কক্সবাজারে কুমির ঘিরে সম্ভাবনা, রপ্তানির জন্য অপেক্ষা
• খামারটিতে আনুমানিক ৪ হাজার কুমির রয়েছে
• বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছে এসব কুমির
• বিদেশি ক্রেতারা খামারে আসতে শুরু করেছেন
সময়টা ছিল ২০১০ সাল। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হাইওয়ে সড়কের বালুখালি টিভি টাওয়ার সংলগ্ন ঘুমধুম-তুমব্রুতে ২৫ একর জমির ওপর বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির প্রজনন কেন্দ্র। খামারটি এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে মানুষ।
খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এসব কুমির। এজন্য নির্দিষ্ট আকৃতি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কুমির কিনতে বিদেশিদের আগমনও বেড়েছে।
কুমিরের এ খামারটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে, কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়ে সড়কের বালুখালি টিভি টাওয়ারের কাছাকাছি ঘুমধুম পাহাড়ি এলাকার তুমব্রু গ্রামে অবস্থিত।
গাইড ওয়ালের ভেতরে পালন করা হচ্ছে এসব কুমির/ছবি-জাগো নিউজ
সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি এলাকার সবুজ বেষ্টনী ঘেরা উঁচু-নিচু ঢাল এবং ছোট-বড় ছড়া বাঁধ দিয়ে পানি আটকে কুমিরের আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। কুমিরগুলো গাইড ওয়ালের ভেতরে থাকা পুকুরে সাঁতার কাটছে। স্থানীয়রা ছাড়াও দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সুযোগ পেলেই খামারটি দেখতে ছুটে আসছেন। টিকিট কেটে খামারের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।
আরও পড়ুন:
পদ্মায় জেলেদের বড়শিতে উঠে এলো কুমির
কুমির চাষে বছরে আয় ১৫ কোটি টাকা
স্ত্রীর শখ পূরণে কুমির হয়ে গেলেন স্বামী
কুমির প্রজনন কেন্দ্রের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা আবু তাহের জানান, ঘুমধুম তুমব্রু কুমির খামার দেখতে প্রতিদিন স্থানীয় দর্শনার্থী ও বিদেশি পর্যটকরা আসেন। স্থানীয়দের জন্য টিকিট মূল্য ৫০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শীতকাল ও বিভিন্ন ছুটির সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। তবে সাধারণ সময়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে মা কুমির ডিম দেওয়ার কারণে টানা তিন মাস খামারটি বন্ধ রাখা হয়। বাকি ৯ মাস দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
গাইড ওয়ালের ভেতরে পালন করা হচ্ছে এসব কুমির/ছবি-জাগো নিউজ
কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে এখনো কোনো কুমির বিদেশে রপ্তানি করা হয়নি বলেও জানান আবু তাহের।
‘খামারটি প্রতিষ্ঠার শুরুতে অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি অস্ট্রেলীয় প্রজাতির কুমির আনা হয়েছিল। প্রতিটি কুমিরের দাম ছিল তিন লাখ টাকারও বেশি। বর্তমানে খামারে আনুমানিক চার হাজার কুমির রয়েছে। এসব কুমিরকে চারপাশে গাইড ওয়াল ঘেরা জলাশয় এবং বিভিন্ন ধরনের লোহার খাঁচায় পানির মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে’—খামারের ইনচার্জ
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘রপ্তানির জন্য কুমিরগুলো নির্দিষ্ট আকারে বড় হতে হয়। তাই নিয়মিত খাবার দিয়ে এগুলোকে লালন-পালন করে বড় করা হচ্ছে।’
কুমিরগুলো বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে খামার কর্তৃপক্ষ। ছবি-জাগো নিউজ
তাহের বলেন, ‘এরই মধ্যে অনেক কুমির উল্লেখযোগ্য আকারে বড় হয়েছে। বিদেশি ক্রেতারাও খামারটি পরিদর্শনে আসছেন। সামনে খামার থেকে কুমির বিদেশে রপ্তানি করা হতে পারে।’
আরও পড়ুন:
দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত দেশের প্রথম কুমির খামার
সাফারি পার্কে স্ত্রী কুমিরকে নিয়ে দুই পুরুষ কুমিরের মারামারি
দিঘির ঘাট থেকে কুকুর টেনে নিলো কুমির, যা জানালেন প্রত্যক্ষদর্শীরা
পরিবার নিয়ে খামারটি পরিদর্শনে এসেছেন শরিফ আহমেদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘তুমব্রু এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এর মধ্যে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে গড়ে ওঠা বিশাল কুমির খামারটি দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। মাঝে মধ্যেই পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসি। আজ বিকেলেও ঘুরে গেলাম।’
তিনি বলেন, খামারটি মূলত বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হলেও এখন এটি স্থানীয়দের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
কথা হয় ঘুমধুম-তুমব্রু কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ সাইম রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, খামারটি প্রতিষ্ঠার শুরুতে অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি অস্ট্রেলীয় প্রজাতির কুমির আনা হয়েছিল। প্রতিটি কুমিরের দাম ছিল তিন লাখ টাকারও বেশি। বর্তমানে খামারে আনুমানিক চার হাজার কুমির রয়েছে। এসব কুমিরকে চারপাশে গাইড ওয়াল ঘেরা জলাশয় এবং বিভিন্ন ধরনের লোহার খাঁচায় পানির মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
টিকিট কেটে খামারে ঢুকতে হয় দর্শনার্থী-পর্যটকদের। ছবি-জাগো নিউজ
কুমিরগুলো দেখভালের জন্য নিয়োজিত রয়েছে কর্মচারী। এদের খাবার হিসেবে দেওয়া হয় মুরগি ও গরুর মাংস।
খামারটি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির প্রজনন কেন্দ্র বলে জানান সাইম রহমান। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হলেও বর্তমানে স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা সবুজ পরিবেশ এবং খামারে নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে।’
খামারের ইনচার্জ সাইম রহমান আরও বলেন, কুমিরগুলো রপ্তানির জন্য বর্তমানে অনেকটা উপযোগী হয়ে উঠেছে। আশা করছি খুব শিগগির এগুলো রপ্তানি করতে পারবো।
এসআর/এমএস