পঞ্চগড়ে লটকন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের পানিমাছ পুকুরী এলাকার বাসিন্দা কসিরুল ইসলাম। ৫ বছর আগে সুপারি বাগানের ফাঁকে ১১০টি লটকন গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে তার সুপারি বাগান ভরে গেছে লটকন গাছ আর গাছজুড়ে বড়বড় লটকনে।
নতুন হলেও বাগানের অধিকাংশ গাছে গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত ডালপালার দেখা নেই, ঝুলছে শুধুই থোকা থোকা লটকন। কসিরুল ইসলামের লটকন গাছ দেখে প্রতিবেশী কৃষকরাও বাণিজ্যিকভাবে লটকনে আগ্রহী হয়েছেন। অনেকে বাগান করেছেন। আবার কেউ কেউ নতুন করে বাগান করার কথাও ভাবছেন।
পঞ্চগড় এলাকায় ইতোপূর্বে জংলি ফল হিসেবে লটকন ফলকে অবজ্ঞা করা হতো। বাড়ির আশপাশে যত্ন ছাড়াই বড় হতো লটকন গাছ। এক সময় সবুজ থেকে হালকা হলুদ রঙে পরিণত হয়ে খাওয়ার উপযোগী হতো ফলটি। তবে বরাবরই এই ফলের কদর ছিল কম। কিন্তু এখন সে চিত্র বদলে গেছে।
টক আর মিষ্টি মিশ্রিত সুস্বাদু লটকন ফলের কদর বেড়েছে দেশজুড়ে। তাই লটকন এখন আর কোনো অবহেলার ফল নয়। বাড়িতে একটি মাত্র গাছ আছে, এমন কৃষকও ফল বিক্রি করে টাকা আয় করছেন।
স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি লটকনের মূল্য ৬০ থেকে ৮০ টাকা। আগে লটকন ফলের তেমন ক্রেতা ছিল না। তবে এখন জেলার বাইরে থেকেও আসছেন ব্যবসায়ীরা। ভালো দাম দিয়ে গাছ এবং লটকন গাছের বাগান কিনে নিচ্ছেন। তবে বেশি যাচ্ছে বগুড়া, সিলেট, যশোর, মানিকগঞ্জ, খুলনাসহ ঢাকাতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, পঞ্চগড়ে প্রায় ১৬ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের চাষ হয়েছে। বাড়ির আশপাশে ছাড়াও প্রায় বিভিন্ন এলাকায় লটকনের বাগান গড়ে উঠেছে। প্রতি হেক্টরে ৫ থেকে ৮ মেট্রিক টন এবং পরিণত বয়সের প্রতিটি গাছে ২০০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত লটকন উৎপন্ন হয়।
সুপারি, লিচু, আম বা অন্যান্য ফলজ বাগানের ভিতরে সহজেই লটকন চাষ করা যায়। গাছ লাগানোর পর সামান্য পরিচর্যায় ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে ফল দেওয়া শুরু হয়। প্রথম দিকে প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত লটকন ধরে।
পানিমাছ পুকুরী এলাকার কসিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরও গাছে প্রচুর লটকন ধরেছিল। আশা করি এবার দুই থেকে আড়াই হাজার কেজি পর্যন্ত ফল পাবো। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ২ হাজার টাকা মণ দরে লটকন কিনছেন। যশোরের এক ব্যবসায়ী ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। 
আরেক লটকন চাষি মোতাহার হোসেন বলেন, আমার ৬৫টি লটকন গাছের ফল বিক্রী করে এ পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। আরও অনেক ফল আছে। কোনো খরচ ছাড়াই প্রতি বছর আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি।
স্থানীয় বাজারের ফল ব্যবসায়ী আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, কৃষকের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে লটকন কিনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। লটকনের এই ভরা মৌসূমে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে ৩ হাজার কেজি পর্যন্ত লটকন কেনাবেচা করছি।
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পঞ্চগড়ের মাটিতে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান। এখানকার মাটি লটকন চাষের বেশ উপযোগী। এছাড়া লটকন বেশ খাদ্যমানযুক্ত একটি ফল। এতে ক্যালসিয়াম, ক্যারোটিন, খনিজ লবণ ও অন্যান্য ভিটামিনও রয়েছে।
কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয়ভাবে লটকনের চাষ বাড়বে এবং কৃষকরাও লাভবান হবেন বলে তিনি জানান।
সফিকুল আলম/এফএ/এমএম