বগুড়ার পশুর হাটে বিএনপি সিন্ডিকেটের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ১১ মে ২০২৬
বগুড়ার একটি পশুহাট। ফইল ছবি
  • একক দরপত্র ও ‘ম্যানেজ’ কৌশলে প্রশ্নবিদ্ধ ইজারা
  • কোটি টাকার হাট ঘিরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
  • ইজারায় অংশ নিতে সাহস পান না সাধারণ ব্যবসায়ীরা

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বগুড়ার কোরবানির পশুর হাটগুলো এখন শুধু পশু বেচাকেনার কেন্দ্র নয়, হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি টাকার অর্থনৈতিক হিসাবের জায়গা। জেলার বড় বড় পশু হাটের ইজারা ঘিরে এবার সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দরদাতাদের ‘ম্যানেজ’ করে, কোথাও চাপ সৃষ্টি করে, আবার কোথাও একক দরপত্র জমা দিয়ে কোটি টাকার হাট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন দলটির নেতারা।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এবং জেলা প্রশাসক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার বগুড়ায় স্থায়ী ৬৪টি এবং অস্থায়ী ২১টি পশুর হাটের ডাক হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বড় হাটে প্রতিযোগিতা থাকলেও অধিকাংশ মাঝারি ও ছোট হাটে কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। বিশেষ করে নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া, শেরপুর ও মহাস্থান এলাকার কয়েকটি হাট নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।

বগুড়ার পশুর হাটে বিএনপি সিন্ডিকেটের দাপট

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার সবচেয়ে বড় পশুহাটগুলোর একটি ওমরপুর হাট। এবার হাটটি ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং মেসার্স তাবাসুম ট্রেডার্সের মালিক মোস্তাফিজার রহমান তারেক। গত বছরও তিনি প্রায় একই প্রক্রিয়ায় ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫০০ টাকায় হাটটি নিয়েছিলেন। এ বছর হাটটির জন্য তারেক ছাড়াও আরও দুইজন দরপত্র কিনেছিলেন। তারা হলেন- নন্দীগ্রাম পৌর বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম এবং শেরপুর উপজেলার বিএনপি সমর্থক ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম শিরু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউ দরপত্র জমা দেননি।

আরও পড়ুন-
পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তে বুথ বসাতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ
ভারতীয় গরুর আধিপত্য নেই, দেশিতেই লাভের আশা খামারিদের
বরিশালে কোরবানির হাট কাঁপাবে ‘লাল মিয়া’

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদল নেতা তারেক তাদের ‘ম্যানেজ’ করে এককভাবে দরপত্র জমা দেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তারেক বিষয়টি স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, আমিসহ তিনজন শিডিউল কিনেছিলাম। পরে অন্য দুইজনের সঙ্গে কথা বলে ম্যানেজ করে আমি এককভাবে শিডিউল জমা দিয়েছি।

নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, হাটটির একক দরপত্র জমা পড়েছে ঠিকই, তবে সরকারি মূল্য অনুযায়ী দর থাকায় নিয়ম মেনেই ইজারা দেওয়া হয়েছে। এখানে অন্যরা কেন জমা দেয়নি সেই বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ধরনের ‘সমঝোতা’ এখন প্রায় সব বড় হাটেই হচ্ছে। প্রকাশ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাধ্য করে সরিয়ে দিয়ে চিহ্নিত গোষ্ঠী হাট নিয়ন্ত্রণ করছে।

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে দুপচাঁচিয়া উপজেলার কয়েকটি পশুহাট নিয়েও। একক দরপত্র জমা দিয়ে উপজেলার সাহারপুকুর হাট নিয়েছেন গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন। তিনি হাটটি ইজারা নিয়েছেন মাত্র ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকায়। কম দরপত্র মূল্য হওয়ার কারণে গত বছর এই হাটটিতে খাস আদায় করেছিল উপজেলা প্রশাসন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এবার অন্য কাউকে এই হাটের দরপত্র কিনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। শুরু থেকেই হাটটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য একরকম নির্ধারিত ছিল। যার কারণে হাটটি তিনিই পেয়েছেন।

বগুড়ার পশুর হাটে বিএনপি সিন্ডিকেটের দাপট

এ ব্যাপারে বিএনপি নেতা মোজাফ্ফর হোসেন দাবি করে বলেন, আমি কাউকে বাধা দিইনি। দলীয় সিদ্ধান্তেই আমাকে হাটটি দেওয়া হয়েছে। আর হাটের ডাকও কম হয়নি। ইজারা প্রক্রিয়ায় অন্য কেউ অংশ না নিলে আমার করার কিছু নেই।

