্যায়ন করুন।

নাজমানারা খানুম: বর্তমানে নারীরা অনেক ভালো অবস্থানে আছি বলে আমি মনে করি। নারীরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে না পারলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও অনুপ্রেরণায় অনেকটাই এগেয়েছি আমরা। কাজ করছি, লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। এখন সচিব পদে নারীরা রয়েছেন, এখন নারীরা বিভিন্ন দফতরপ্রধান।jagonews24জাগো নিউজ: প্রশাসনে নারীদের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা কী?

নাজমানারা খানুম: নারীদের জন্য কর্ম পরিবেশটা এখনো আমরা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে পারিনি। সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নারীরা এখন নারী হিসেবে আনুকূল্য পেতে চান না। তারা চান পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া হোক, যোগ্যতা অনুযায়ী আসন দেয়া হোক। আমরা এখনো যে যোগ্যরা যোগ্য আসন পাচ্ছি, সবক্ষেত্রে সেটি আমরা বলতে পারছি না। সম্মানজনক অবস্থান মেয়েদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মেয়েরা ভালনারেবল, সামান্য কারণেই তাদের সম্মানহানি হয়। নানা স্পর্শকাতর বিষয়ের মুখোমুখি হয়, সেখানে তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংগঠনের প্রধান হিসেবে এমন বিষয় আমার নলেজে আসে। অনেক সময়ই আমরা এর প্রতিবিধান করতে পারি না।

অনেক সময় দেখা যায়, যে বিষয়টি নিয়ে সমস্যা সেটি আমরা প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। প্রকাশ করলে সেই নারী সামাজিকভাবে হেয় হবে। বিচার পাবে কি পাবে না, সেটিও সে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। আমরাও বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারি না। ওই নারী মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই জায়গায়টিতে আমাদের অনেক কাজ করার বাকি আছে।

সহকর্মীদের হাতে নিগৃহীত হওয়া নারী কর্মকর্তাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা। সরকারি-বেসরকরি কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশের জন্য সরকারকে আরও উদ্যোগ নেয়া দরকার। মনিটরিংটা বাড়ানো দরকার, যেন নারী হয়রানির শিকার না হয়।

জাগো নিউজ: বলছেন নারীদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো যোগ্যদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না?

নাজমানারা খানুম: ১৯৮২ সালের আগে বিসিএসে মেয়েদের প্রশাসনে চয়েজ দেয়ার সুযোগ ছিল না। এটা একটা বিরাট বৈষম্য ছিল। সেই অপশন আগে থেকে থাকলে এখন হয়তো প্রশাসনে ৫০ শতাংশ নারী দেখা যেত। বিলম্বে হলেও এখন যে পর্যায়ে মেয়েরা এসেছে, সেটাও অনেক এগিয়েছে এটা বলা যায়। হয়তো আরও যোগ্যরা আছেন যারা তাদের প্রাপ্যটা পাননি। এটা একটা আপেক্ষিক বিষয়। এটা পুরুষের ক্ষেত্রেও তো হচ্ছে। অ্যাপেক্স বডিতে সবাই যেতে পারবে না, সেটার জন্য বিভিন্ন ক্যালকুলেশন আছে।

জাগো নিউজ: অনুকূল কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের উদ্যোগ কি যথেষ্ট?

নাজমানারা খানুম: আমাদের তো আইন-কানুন আছে। আইনগুলো কার্যকর করলে পরিবেশ উন্নত হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন আছে। গত বছর আইনের শাস্তি আরও শক্ত করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থাটা আরও জোরদার করা দরকার। বিচার কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করা দরকার। অনেক বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে ভুক্তভোগী হয়তো আপস করে ফেলে। আবার হয়তো ওই অফিসে চাকরি করতে হলে তাকে অন্যায়টা মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়।

জাগো নিউজ: প্রশাসনে নারীদের হয়রানির প্রতিকার কি তাহলে যথাযথভাবে পাওয়া যায় না?

নাজমানারা খানুম: সবসময় যে প্রতিকার পাওয়া যায়, তা নয়। নারীদের একটু সমস্যা হচ্ছে তাদের পরিবারকেও দেখতে হয়। সন্তান ধারণ ও সন্তান লালন-পালন করতে হয়, সেক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় যথাযথ অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। অনেক সময় হয়তো নারী কর্মকর্তা সহকর্মীর সহযোগিতা চায়, বসের সহানুভূতি তার জন্য প্রয়োজন হয়। অনেক সময় দেখা যায় এসব সুযোগে নারীকে অপব্যবহার করা হয়। আমরা হয়তো অনেক সময় এর বিচারের ব্যবস্থা করতে পারি, অনেক ক্ষেত্রেই পারি না।jagonews24জাগো নিউজ: কেন পারা যায় না?

নাজমানারা খানুম: ওপেন হলে পরবর্তী সময়ে যে আফটার ইফেক্ট, সেটা তার জন্য সুখকর হয় না। আমাদের সামাজিক অবস্থার কারণে মুখ বুঝে হয়তো অন্যায়টা সহ্য করতে হয়।

জাগো নিউজ: প্রশাসনের কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা সেভাবে আসতে পারেনি?

