মাছ না ধরলে খামু কি?


প্রকাশিত: ০৬:০০ এএম, ২৯ জুন ২০১৬

সোহেল তালুকদার। সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনিরঘোল এলাকার পরিশ্রমী যুবক। দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। জীবন জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন তাকে সুন্দরবনের পশুর নদীর নোনা জলে নৌকা নিয়ে মাছের সন্ধানে বের হতে হয়।

শত প্রতিকূলতা জেনেও ১৫ বছর ধরে এ কাজ করে চলছেন সোহেল। সহায় সম্পদ বলতে জয়মনিরঘোল এলাকার রাস্তার পাশে নদীর উপর টং ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই নেই। ৬ বছরের সুমাইয়া এবং দুই বছরের সাফিয়ার কচি মুখের দিকে তাকিয়েই সাগরজলের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছে সোহেল। সোহেলের মতো অসংখ্য মুখের দেখা মেলে সুন্দরবনের পশুর নদীতে। জীবনযুদ্ধে লিপ্ত সকলেরই জীবনকাহিনী প্রায় অভিন্ন।

ভর দুপুরে নৌকা নিয়ে মাছের সন্ধানে পশুর নদীতে ছুটে চলছে সোহেল তালুকদার (৩২)। হাক দিয়ে মাছ কেমন পেয়েছেন জিজ্ঞাসা করতেই সোহেলের উত্তর `আল্লাহ দেছে, দুই তিনশ টাহার হইবে আরকি।` নৌকা তীরে ভেড়াতে ভেড়াতে সোহেল নিজ থেকেই বললো, `ভাই মাছ না ধরলে খামু কি? এই ধইরাই তো বাঁইচা আছি।`

Bagerhat

সোহেলের এ কথার উত্তর খুঁজে পেতে বেশি দেরি হলো না। আরএফএলের একটি লাল গামলার মধ্যে চিংড়ির রেনু পোনা। অন্য একটি পাত্রে বেশ কিছু সামুদ্রিক সাদা মাছ। জেলে ভাইয়ের নাম ঠিকানা জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললো, সোহেল তালুকদার।

বলতে পারেন ভূমিহীন। জায়গা জমি ভিটে মাটি কিছু নেই। বাবা-মায় নাম রাখতে তালুকদার। এই যে টং ঘর ওই ঘরের দুই মেয়ে আর স্ত্রী আমার সস্পদ।
 
নৌকা থেকে মাছের পাত্র দুটি নামিয়ে ভেজা শরীরে সোহেল জানায়, খুব ছোট বেলায় সে এই এলাকায় এসেছে। তারপর থেকে পশুর নদী ও সুন্দরবনে নৌকা নিয়ে মাছ ধরে সে বড় হয়েছে। নিকটজন বলতে সোহেলের স্ত্রী, শিশু দুই কন্যা সুমাইয়া (৬) ও সাফিয়া (২) তার সব।

Bagerhat

গত এপ্রিল মাসে সুন্দরবনে আগুন লাগার পর বন বিভাগ সুন্দরবনসহ নদীখালে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওই সময়ে নৌকা নিয়ে বনে যেতে পারেনি। লুকিয়ে লুকিয়ে পশুর নদীতে চিংড়ির পোনা ধরে কোনো মতে সংসার চালিয়েছে।

২৬ জুন নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ায় আবার বনে যাচ্ছেন তিনি। তবে ভয় রয়েছে বনদস্যুর। সোহেল হাত উঁচিয়ে (বনের দিকে) দেখিয়ে বলে, কয়দিন আগেও এখানকার ৫ জেলেকে বনদস্যুরা ধরে নিয়ে গেছে। তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। সুন্দরবনে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় যা। পশুর নদীতে জেলেরা নেট দিয়ে চিংড়ি পোনার রেনু ধরায় কোস্টগার্ড প্রায়ই জাল নৌকা কেড়ে নেয়।

তাদের কারণে অন্য জেলেদেরও সমস্যায় পড়তে হয়। বর্তমানে চিংড়ির রেনু পোনার চাহিদা কথা স্বীকার করে সোহেল বলে, ক্ষতি হয় জেনেও রেনু মাছ ধরি অনেকটা বাধ্য হয়ে। অন্য মাছ তেমন পাওয়া যায় না। প্রতিদিন দুই তিন ঘণ্টা নদীতে রেনু পোনা ধরে প্রায় নগদ ২/৩শ টাকায় বিক্রি করা যায়। আর অন্য মাছ দিয়ে চলে দৈনন্দিন  খাবারের কাজ।

