তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপরে
ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি আবার বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। শনিবার সকাল ৬টা থেকে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ বিপদসীমার (৫২ দশমিক ৪০ মিটার) ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সকাল ৯টায় তা আরও ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে, বন্যায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি, জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ড, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ,লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ , রংপুরের গঙ্গচড়া উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত চর ও গ্রামের ১০ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছে।
এদিকে, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়িতে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত এক হাজার মিটার দীর্ঘ বালুর বাঁধের একশ মিটার ধসে গেছে। বাঁধটি রক্ষার জন্য এলাকার শত শত মানুষ বালুর বস্তা ও গাছ, বাঁশের গুড়ি ও খুঁটি ফেলে রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন।
ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ছাতুনামা ও ফরেস্টের চরের ৭০০ পরিবারের বসতভিটায় বন্যায় পানি প্রবেশ করেছে। এসব পরিবারের অধিকাংশ বাড়ি হাটু পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে, উজানের ঢলে ফুঁসে ওঠা তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ও লালমনিরহাট জেলার সানিয়াজান এলাকার ২০ হাজার মানুষ বিপাকে। এছাড়া বিকালে তিস্তা নদীতে বিলীনের পথে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পুরাতন ভবন। এতে স্কুলের নতুন ভবনটিও হুমকির মুখে পড়েছে।
শুক্রবার দুপুরে চরখড়িবাড়ি এলাকা পরিদর্শন করেন ডিমলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তবিবুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নায়েমা তাবাচ্ছুম শাহ ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন। 
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, নদীর ভাঙনে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি যেমন বিলীন হচ্ছে সেই সঙ্গে চরখড়িবাড়ি মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পুরাতন ভবনটিও তিস্তা নদীর বন্যার পানিতে তলিয়ে ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করেছে। হুমকির মুখে পড়েছে স্কুলের নতুন ভবনটি।
টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন জাগো নিউজকে বলেন, শুক্রবার চরখাড়িবাড়ির ১৭টি পরিবারের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। শতশত পরিবার ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে।
ওইসব এলাকার মোতালেব হোসেন, মোমেনা বেগম, মফিজুল ইসলাম, আজিজুল ইসলাম, আব্দার রহমান ও আবুল কাশেম জানান, গত বছর থেকে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের আলামত ফুটে উঠেছিল। ফলে চরখড়িবাড়ির সঙ্গে ভারত সীমান্ত বরাবর তারা তিস্তা নদীর গতিপথকে ঠেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমে এক হাজার মিটার দীর্ঘ বালির বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু তিস্তা যেন রাক্ষুসী হয়ে উঠছে।
বন্যায় চুলো ও টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ার কারণে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে রয়েছে বন্যা কবলিত মানুষগুলো। কোথাও হাটু ও কোথাও কোমড় পানির নিচে চলে গেছে রাস্তা-ঘাট, স্কুল ও বাড়ি-ঘর। পানিবন্দী মানুষজন তাদের ঘর-বাড়ি ভেঙে গবাদী পশু নিয়ে উচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বাঁধের উপর ঘর নির্মাণ করেছে।
এলাকাবাসী আরো জানায়, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানি ছাড়াও বন্যা হওয়ার পেছনে আরো অন্য কিছু কারণ দেখছে চরখড়িবাড়ি এলাকার ভুক্তভোগী অনেকে। তারা বলছে, শুষ্ক মৌসুমে কিছু অসাধু মানুষ মূল নদীতে পাথর ও বালু উত্তোলন করে নদী ভরাট করে ফেলে। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বর্ষাকালে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, শুক্রবার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর প্রবাহ ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। সকাল ৯টা ও দুপুর ১২টায় ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। বিকাল ৩টায় ২ সেন্টিমিটার ও বিকাল ৬টায় আরো ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। রাত ১২টার পর তিস্তার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে শুরু করে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে জানায়, উজানে ঢলে ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানি সকাল ৬টায় ২১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে ও সকাল ৯টায় তা বৃদ্ধি পেয়ে বিপরদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অবহ্যাত রয়েছে।
জাহেদুল ইসলাম/এসএস/এমএস