দূর আকাশের পাখিরাও আজ কাঁদে


প্রকাশিত: ০৬:৪৯ এএম, ২৮ জুন ২০১৬

আজকের (মঙ্গলবার) সকালটা অন্য কোনো দিনের সকালের মতো ছিল না। পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা পশ্চিমপাড়া মহল্লার বাসিন্দাদের।

কারণ পাখিপ্রেমী আলী আজম (৪০) যে আর বেঁচে নেই। তাই হয়তো তার প্রিয় পাখিগুলোও আজ ডাকাডাকি করেনি! সোমবার এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তার।

আলী আজম পেশায় সাংবাদিক। এছাড়া তিনি জেলা ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

মঙ্গলবার সকালে ঘাটুরা পশ্চিমপাড়ায় গিয়ে লক্ষ্য করা গেছে চারদিকে সুনসান নিরবতা। পাখিপ্রেমী আলী আজমের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায় নেমে এসেছে। তাইতো আজমের এই প্রস্থানের সময়টাতে দূর আকাশের ওই পাখিগুলোও যেন নিরবে কাঁদছে।

কাঁদবেই বা না কেনো? ঘাটুরা পশ্চিমপাড়ায় পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রমতো আজমই গড়ে তুলেছিলেন। তার এই অভয়াশ্রম আজ অনেক পাখির আশ্রয়স্থল।

Brahmanbaria

আলী আজমের স্ত্রী সোনিয়া বেগম জাগো নিউজকে জানান, তার স্বামী আলী আজম আপাদমস্তক একজন পাখিপ্রেমী ছিলেন। সারাদিন-সারাক্ষণ পাখি নিয়েই ছিল তার ভাবনা, পরিবার নিয়ে ভাবার যেন সময়ই ছিল না কোনো! গত তিন-চার বছর আগে পাখির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় আজমের। সেই ঝোঁক থেকে ঘাটুরা পশ্চিমপাড়ায় পাখিদের জন্য একটি নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না হলেও অনেক কষ্ট করে নিজ অর্থে পশ্চিমপাড়ার অন্তত অর্ধশতাধিক গাছে কলসি বেঁধে পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এলাকার ছেলেদের ভালো করে বুঝিয়ে বলেছিলেন কেউ যেন পাখিদের বিরক্ত না করেন। আমি যখনই বলেছি এসব পাখি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে সংসার নিয়ে একটু চিন্তা করেন তখনই তিনি আমাকে এড়িয়ে গেছেন।

তিনি আরও জানান, জয় (১২), অন্তত (০৮) ও সাদিয়া (০৬) নামে আমার তিন ছেলে-মেয়ে আছে। আরেক সন্তান আমার পেটে। এই সন্তানদের নিয়ে এখন আমি কি করবো? কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার স্বামী ছাড়াতো কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই পরিবারে। অন্তত তার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য হলেও সমাজের বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দীপক চৌধুরী বাপ্পী জাগো নিউজকে জানান, সাংবাদিক আলী আজম সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। পাখিদের নিয়ে তার মনে একটা বিশাল জায়গা ছিল। পাখি নিয়ে তিনি অনেক লেখালেখিও করেছেন। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায়না। আমরা দুর্ঘটনায় আজমসহ তিনজনের মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

এর আগে সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার বেড়তলা এলাকায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে সাংবাদিক আলী আজমসহ তিনজন নিহত হন। নিহত বাকি দুইজন হলেন- জেলা ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) ও দফতর সম্পাদক শাহজাহান মিয়া (৫০)।

স্থানীয়রা জানান, খাঁটিহাতা হাইওয়ে পুলিশের একটি দল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেড়তলা এলাকায় একটি পাথরবোঝাই ট্রাককে থামার সংকেত দেয়। ট্রাকটি না থামায় এক পুলিশ সদস্য তার হাতে থাকা একটি লাঠি ছুঁড়ে মারে। লাঠিটি ট্রাকটির সামনে থাকা অপর একটি মোটরসাইকেলের চাকায় আটকে যায়। এ সময় মোটরাসাইকেল চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে ওই ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে তিন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।

এ ঘটনায় হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেড়তলা ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ঘাটুরা এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে কয়েক ঘণ্টা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।

পরে দুর্ঘটনার বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে হাইওয়ে পুলিশের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধরা অবরোধ তুলে নিলে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এসএস/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।