গফ্ফার মিয়ার চোখে অন্ধকার, কাঁধে সংসারের বোঝা
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চোখে অন্ধকার দেখছেন গফ্ফার মিয়া (৬১)। যে সময় সুখ, শান্তি আর হেসে খেলে দিন কাটানোর কথা, সে সময় কান্না, বুকভরা হতাশা আর দুশ্চিন্তায় সময় যেন যাচ্ছে না তার। বৃদ্ধ বয়সে পুরো সংসারের বোঝা আবারও নিজের কাঁধে। যে মানুষটি ভালো করেই হাঁটতেই পারেন না, তাকেই আবার নিতে হচ্ছে স্ত্রী, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিদের দায়িত্ব।
রোববার (৩ মে) সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে দুজন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দিনমজুর গফ্ফার মিয়ার সন্তান।
গফ্ফার মিয়ার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ছোট ছেলে আলা উদ্দিন পাঁচ বছর আগে কুকুরের কামড়ে মারা যান। রোববারের ওই দুর্ঘটনায় আজির উদ্দিন (৩০) ও আমির উদ্দিন (২৮) নামের বাকি দুই ছেলেকেও হারান।

নিহত আজির উদ্দিনের ছোট তিন সন্তান রয়েছে। আমির উদ্দিনকেও এবার বিয়ে করানোর ইচ্ছা ছিল আব্দুল গফ্ফারের। দুই ঘটনায় তিন সন্তানকেই হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন গফ্ফার মিয়া ও তার স্ত্রী শামছুন্নাহার।
বুধবার (৬ মে) বৃদ্ধ গফ্ফার মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা চালার একটি ছোট ঘর। ঘরের চালে বড় বড় ছিদ্র। বৃষ্টি হলে অঝোরে পানি পড়ে। এবার বাড়িতে এসে বাড়ি মেরামত করার কথা ছিল দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩০) ও আমির উদ্দিনের। কিন্তু সেটি আর হলো না। দুই ভাই বাড়ি ফিরলেন ঠিকই কিন্তু লাশ হয়ে।

বাড়িতে লোকজন দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন গফ্ফার মিয়া। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের সব শেষ! এখন আমরা কী নিয়ে বাঁচবো? পরিবারটা এখন কীভাবে চলবে?’
আরও পড়ুন: জনমদুখী আনোয়ারার খাবার-ওষুধের খরচ চলে ইট ভেঙে
তিনি বলেন, ‘ছেলেরা বাড়িতে এসেই ঘর মেরামত করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হলো না। কী ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি! শুধু কষ্ট করতে হচ্ছে। আমাদের সব শেষ। এখন আমার ঘরখানা যদি কোনো দয়াবান ব্যক্তি মেরামত করে দিতেন, তাহলে শেষ বয়সে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেয়ে রাতটুকু কাটাতে পারতাম।’
আহাজারি করতে করতে মা শামসুর নাহার (৫৫) জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সব শেষ। এখন তিনটা নাতির মধ্যে একজন প্রতিবন্ধী। তাদের কী করে লালন-পালন করবো?’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ঘরখানাও নড়েবড়ে, ঝড় হলেই ভেঙে যাবে। একজন মা হিসেবে সবার সন্তানদের কাছে অনুরোধ, আমার ঘরখানা কেউ মেরামত করে দেন।’

সিলেটের ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আটজনের মধ্যে সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ছয়জন নির্মাণশ্রমিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিশ্বম্ভরপুরের দুজন, দিরাইয়ের তিনজন ও ধর্মপাশার একজন।
স্থানীয় আজব আলী ও তানজিল আলী নামের দুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সত্যি খুব কষ্ট লাগছে। এক পরিবারের দুই ভাইয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মানা যায় না।’
এ বিষয়ে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল মতিন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তাদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। তাদের ঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিনও দেওয়া হবে। তবে ঘর নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া যায় কি-না, সে বিষয়ে পরে জানাতে পারবো।’
লিপসন আহমেদ/এসআর/জেআইএম