মাদকের ভয়াল থাবায় আক্রান্ত ঢাবি


প্রকাশিত: ০৮:৩৯ এএম, ০৭ মে ২০১৫

মাদকের ভয়াল থাবায় আক্রান্ত দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। হাত বাড়ালেই মিলে যাওয়া এসব নেশাদ্রব্যের কালোছায়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ষোলো কোটি মানুষের স্বপ্নের জায়গা থেকে গড়ে উঠা আগামীর নেতৃত্ব। আর এতে করে বিপন্ন হচ্ছে হাজারও শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় এসব নেশাদ্রব্যের রমরমা ব্যবসাও চলে এখানে। দেয়ালে দেয়ালে লিফলেট টানিয়েও সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বনাশা নেশাদ্রব্যের।

হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ দেশি-বিদেশি নানা মাদকদ্রব্য। জন্মদিন, ছুটির দিন, উৎসব-অনুষ্ঠান, বন্ধুদের এক সঙ্গে মিলনে ব্যবহার বেড়ে যায় মাদক দ্রব্যের। আবার এসব নেশাদ্রব্য সেবনে হলের বড় ভাইদের থেকে ট্রিটও আদায় করে থাকেন হলের ছোট ভাইয়েরা।

পরবর্তীতে একসঙ্গে চলে এ নেশাদ্রব্য সেবন পর্ব। সর্বনাশা নেশাদ্রব্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ইতোপূর্বে গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতারা থাকছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চারুকলা অনুষদ, ছবিরহাট থেকে শুরু করে শিখা চিরন্তন, টিএসসির উল্টো দিকে মুক্ত মঞ্চ, বুয়েটের শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে প্রতিনিয়তই রাত্রিবেলা মাদক   সেবনের আসর বসে।

মাত্র ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকার বিনিময়ে ক্যাম্পাসের আশপাশের বিভিন্ন স্পটে পাওয়া যাচ্ছে এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় খোলা দোকানিরা এমনকি পায়ে হেঁটে চা-সিগারেট বিক্রয়কারীরাও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

সর্বশেষ গত ছয় মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে পাঁচটি মাদকের চালান ধরা পড়ে। এ সময় গ্রেফতার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতাসহ ১৭ জনকে। তবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন মূল হোতারা। আটকরা তাদের ব্যাপারে তথ্য দিলেও নীরব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ।

এরই ধারাবাহিকতায় রোববার রাতে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দেলোয়ার হোসেনের বাসায় অভিযান চালায় শাহবাগ থানা পুলিশ। এ সময় ওই বাসা থেকে প্রায় ২০০ পিস ইয়াবা, ইয়াবার খালি প্যাকেট, মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। আটক করা হয় কর্মচারী দেলোয়ার ও তার স্ত্রী বিলকিস বেগমকে। পরে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ঘটনায়  দেলোয়ার হোসেনকে এক বছর ও তার স্ত্রীকে নয় মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হলের কয়েকজন ছাত্রনেতার যোগসাজশে এ কর্মচারীর স্ত্রী এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। এতে হল শাখা ছাত্রলীগের সম্পাদক পর্যায়ের দুই নেতা জড়িত বলে জানান হলের একাধিক কর্মচারী।

২৫ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ১৫০ ক্যান বিয়ারসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। এদের মধ্যে দুজন হল শাখা ছাত্রলীগের নেতা। পুলিশের কাছ থেকে তাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য আইন ও পুলিশি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

১৯ জানুয়ারি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৯০০ পিন ইয়াবাসহ দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে প্রক্টরিয়াল টিম ও শাহবাগ থানা পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করলেও মূল হোতাদের ধরতে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। এদের মধ্যে মো. রাসেল উদ্দিন নামের একজন সাভারে প্রায় এক হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক হয়ে ছয় মাস জেলও খাটেন বলে জানা যায়।

২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর একই হলের গেট থেকে এক হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ বহিরাগত সাতজনকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। দুটি সিএনজি অটোরিকশায় করে হল থেকে এ বিশাল চালান নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা হলের ৩১১, ৩৩৭ এবং ৩৩৮ নম্বর কক্ষের কথা উলে­খ করে। এসব কক্ষে ছাত্রলীগের সাবেক এবং বর্তমান কয়েকজন নেতা থাকেন।

গত বছরের থার্টিফার্স্ট নাইট উপলক্ষে আগের দিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মাদকদ্রব্য বিক্রির লিফলেট টানায় মাদক ব্যবসায়ীরা। সেদিন রাতে মদ বিক্রির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল মাঠে তিনজনকে হাতেনাতে আটক করে গণধোলাই দেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

পরে তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাকি দুজন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে জানা যায়। ঢাবির ওই ছাত্র মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা মিঠু জড়িত আছে বলে জানায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. আমজাদ আলী জাগো নিউজকে জানান, ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। তাদের বিরুদ্ধে থানায় বিভিন্ন সময় মামলাও করা হয়।

এমএইচ/বিএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।