আরও পড়ুন-
‘হোটেলে’ থাকছে গরু, দিনে খরচ ২০০ টাকা
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
পরিবহন খরচ বাড়তি, ঢাকার হাটে কোরবানির পশু তোলা নিয়ে শঙ্কা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই একই উপজেলার আলতাফনগর হাট এবার দুপচাঁচিয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোখলেছার রহমান বাবুর নামে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে হাটটির ডাক উঠেছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে চৌমুহনীহাট এবার ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৭৫০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি রুস্তম আলী হিরো। গত বছর হাটটির ইজারা মূল্য ছিল ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এছাড়া চামরুল ইউনিয়নের মোস্তফাপুরহাট এবার বিএনপি সমর্থক নুর মণ্ডলের নামে ৯৬ হাজার ৬৬৬ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে একই হাটের ডাক উঠেছিল ১ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা। কয়েকটি হাটে আগের বছরের তুলনায় ইজারা মূল্য কমে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন থাকলেও উপজেলা প্রশাসন তাদেরকে চিঠি দিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও সমঝোতার মাধ্যমে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে এগুলোর বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ওই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরুখ খান সাংবাদিকদের জানান, দরপত্র না পড়লে তাদের করার কিছু নেই। তারা একটি করে পেয়েছেন। সেটিই যাচাই বাছাই করে বরাদ্দ দিয়েছেন। এখানে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। বাইরে কেউ ম্যানেজ হয়ে থাকলে বিষয়টি তাদের জানার কথা নয়।

তবে উপজেলার সবচেয়ে বড় ধাপেরহাটি পশুর হাটে প্রশাসন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাটটির সম্ভাব্য ইজারা মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা ধরা হলেও দর উঠেছে ৫ কোটি টাকার মতো। এতে উপজেলা প্রশাসন ইজারা না দিয়ে সরাসরি খাজনা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। হাটসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় সিন্ডিকেটের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এ হাটে কাঙ্ক্ষিত দর ওঠেনি।

আবার বগুড়ার সবচেয়ে আলোচিত পশুর হাটগুলোর একটি মহাস্থান হাট। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এ হাটকে ঘিরে প্রতি বছরই কোটি টাকার লেনদেন হয়। গত বছর হাটটি ৭ কোটি ২৮ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন স্থানীয় রায়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তাহেরুল ইসলাম। এবার সেই হাট ৯ কোটি ৩১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতা আশরাফুল ইসলাম শাহাদত।

তাহেরুল ইসলাম বলেন, এ হাটে দলীয় কোনো প্রভাব ছিল না। আমি ৮ কোটি ১ লাখ টাকা দর দিয়েছিলাম। আমি আর শাহাদত ছাড়া আর কেউ অংশ নেয়নি।

তবে স্থানীয়দের দাবি, বড় হাটগুলোতে এখন আর সাধারণ ব্যবসায়ীরা অংশ নিতে সাহস পান না। কারণ হাট মানেই রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রভাব এবং বিশাল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, বড় পশুর হাট শুধু ইজারা মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশুবাহী ট্রাক প্রবেশ, পার্কিং, খাস আদায়, দোকান বরাদ্দ, বাঁশ-বাতি, খাবারের স্টল, এমনকি রাতের নিরাপত্তা নিয়েও চলে আলাদা লেনদেন। যার অঙ্কটাও হয় কয়েক কোটির ঘরে। যে হাট নিয়ন্ত্রণ করবে, সে পুরো আদায় প্রক্রিয়াটাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া এখন বড় হাটে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ছেন।

বগুড়ার পশুর হাটে বিএনপি সিন্ডিকেটের দাপট

এদিকে জেলার বড় বড় হাট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে একক দরপত্র জমা পড়লেও সেগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য মূল্যের চেয়ে কম দর উঠলেও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি নীতিমালা মেনেই ইজারা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে দর কম বা প্রতিযোগিতা নেই, সেখানে বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, অনেক সময় স্থানীয় সমঝোতার কারণে একক দরপত্র পড়ে। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত মূল্যের নিচে না হলে সেটি বাতিল করার সুযোগ কম থাকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় হাটগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, হাট ঘিরে কোনো ধরনের দখলবাজি বা চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোরবানির হাট ঘিরে সহিংসতা ও চাঁদাবাজি বাড়তে পারে।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।