জসিম ভাইয়ের দুঃখ ঘোচাবে কে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
প্রকাশিত: ০১:২১ পিএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০২০

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত যারা আবাসিক হলে থেকেছেন তাদের সকলেরই পরিচিত মুখ ‘জসিম ভাই’। সবার সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে মো. জসিম উদ্দিনকে সবাই ‘জসিম ভাই’ বলেই ডাকেন।

তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনার সাক্ষী মো. জসিম উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার জড়িয়ে আছে অনেক আবেগ-অনুভূতি ও স্মৃতি। এখানে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি মায়ার বাঁধনেই বেঁধে রেখেছেন। কিন্তু তার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি আজও।

স্থায়ী চাকরির আশায় থেকে কেটেছে তিনটি দশক। এজন্য তার আক্ষেপ আর ক্ষোভের মাত্রাটা স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি।

গত তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কত কিছুই না পরিবর্তন হয়েছে। ক্যাম্পাসের পরিধি অনেক বেড়েছে। ক্যাম্পাস থেকে চলে গেছেন অনেকেই। তাদের অনেকেই দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

তবে জসিম ভাই এখনও আছেন ক্যাম্পাসেই। ক্যাম্পাসে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে অন্য দশজনের মতো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সুফল জোটেনি তার ভাগ্যে।

দুঃখ-কষ্টের দিনগুলোর কথা জানিয়ে জাগো নিউজের কাছে ক্ষোভের কথা বললেন মো. জসিম উদ্দিন।

১৯৯২ সালের ৩ মার্চ শাহপরান হলের ডায়নিংয়ে টেবিল বয় হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয় কাজ শুরু করেন তিনি। তখন মাসে বেতন ছিলো মাত্র ৩২৫ টাকা। তারপর বছর দুয়েক পর অস্থায়ীভাবে ডায়নিং পরিচালকের দায়িত্ব পান তিনি। তখন বেতন বেড়ে দাঁড়াই মাসিক ৭০০ টাকায়।

চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালের শুরুতে ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতিতে বারবার অস্থিরতা থাকায় আবাসিক হলে বসবাসরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কয়েক দফা ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একপর্যায়ে হলের ডায়নিংও বন্ধ ঘোষণা করা। এতে তার আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে পড়ে।

উপায়ন্তর না দেখে প্রক্টরিয়াল বডি ও কয়েকজন ছাত্রনেতার সহযোগিতা চাইলেন। তারা তাকে শাহপরান হলের সামনে একটি টং দোকানের ব্যবস্থা করে দেন। তারপর থেকে এতদিন টং দোকানে চা বিক্রি করে সামান্য আয়ে টানাপোড়নের মধ্যেই চলছিল তার সংসার।

কিন্তু এমনিতেই যার কষ্টের শেষ নেই সেই কষ্টের আগুনে ঘি ঢেলেছে এই করোনা মহামারি!

বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মো. জসিম উদ্দিন। বলেন, আমার দিনগুলো কতটা কষ্টে যাচ্ছে হয়ত কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। এতদিন যা আয় হত তা দিয়েই কোনোমতে পরিবারের ভরণ-পোষণ করতাম। কিন্তু করোনাকালীন বর্তমান সময়ে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় মানবেতর দিন পার করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী না থাকায় ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী এলাকায় কর্মক্ষেত্রের অবস্থাও ভালো না। নানা সীমাবন্ধতায় অন্য কোথাও গিয়েও কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় ধার দেনা করে দিনাতিপাত করছি।

ক্যাম্পাসের সবচেয়ে পুরাতন স্টাফদের একজন তিনি। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের আশ্বাসে স্থায়ী চাকরির আশায় এতটি বছর পার করেছেন। এখানকার শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অনেক আবেগ জড়িয়ে থাকায় এ পরিবেশ ছেড়ে আর কোথাও যাওয়া হয়নি তার। এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন।

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক, বড় বড় নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তাদের অনেকেই তার হাতের রান্না খেয়েছে, তার টং দোকানে চায়ের আড্ডায় দিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় কতকিছুই তো পরিবর্তন হয়েছে। একই ক্যাম্পাস থেকে তাদেরও পরিবর্তন হয়েছে। তাদের হাত ধরে এই ক্যাম্পাসের আরও কত মানুষেরই না পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমার ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি।

অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী চাকরির জন্য ৫-৬ বার চেষ্টা-তদবির করেও কোনো ফল হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের জুলাইতেও আবেদন করেছিলাম। ছেলের জন্যও অনেকের কাছে গেছি, কেউ সাড়া দেয়নি।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরজাঙালিয়া গ্রামে পৈতৃক নিবাস জসিম উদ্দিনের। বর্তমানে বসবাস করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী নতুন বাজার এলাকায়। একজনের সামান্য আয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে তার।

ছোট্ট একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাদাগাদি করে থাকেন তিনি। দুই সন্তান স্নাতক পর্যায়ে ও বাকি দুইজন স্কুলে পড়াশোনা করছে। কষ্ট করে হলেও সন্তানদের ভবিষ্যত গড়তে চান। তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান তিনি।

শেষ প্রত্যশার কথা জানিয়ে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, চাকরিটা স্থায়ী না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়া ছেড়ে যেতে পারিনি। আশায় থেকে তিন দশক পার করেছি। আমি বা আমার পরিবারের কাউকে যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্থায়ী একটি চাকরির সুযোগ করে দেয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত সাবেক শিক্ষার্থী বা কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি যেন ক্যাম্পাস বা এর বাইরে আমাকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।

মোয়াজ্জেম আফরান/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।