সোহেলের ১৫ বছরের পরিশ্রমী জীবনে তিনবার বনদস্যুদের হাতে ধরা পড়েছেন। প্রতিবারই মোটা টাকা দিয়ে মুক্তি মিলেছে তার। কচি শিশু সুমাইয়া আর সাফিয়ার কি হবে সেই ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

সম্প্রতি বনদস্যুদের উৎপাত খুব বেড়ে গেছে। সোহেলের মতে, সুন্দরবনে এক বনদস্যু দল ধরা পড়লে বা বিলুপ্ত হলে সৃষ্টি হয় আরও ৫টি দলের। এ যেন কমছে না। নদী খালে মাছ ধরে যা সঞ্চয় হয় সব যায় নদস্যুদের পেটে।

Bagerhat

জেলে-বাওয়ালিদের আটক করে বনদস্যুদের মুক্তিপণের নামে টাকা আদায় চলছে। এটা কমে গেলে তাদের বেঁচে থাকা সহজ হতো। সরকার যদি সুন্দরবনে বনদস্যু দমন করতে পারতো তাহলে তাদের মতো জেলে-বাওয়ালির জীবন পাল্টে যেত বলে জানায় সোহেল।

জয়মনির ঘোল এলাকার আরেক জেলে মো. দেলোয়ার হাওলাদার (৫২)। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সুন্দরবনের গোলাপাতা, কাঠ সংগ্রহ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলেকে নিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় গড়েছেন বসতি।

দুই মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পারলেও সংসারের ঘানি টানতে শিশু দুই ছেলেকে নিয়ে প্রতিদিনই ছুটতে হয় পশুর নদীতে। প্রায় দুই মাস ধরে সুন্দরবনের পাস পারমিট বন্ধ ছিল তাই পেশা পরিবর্তন করে প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরেই বেঁচে থাকতে হয়েছে। বনে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার খুশি দেলোয়ার।

২০ বছরের হাড়া ভাঙা পরিশ্রমেও দেলোয়ারদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটেনি। কাঠের ঘর ও গোল পাতার ছাউনিতেই জীবন আটকে আছে। বিভিন্ন সময়ে ১২ বার বনদস্যুদের হাতে আটক হয়ে মোটা অর্থের বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছেন তিনি।

সুন্দরবনের জয়মনিরঘোল এলাকার সোহেল তালুকদার, দোলোয়ারের মতো প্রায় একই অবস্থা জেলে তোফাজ্জেল খান, নির্মল ও বাওয়ালী রফিকসহ ব্যবসায়ী মো. টুকু মোড়লের। এখানকার শত শত জেলে বাওয়ালীর জীবন বনদস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ।

নদী তীরের এ সকল বাসিন্ধারা এখন বনে-জলে-জঙ্গলে এমনকি নিজ গৃহে সব সময় বনদস্যুদের ভয়ে আতঙ্কে থাকেন। বছরের পর বছর ধরে বনদস্যু দলের অত্যাচার নিপীড়ন নীরবে সহ্য করলেও প্রাণহানির ভয়ে অনেকেই মুখ খোলে না।

সুন্দর জীবন ও দু`বেলা দু`মুঠো খাবারের আশায় জীবন বাজি রেখে বঙ্গোপসাগর উপকূল ও সুন্দরবনের নদী খালে মাছ ধরে ও বনজ সম্পদ আহরণ করে বেঁচে আছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। আর জেলে-বাওয়ালি-মৌয়াল শ্রেণির বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীকে পুঁজি করে স্বাধীনতার পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একাধিক বনদস্যু বাহিনী সুন্দরবনসহ বঙ্গোপসাগর উপকূলে আধিপত্য চালিয়ে আসছে।

সময়ের সঙ্গে এক একটি বাহিনীর বিলুপ্তির পর অন্য বাহিনীর উত্থান হলেও সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল খেটে খাওয়া মানুষের জীবন জীবিকার কোনো উন্নয়ন হয়নি। যুগ যুগ ধরে জেলে বাওয়ালীদের অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন করেই দস্যুরা ক্ষ্যান্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই মোটা অংকের অর্থ না পাওয়ায় অসহায় মানুষকে হত্যা করে অনেকটা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বনদস্যুরা।

অসহায় যুবক সোহেল তালুকদার, দোলোয়ার, শাহ আলম মাতব্বর, ব্যবসায়ী মুজিবরের প্রত্যাশা সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা নির্মূল করা গেলে উপকূলের লাখো মানুষের জীবন জীবিকার পরিবর্তন ঘটবে। উপকূলসহ সুন্দরবনে শান্তি ফিরে আসবে।

শওকত আলী বাবু/এসএস/এবিএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]