রহমত উল্লাহর পক্ষে বিভাগীয় সভায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের অভিযোগ
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভায় খন্দকার মোশতাককে ‘শ্রদ্ধা’ জানিয়ে বক্তব্যের ঘটনায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে অব্যাহতি পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিভাগের চেয়ারম্যান ও দুই শিক্ষককের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিভাগীয় সভায় তারা অধ্যাপক রহমত উল্লাহর অব্যাহতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইন সঙ্গত’ নয় বলে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব দেওয়া যায় কি না সে বিষয়ে আলোচনা করেন। এসময় আওয়ামীপন্থী কয়েকজন শিক্ষক প্রতিবাদ করলে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়।
সোমবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহকে সিন্ডিকেট থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় পরীক্ষা কমিটি পুনর্গঠনের জন্য বিভাগের একাডেমিক কমিটির এক জরুরি সভায় এ ঘটনা ঘটে। সভায় উপস্থিত একাধিক সদস্য জাগো নিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সভা সূত্র জানায়, অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহকে সিন্ডিকেট থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় পরীক্ষা কমিটি পুনর্গঠনের জন্য আইন বিভাগের একাডেমিক কমিটির এক জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। এটিই সভার একমাত্র এজেন্ডা ছিল। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। সভায় অধ্যাপক রহমত উল্লাহকে একাডেমিক কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
এর মধ্যে কোনো এজেন্ডা ছাড়াই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান সম্প্রতি অধ্যাপক রহমত উল্লাহকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি আইন সঙ্গত হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কয়েকটি ধারা উল্লেখ করে প্রস্তাব করেন, ‘আইন বিভাগের একাডেমিক কমিটি থেকে এ ব্যাপারে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না সে বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া বা জানতে চাওয়া যায় কি না’- মর্মে লিখিত একটি প্রস্তাব পড়ে শোনান। তার প্রস্তাবে সভায় উপস্থিত একাধিক শিক্ষক প্রতিবাদ করেন।
তারা বলেন, প্রথমত, বিষয়টি আজকের সভার এজেন্ডাতে নেই। ফলে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক বডি। ফলে এ ব্যাপারে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের পরে একাডেমিক কমিটিতে কোনো আলোচনা হতে পারে না। তাছাড়া, সিন্ডিকেট আইন বিভাগের একাডেমিক কমিটির কাছে কোনো আইনি মতামত চায়নি।
তাদের এই প্রতিবাদের পরও অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান ও সহযোগী অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল ড. রহমত উল্লাহর পক্ষে ও তাকে পুনর্বাসন করার জন্য সুকৌশলে নানা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। একপর্যায়ে অন্যান্য শিক্ষকরা বঙ্গবন্ধুর খুনির প্রতি ‘শ্রদ্ধা’ জানানোর জন্য রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের দাবি জানান। এরপর এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই একাডেমিক কমিটির সভা শেষ হয়।
সভায় উপস্থিত একাধিক শিক্ষক জাগো নিউজকে জানান, অধ্যাপক রহমত উল্লাহর বিষয়টি এজেন্ডার মধ্যেই ছিল না। তবে এজেন্ডার বাইরে অনেকে বিবিধ বিষয় আনতে পারেন। অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন এইভাবে বিষয়টি এনেছিলেন। কিন্তু পরে বিষয়টি গৃহীত হয়নি।
অধ্যাপক রহমত উল্লাহর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা শিক্ষকের তিনজনের দুইজনই বিএনপি-জামায়াত সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সঙ্গে জড়িত। অপর আরেকজন আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়।
অভিযোগের বিষয়ে সাদা দলের আইন অনুষদের সাবেক আহ্বায়ক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, ‘ওই ধরনের কথা হয়নি। অন্যরকম কথা হয়েছে। সভা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এমনি আলোচনা হয়েছে। এটা ইনফরমাল আলোচনা। এক জায়গায় বসলে তো অনেক ধরনের কথাই তো হয়। এই বিষয় তো এজেন্ডার মধ্যেও ছিল না।’
লিখিত প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা এমনি ইনফরমাল কথা ছিল। লিখিতভাবে কোনো কিছু আমি উপস্থাপন করিনি। এই বিষয়টি নিয়ে নিউজ করার কিছু নেই।’
অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘এসব রিপোর্ট আপনাদের কাছে ছড়ায় কে? মিটিংয়ে অনেকে মনে করেছেন রহমত উল্লাহ স্যারের বিষয়ে উপাচার্যকে অনুরোধ করা যায়, অনেকে মনে করেছেন যায় না। শেষ পর্যন্ত বিভাগের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন।’
অধ্যাপক বোরহান উদ্দিনের প্রস্তাব সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তোমার কাছেই প্রথম শুনলাম যে, উনি প্রস্তাব করেছেন আর আমি সমর্থন করেছি। এ রকম কোনো কিছু হয়নি।’
সার্বিক বিষয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি তো বিভাগীয় চেয়ারম্যান। ফরমাল আলোচনার বাইরে আমার কিছু বলার নেই। এ ধরনের কোনো ফরমাল এজেন্ডা ছিল না। ইনফরমালি এটা ছাড়াও অনেক আলাপ হয়েছে। এটা সংবাদের বিষয় কি না আমি জানি না।’ লিখিত প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো লিখিত প্রস্তাব পাইনি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সভায় উপস্থিত আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন জাগো নিউজকে বলেন, ‘অধ্যাপক রহমত উল্লাহ একজন খুনির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আমি তার এই বক্তব্যের নিন্দা জানাই। আমি আশা করবো, একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে তাকে যেভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেভাবে তাকে শিক্ষক সমিতি থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হোক।’
আল সাদী ভূঁইয়া/ইএ/জেআইএম