ইতালি যাত্রা

অনাহারে নৌকায় মৃত্যু, সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় লুৎফুর-জুনাইদের মরদেহ

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৮:৩৮ পিএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ভূমধ্যসাগরে নিহত লুৎফুর রহমান তালুকদার ও জুনাইদ মিয়া

ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেছে হবিগঞ্জের দুই যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন। খাবার আর পানির অভাবে নৌকাতেই নিভে গেছে প্রাণ। তবুও হাত ছাড়তে চাননি সহযাত্রীরা। নিথর দেহটি তীরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। দিতে চেয়েছিলেন কবর। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা আর সফল হয়ে ওঠেনি। মরদেহে পচন ধরেছে। শেষ পর্যন্ত বুকে পাথর চাপা দিয়ে প্রিয় সহযাত্রীদের মরদেহ ছেড়ে দিতে হয়েছে সমুদ্রে।

৯ দিন ধরে মিলছে না তাদের মরদেহ। সুখের স্বপ্ন দেখা পরিবারগুলো স্বজন হারিয়ে এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

নিহত দুই যুবক হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান তালুকদার (৪৫) এবং তার ভায়রা লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া (৪০)। তারা গত ডিসেম্বরে সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ায় যান।

একই নৌকায় তাদের সহযাত্রী বেঁচে যাওয়া সুনামঞ্জের দিরাইয়ের আকমল মিয়া তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বর্তমানে গ্রিসের শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।

সেখান থেকে মোবাইল ফোনে আকমল মিয়া জানান, লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ২১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে একটি নৌকা রওনা দেয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। নৌকার দুজন চালক ছিলেন সুদানি নাগরিক। রাতে ২-৩ ঘণ্টা সমুদ্র পথ পারি দেওয়ার পরই চালক রাস্তা হারিয়ে ফেলেন।

ছয়দিন সমুদ্রে নৌকা ভাসতে থাকায় প্রচণ্ড ক্ষুধা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেকেই ভেঙে পড়েন। প্রচণ্ড পানির পিপাসায় বাধ্য হয়ে সমুদ্রের বিষাক্ত পানি অনেককে পান করতে হয়েছে। পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বমি শুরু হয়। মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে নিস্তেজ হয়ে ১৭ জন মারা যান। ২৪ মার্চ মারা যান নৌকায় থাকা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান তালুকদার ও তার ভায়রা ভাই লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া। তাদের মরদেহ একদিন নৌকায় রাখা হয়।

আকমল মিয়া বলেন, ‌‘আমরা সহযাত্রীদের মরদেহ সমুদ্রে ভাসাতে চাইনি। তাদের কবর দিতে চেয়েছি। একদিন পর নৌকার চালক সুদানিরা মরদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। তারাও চেয়েছিলেন ১৭ জন ব্যক্তির মরদেহ নৌকায় রেখে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে বুঝিয়ে দেবেন। কিন্তু মরদেহে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া মরদেহগুলো নৌকায় থাকলে চালকরা বিপদে পড়বেন— এ চিন্তা করে তারা সমুদ্রে ফেলে দেন।’

লুৎফুর রহমান তালুকদারের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দালাল সালামের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে আমার ভাই লুৎফুর রহমান ও তার ভায়রা ভাই জুনাইদ মিয়া ডিসেম্বরে লিবিয়ায় যান। গত ২১ মার্চ আমার ভাই ভাবিকে ফোন করে জানান, তাদের নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে বোট রওয়ানা দেবে। পরে আমরা আর তাদের কোনো সন্ধান পাইনি। রওয়ানা দেওয়ার দুদিন দালালের সঙ্গে যোগাযাগ করা হলে তিনি জানান, তারা গ্রিসে পৌঁছেছেন।’

আরও পড়ুন:
ভূমধ্যসাগর: যেখানে স্বপ্নরা মরে গিয়ে নোনা জল হয়
লিবিয়া-গ্রিসে নৌকাডুবিতে নিহত ৮, উপকূলে ভেসে আসছে মরদেহ
লিবিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে দুই শিশুসহ ৫৩ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ
ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে ৫০ অভিবাসীর মৃত্যু
‘ভালো সুযোগ পেলে ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিতাম না’

সরকারের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ‘২৭ মার্চ ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী বেশ কয়েকজনের মৃত হয়েছে বলে জানতে পারি। এ খবর পাওয়ার পর থেকে আমরা দালাল সালামের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছি। তিনি আত্মগোপন করেছেন বলে জানতে পেরেছি। ৬ মে আমরা জানতে পারি, ভূমধ্যসাগরে নৌকায় খাবার ও পানির অভাবে আমার ভাই ও তার ভায়রা ভাই প্রাণ হারিয়েছেন। সহযাত্রীরা তাদেরকে সাগরে ফেলে দিয়েছেন। আমরা আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কামনা করছি।’

সানাবই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য শাহনেওয়াজ বলেন, নিখোঁজ লুৎফুর রহমান তালুকদার আমার চাচাতো ভাই। লুৎফুর রহমানের সঙ্গে আমার শ্যালিকার জামাতাও রয়েছেন। ২১ মার্চ তাদের গেম (নৌকা) হলেও আজ পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, তারা সেখানে মারা গেছেন। কিন্তু দালালের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। এ অবস্থায় লুৎফুর রহমানের বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী, তিন সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। আমরা অবিলম্বে দালালের গ্রেফতার চাই।’

জানতে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজের বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। এরকম শুনেছি। তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারিনি। বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’

সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বরে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওয়ানা দেন সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে তিন সন্তানের জনক লুৎফুর রহমান (৪৫) ও তার ভায়রা ভাই লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া (৪০)। তারও তিনটি কন্যা সন্তান রয়েছে। জনপ্রতি ২০ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা সদর উপজেলার রিচি গ্রামের বাসিন্দা দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে প্রথমে লিবিয়া যান। সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ২১ মার্চ তারা তাদের পরিবারকে জানান, লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে গেম কিংবা বোট ছাড়বে। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাদের কোনো সন্ধান পাননি।

পরে তাদের সন্ধানের জন্য দালাল সালামের সঙ্গে পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করলে ২৩ মার্চ সালাম জানান, তারা গ্রিসে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তারা সেখানে পৌঁছাননি। এ অবস্থায় ২৭ মার্চ ছড়িয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরে ১৭ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর পর থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সোমবার (৬ এপ্রিল) কয়েকজনের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, লুৎফুর রহমান ও জুনায়েদ মিয়া মারা গেছেন। তাদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।