চার দশক প্রবাসে কাটানো রেমিট্যান্সযোদ্ধার শেষ বিদায়েও ভোগান্তি
মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সেই সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বাহরাইনে পাড়ি দিয়েছিলেন গিরিশ সূত্রধর। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর প্রবাস জীবনে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। ৬০ বছর বয়সী এই রেমিট্যান্সযোদ্ধার শেষ বিদায়টাও হয়েছে অত্যন্ত করুণ।
৪০ বছর যেই দেশ থেকে গিরিশ চন্দ্র রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, মৃত্যুর পর সেই দেশেই তার মরদেহ আটকা পড়েছিল অর্থাভাবে। মরদেহ পাঠাতে দূতাবাস থেকে ছয় লাখ টাকা দাবি করা হলে ভেঙে পড়ে তার পরিবার। অসহায় পরিবারটি দেশ থেকে টাকা পাঠাতে পারছিল না। এ অবস্থায় মরদেহ দেশে আনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন গিরিশ সূত্রধরের পরিবারের সদস্যরা।
অবশেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রচেষ্টায় সরকারি খরচে গিরিশ সূত্রধরের মরদেহ দেশে ফিরেছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের সতর মাঝপাড়া গ্রামে গিরিশ চন্দ্রের বাড়িতে এসেছে তার নিথর দেহ। বিকেলেই আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
গিরিশ চন্দ্র সূত্রধর ওই এলাকার মৃত দুর্গা চরণ সূত্রধরের ছেলে। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে বাঁধন সূত্রধর ১০ম শ্রেণি ও ছোট ছেলে প্রান্ত সূত্রধর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। একমাত্র মেয়ে কলি সূত্রধর সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
বুধবার বিকেলে সতর মাঝপাড়া গ্রামের দুর্গা বাড়িতে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। বাড়ির লম্বা উঠানের এক পাশে মরদেহ রেখে স্বজনরা চারপাশ ঘিরে রেখেছেন। গিরিশ চন্দ্রের স্ত্রী জলি সূত্রধর সন্তানদের নিয়ে মাটিতে লুটে পড়ে কান্নাকাটি করছিলেন। পাশেই গিরিশের ভাই-ভাতিজাসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বাড়ির পাশেই নিয়ে তার শেষকৃত্য করা হয়।

গিরিশ চন্দ্রের স্বজনরা জানান, গত ২৫ মার্চ বাহরাইনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গিরিশ। তার মৃত্যুতে পরিবার যখন শোকস্তব্ধ, তখন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের আচরণ। মরদেহ দেশে আনার জন্য দূতাবাসে যোগাযোগ করেন তার এক ভায়রা।
তারা অভিযোগ করে বলেন, মরদেহ দেশে পাঠাতে দূতাবাস থেকে ১৮০০ দিনার (প্রায় ছয় লাখ টাকা) দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবারটি খুবই অসহায়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। টাকা জোগাড় করতে না পারায় মরদেহ সেখানেই সৎকার করার কথা ভাবছিল পরিবারটি।
এই মানবিক সংকটে গিরিশ চন্দ্রের পরিবারের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় বিএনপি নেতা আলী আকবর। তার মাধ্যমে বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে জানানো হয়। তিনি পরে এক বার্তায় জানান, মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হবে।
অবশেষে বুধবার সরকারি খরচেই গিরিশ চন্দ্রের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। বুধবার সকাল ৮টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে গিরিশ চন্দ্রের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহণ এবং মৃতের ছোট ভাই সমর চন্দ্র সূত্রধরের কাছে হস্তান্তর করেন।
এসময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা হিসেবে পরিবারটিকে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। উত্তরাধিকার সনদপ্রাপ্তি সাপেক্ষে পরিবারকে আরও তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
গিরিশ চন্দ্রের বাড়িতে কথা হয় তার ভগ্নিপতি সুদাংশু সূত্রধরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাহরাইনে গিরিশের ভায়রা ভাই দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। তখন দূতাবাস থেকে বলা হয়, ১৮০০ দিনার লাগবে, তবেই মরদেহ পাঠানো যাবে। সময় লাগবে ৭-১২ দিন। কিন্তু এত টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় আমরা হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। পরে প্রতিবেশী আলী আকবর নামের এক বিএনপি নেতা বাণিজ্যমন্ত্রীকে বিষয়টি জানান। অবশেষে মন্ত্রীর উদ্যোগে সরকারি খরচেই মরদেহ দেশে এসেছে।’
গিরিশ চন্দ্রের আরেক স্বজন নিরঞ্জন সূত্রধর বলেন, প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নের জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেন। অথচ তাদের মরদেহ নিয়ে দূতাবাসগুলো যদি এমন অমানবিক আচরণ করে, তাহলে রেমিট্যান্সযোদ্ধারা কোথায় যাবেন?
তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রবাসীদের মরদেহ হয়রানি ছাড়াই দেশে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
গিরিশ সূত্রধরের ছোট ভাই সমর সূত্রধর বলেন, ৪০ বছর তিনি প্রবাসেই কাটিয়েছেন। কিন্তু নিজে কিছু অর্জন করেননি। বাহরাইনের হাসপাতালে পাঁচদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। পরে তার মরদেহ দেশে আনা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অবশেষে সবার সহযোগিতায় মরদেহ আমাদের হাতে এসেছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘দূতাবাসের দায়িত্ব মানুষকে সেবা দেওয়া। সেখানে যদি কেউ মানুষের সাথে হয়রানি করেন, তাহলে প্রবাসীরা যাবেন কোথায়? দূতাবাসে হয়রানি রোধে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।’
আহমেদ জামিল/এসআর/জেআইএম