টেকনাফজুড়ে আর্তনাদ

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ২৬৪

উপজেলা প্রতিনিধি
উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশিত: ০৩:৫৭ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজ সন্তানের খবর দেখে অনিশ্চয়তায় সময় কাটছে পরিবারের সদস্যদের

দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় রোহিঙ্গাসহ ৯ জন উদ্ধার হলেও বাকি আরও ২৬৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার মানুষ রয়েছে।

এ ঘটনায় কক্সবাজারের টেকনাফে নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা জানান, প্রিয়জনদের কোনো খোঁজ না পেয়ে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা তথ্য দেখে তারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।

তারা বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের স্বজনরা সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর এই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে পরিবারগুলো ভেঙে পড়েছে। কেউ জানেন না তাদের স্বজনরা বেঁচে আছেন নাকি সাগরের ঢেউয়ে হারিয়ে গেছেন।

উদ্ধাররা হলেন- কক্সবাজারের শান্তি পাড়ার মো. হামিদ ও মো. সায়াদ আলম, মো. আকবর, হোয়াইক্যংয়ের মো. সোহান উদ্দিন এবং মিরসরাইয়ের মো. হৃদয়, কুতুপালং, ক্যাম্পের মো. রফিকুল ইসলাম, মিসেস রাহেলা বেগম ও মো. ইমরান ও টেকনাফ বড়োডিলের মো. তোফায়েল।

এ বিষয়ে টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের নিখোঁজ এনায়েতুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ কালু বলেন, আমার ছেলে এনায়েতুর রহমান বাড়ির পাশের একটি ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। তার আয়ে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ২ এপ্রিল থেকে সে নিখোঁজ হয়। বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে সে টেকনাফ হয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। একপর্যায়ে খবর আসে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের বহনকারী ট্রলারটি ডুবে যায়। সেখান থেকে কোনোভাবে ৯ জন উদ্ধার হয়ে ফিরে এলে তাদের কাছ থেকেই জানতে পারি, আমার ছেলে এনায়েতুর রহমানসহ আরও নারী-পুরুষ ট্রলারডুবির ঘটনায় সাগরে তলিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, কেউ হয়ত সাগরে ডুবে গেছে, আবার কেউ ভেসে বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কারো সুনির্দিষ্ট কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আরেক ভুক্তভোগীর বাবা জিয়াউর রহমান বলেন, সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় তার দুই ছেলে মোহাম্মদ জুনায়েদ ও মোহাম্মদ তারেক ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হন। তারা এখনো বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তা তিনি জানেন না।

চার-পাঁচ দিন আগে ২৭৩ জন যাত্রী নিয়ে আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ৯ জন কোনোভাবে উদ্ধার হয়ে জীবিত ফিরতে পারলেও বাকি ২৬৪ জনের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যেই আমার ছেলে মোহাম্মদ তারেক রয়েছে বলে জানান আব্দুর রহমান।

তিনি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে টেকনাফ থানায় গিয়ে আমরা কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, ট্রলারডুবির সময় অনেকেই সাগরে ডুবে যায়, আবার কেউ কেউ সাঁতরে বিভিন্ন দিকে চলে যায়। তবে তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা নেই।

আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা রাহেলা বেগম বলেন, ‘আমার এক খালাতো ভাই আমাকে মালয়েশিয়ায় বিয়ে দেওয়ার কথা বলে সাগরপথে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি আন্দামান সাগরে ডুবে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ৯ জন সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছিলাম। পরে একটি ট্রলারের সহায়তায় উদ্ধার হয়েছি। তবে বাকি নারী-পুরুষ কতজন উদ্ধার হয়েছে তা আমি জানি না। আমি নিজের চোখে দেখেছি ১০-২০ জন নারীসহ অনেকেই সাগরে ডুবে গেছে।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে কোস্ট গার্ড থানায় আনলে তাদের প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভিকটিমদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন জানান, চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এম টি মেঘনা প্রাইড গত ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকট ডুবে যায়। পরে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ বাংলাদেশিকে (৮ পুরুষ ও ১ নারী) উদ্ধার করা হয়। পরে মধ্যরাতে উদ্ধারদের কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ মনসুর আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

জাহাঙ্গীর আলম/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।