চা বাগানে বেকার, বাইরে মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা

মাহিদুল ইসলাম মাহিদুল ইসলাম , জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ০৫ মে ২০২৬
কৃষিকাজে ব্যস্ত দুই নারী শ্রমিক। ছবি/ জাগো নিউজ

পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলেও মজুরিতে পিছিয়ে মৌলভীবাজারের নারী শ্রমিকরা। শ্রম আইনের তোয়াক্কা না করে অধিক কাজ ও অতিরিক্ত ভার বহন করানো হচ্ছে নারীদের দিয়ে। কিন্তু মজুরি দেওয়া হচ্ছে অর্ধেক।

ধান কাটা, মাড়াই, নির্মাণকাজ কিংবা মাটি কাটাসহ সব কাজেই রয়েছে নারী শ্রমিকের চাহিদা। তবে পুরুষের সমান কাজ করলেও নামমাত্র মজুরি পান তারা। এমন অবস্থায় বৈষম্য দূর করে সমান মজুরির দাবি নারী শ্রমিকদের।

জেলায় প্রায় ৯ লাখ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। এর মধ্যে বাগানে নিয়মিত অনিয়মিত প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। এরমধ্যে নারী শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ। তবে বাগানের বাইরে আরও প্রায় ৮০-৯০ হাজার নারী কাজ করেন। এসব নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের পাশাপাশি ভারী সরঞ্জাম ও অতিরিক্ত ওজন বহনের কাজও করছেন। এতে জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।

চা বাগানে বেকার, বাইরে মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা

জানা গেছে, কৃষি কাজের পাশাপাশি নির্মাণকাজেও অংশ নিচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। তবে এসব কাজে একজন পুরুষ যেখানে দিনে ৬০০-৭০০ টাকা পান, সেখানে একজন নারী শ্রমিক পান ৩০০-৪০০ টাকা মজুরি।

আরও পড়ুন-
মদের নেশায় বেকারত্বে বাঁধা চা শ্রমিকদের ভাগ্য
রমজানে ভিন্ন ছন্দ মালিনীছড়া চা বাগানে
খাসিয়া-চা শ্রমিক: পাশাপাশি বাস অথচ জীবনযাত্রা আকাশ-পাতাল তফাৎ

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে শ্রম আইন, ২০০৬ এর ধারা ৭৪ অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো শ্রমিককে তার ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো ভারী জিনিস উত্তোলন, বহন অথবা নাড়াচাড়া করতে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর বিধি ৬৩ অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো পুরুষ বা মহিলাকে যথাক্রমে ৫০ কেজি ও ৩০ কেজি ওজনের অতিরিক্ত ওজনবিশিষ্ট কোনো দ্রব্য, যন্ত্রপাতি, হাতিয়ার বা সরঞ্জাম কারো সাহায্য ব্যতীত হাতে বা মাথায় করে উত্তোলন, বহন বা অপসারণের উদ্দেশ্যে নিয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর বিধি ৬৮(ট) অনুযায়ী ৫০ কেজির অতিরিক্ত ওজনসম্পন্ন পণ্যের কোনো গাঁট গুদামে ওঠানো, সাজানো ও গুদামজাতকরণ, জাহাজ বা অন্য কোনো পরিবহণে বোঝাই করার কাজ বিপজ্জনক চালনা হিসেবে বিবেচিত বলে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া আইনে উল্লেখ আছে সমকাজে নারী-পুরুষ সমান মজুরি পাবে। তবে এসব কথা শুধু আইনে থাকলেও শ্রমিকদের বেলায় বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, অনেক নারী শ্রমিক কৃষিকাজ, ভবন নির্মাণ, মাটি কাটাসহ নিয়মিত ভারী কাজ করছেন। এসব নারীরা পুরুষের সমান কাজ করলেও পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজ ইচ্ছায় মালিক পক্ষের সঙ্গে এমন চুক্তি করেন নারী শ্রমিকরা।

চা বাগানে বেকার, বাইরে মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা

আরও পড়ুন-
ক্যামেলিয়া হাসপাতালে তালা, একমাস ধরে চিকিৎসাবঞ্চিত লক্ষাধিক চা শ্রমিক
লোডশেডিংয়ের বাগড়ায় ব্যাহত চা উৎপাদন
৫৮ চা বাগানের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বকেয়া, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানে মজুরিবৈষম্য হলে তাদের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এছাড়া যেসব কাজ প্রাতিষ্ঠানিক নয় সেসব কাজে তদারকি করতে পারেন না। তবে কোথাও কোনো আইনে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্যের কথা নেই।

নারী শ্রমিকরা জানান, ঘুম থেকে উঠেই হালকা কিছু খেয়ে কাজে বের হন তারা। আবার সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ঘরের কাজ করেন। এটি চা বাগানের নারীদের প্রতিদিনের চিত্র। এভাবেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম। চা শিল্পে শ্রমজীবীদের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে বেকার। এদের মধ্যে তরুণী ও মধ্যবয়সি নারী শ্রমিকরাও রয়েছেন। জীবিকার তাগিদে চা বাগানের বাইরে ভবন নির্মাণ, মাটি কাটা, মাথায় টুকরি নিয়ে ইট, বালু, পাথর বহনসহ কৃষিকাজেও কাজে নিয়োজিত তারা। তবে কঠিন কাজে নিয়োজিত থাকলেও মজুরি বৈষম্য রয়েছে। পুরুষদের সমান কাজে নিয়োজিত থাকলেও মজুরি পাচ্ছেন অর্ধেক।

নারী শ্রমিক মালতি রবিদাস, অঞ্জনা রবিদাস বলেন, আমাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে নির্মাণকাজ, মাটি কাটা, মাথায় টুকরি নিয়ে ইট, বালু, পাথর বহন, কৃষি কাজ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। এখন আউশ ধান রোপণের সময়। পুরুষ শ্রমিকের মজুরি বেশি থাকায় অনেকেই আমাদেরকে নিয়ে কাজ করান। তবে আমরা কঠিন কাজে নিয়োজিত থাকলেও মজুরি বৈষম্য রয়েছে। অর্থাৎ পুরুষ ৭০০ টাকা মজুরি পেলেও নারীরা পাচ্ছেন ৩০০-৪০০ টাকা। মজুরি বৈষম্য দূর করার দাবি জানান এসব নারী শ্রমিকরা।

জেলার সচেতন নাগরিক মাহমুদ আলী বলেন, যারা গরিব অসহায় নারীদের কাজে এনে মজুরি বৈষম্য করছেন তা ঠিক নয়। একজন হতদরিদ্র নারী তখনই ভারী কাজে আসে যখন তার ঘরে খাবার থাকে না। মালিক পক্ষ এই দুর্বলতার সুযোগে মজুরি কম দেয়। যা এই সমাজে কখনো কাম্য নয়।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক তপন বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা জাগো নিউজকে বলেন, আসলে যেসব নারী শ্রমিক নিজ ইচ্ছায় মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ করেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে শ্রম আইনের কোথাও সমান কাজে নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্যের কথা নেই। যারাই কম মজুরিতে কাজ করেন তারা নিজ থেকেই করেন।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।