নাজমানারা খানুম: মেডিকেল কলেজগুলোতে সেভাবে নারী অধ্যক্ষ নেই। নারীরা অনেক আগে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় আসছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি খুব কম হচ্ছেন। আটটি বিভাগীয় কমিশনার পদের মধ্যে কমপক্ষে দুটি বিভাগে নারী বিভাগীয় কমিশনার থাকতে পারে। এই জায়গাগুলোতে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।

জাগো নিউজ: প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা কেন পিছিয়ে আছে বলে মনে করছেন?

নাজমানারা খানুম: নারীরা রিস্ক নিয়ে কাজ করতে পারিবারিক সাপোর্টটা সেভাবে পায় না। শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা বদলির ভয়ে পদোন্নতিও নিতে চান না। পদোন্নতি হলেই তাকে দূরে চলে যেতে হবে। আমাদের সোশ্যিও-পলিটিক্যাল যে পরিবেশ, তাতে সে মনে করে সেখানে আমি টিকতে পারব কি-না।

এই পিছিয়ে থাকাটা...সবসময় যে আমাদের দেয়া হচ্ছে না তা নয়, অনেক সময় আমরা নিজেরা নিজেদের পিছিয়ে রাখি। মনে করি আমার পরিবার ডিস্টার্বড হবে, সন্তানের পড়ালেখায় ক্ষতি হবে, ওখানে গেলে আমার একটা রিস্কি সিচুয়েশন ফেস করতে হবে। সবসময় যে মেয়েদের ধরে-বেঁধে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে তা নয়। আমরা আমাদের নিজেদের কারণেও পিছিয়ে থাকি। আমি আমার কলিগদের বলি, তুমি সবসময় নিজেকে নারী মনে করো কেন? মাথার মধ্যে ‘আমি মহিলা’ এটা থাকলে তুমি কখনো ভাল কাজ করতে পারবা না।jagonews24জাগো নিউজ: প্রশাসনে নারী কতটা সততার সঙ্গে কাজ করতে পারছে?

নাজমানারা খানুম: নারী কর্মকর্তাদের একটা সুবিধা হচ্ছে যারা খারাপ মানসিকতার লোক বা দুর্নীতিগ্রস্ত লোক, তারা নারী কর্মকর্তাদের কাছে ভিড়তে চায় না। খারাপ অ্যাপ্রোচটা করতে চায় না। ভাগাভাগির যে সম্পর্ক সেটা তৈরি করতে পারে না। আমি শক্ত কথা বলে তাকে দমিয়ে দিতে পারি। যে দৃঢ়তা আমি দেখিয়েছি, তা আমরা পুরুষ সহকর্মী দেখালে হয়তো সে লাঞ্ছনার শিকার হতে পারত।

কোনো নারী যদি সততা বজায় রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করতে চায় তবে কোন কিছুই তার জন্য প্রতিবন্ধক হয় না। তাই বলব নারীকে কেউ জোর করে অসৎ পথে নিতে পারে না, আমি যদি অসৎ না হই। এই সুবিধাটা নারীর রয়েছে। সততা ও নিয়মানুবর্তিতার বিষয়টি নারীর মধ্যে বেশি পাওয়া যায়।

জাগো নিউজ: নারীদের জন্য বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক কী কী কাজ করে?

নাজমানারা খানুম: সেমিনার বা অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা মেয়েদের ক্যাডার সার্ভিসে আসতে উৎসাহিত করি। তারা যেন বিসিএস পরীক্ষাটা দেয়। সরকারি চাকরিতে যেন তারা এগিয়ে আসে, এটা আমরা চাই। নারীর ক্ষমতায়ন হোক। করোনার মধ্যে আমরা বাজেটের ওপর সেমিনার করেছি। সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে মেয়েরা কীভাবে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এর ওপর মোটিভেশন করেছি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীরা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, অবদান রাখতে পারে, সেভাবে নারীদের প্রস্তুত করার জন্য আমরা বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছি।

আরএমএম/এসএস/এইচএ/এমকেএইচ

নারীদের জন্য কর্ম পরিবেশটা এখনো আমরা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে পারিনি। সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নারীরা এখন নারী হিসেবে আনুকূল্য পেতে চান না। তারা চান পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া হোক, যোগ্যতা অনুযায়ী আসন দেয়া হোক

মেয়েরা ভালনারেবল, সামান্য কারণেই তাদের সম্মানহানি হয়। নানা স্পর্শকাতর বিষয়ের মুখোমুখি হয়, সেখানে তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

অনেক বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে ভুক্তভোগী হয়তো আপস করে ফেলে। আবার হয়তো ওই অফিসে চাকরি করতে হলে তাকে অন্যায়টা মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়

সবসময় যে আমাদের দেয়া হচ্ছে না তা নয়, অনেক সময় আমরা নিজেরা নিজেদের পিছিয়ে রাখি। মনে করি আমার পরিবার ডিস্টার্বড হবে, সন্তানের পড়ালেখায় ক্ষতি হবে, ওখানে গেলে আমার একটা রিস্কি সিচুয়েশন ফেস করতে হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]