হান্টাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? এটিই কি হতে পারে পরবর্তী মহামারি?
ক্রুজ জাহাজে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে সম্প্রতি আর্জেন্টিনা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ডাচ মেরু অভিযাত্রী জাহাজ এমভি হন্ডিয়াসে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়াকে ‘নিশ্চিতভাবেই বিস্ময়কর’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ইমিউনোলজিস্ট ও হান্টাভাইরাস গবেষক স্টিভেন ব্র্যাডফুট।
তিনি বলেন, সাধারণত ক্রুজ জাহাজে নোরোভাইরাস বা ই. কোলাইয়ের মতো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। কখনো কখনো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ে, যেমন করোনা মহামারির শুরুর দিকে গ্র্যান্ড প্রিন্সেস জাহাজটি ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে আটকে পড়েছিল।
তবে ব্র্যাডফুটের ভাষায়, ক্রুজ জাহাজকেন্দ্রিক হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা তিনি আগে কখনো শোনেননি। আর পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
গত ৬ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ঘোষণা দেয়, এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসটি ছিল ‘অ্যান্ডিজ ভাইরাস’।
এখন পর্যন্ত মোট আটজন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। আরও তিনজনের উপসর্গ মৃদু। এছাড়া সুইজারল্যান্ডে নতুন একজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যিনি ওই জাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন।
নতুন শনাক্ত হওয়া রোগী ছাড়া বাকি সবাই ৬ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে অসুস্থ হন। তাদের জ্বর ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল উপসর্গ দেখা দেয়। পরে দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন অনেকেই, যার ফলে কয়েকজনের ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
কেপ ভার্দে জাহাজটিকে ভেড়ার অনুমতি না দেওয়ায় এটি এখনো সমুদ্রে আটকে রয়েছে। জাহাজের বাকি যাত্রীদের নিজ নিজ কেবিনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস হলো ‘হান্টাভিরিডি’ পরিবারের একটি ভাইরাস, যা মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে বহন করা হয়। এসব প্রাণী নিজেরা অসুস্থ না হলেও তাদের মূত্র, মল ও লালার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায়।
যখন এসব বর্জ্য নড়াচড়া হয়- যেমন ঘর পরিষ্কার করা, কৃষিকাজ করা বা ইঁদুরে আক্রান্ত কোনো স্থানে প্রবেশ করা- তখন ভাইরাস বাতাসে মিশে যেতে পারে ও শ্বাসের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া দূষিত খাবার খাওয়া বা ভাইরাসযুক্ত কোনো বস্তু স্পর্শ করে পরে মুখে হাত দিলেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রকৃতিতে হান্টাভাইরাসের ৪০টিরও বেশি ধরন রয়েছে। এগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়- ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড’ ও ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’। ওল্ড ওয়ার্ল্ড হান্টাভাইরাস ইউরোপ ও এশিয়ায় বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা ও কিডনির জটিলতা সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, নিউ ওয়ার্ল্ড ভাইরাস আমেরিকা অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়। এসব ভাইরাসে ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যাকে পালমোনারি ইডিমা বলা হয়। বিশেষ করে, নিউ ওয়ার্ল্ড ভাইরাসে সংক্রমণের পরিণতি অনেক ভয়াবহ হতে পারে। এশিয়া ও ইউরোপে আক্রান্তদের মধ্যে ১ থেকে ১৫ শতাংশ মারা যান। কিন্তু আমেরিকা অঞ্চলে হান্টাভাইরাসে আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই মারা যান।
বিশ্বজুড়ে এই সংক্রমণ সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের হান্টাভাইরাসে সংক্রমণ ঘটে, যার বেশিরভাগই এশিয়া ও ইউরোপে। বিপরীতে, আমেরিকা অঞ্চলে বছরে মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ সংক্রমণ রিপোর্ট হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি ও বলিভিয়ায় দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৫ থেকে ৫০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সংক্রমণে হান্টাভাইরাসের কোন ধরন জড়িত, সেটির ওপর নির্ভর করে মৃত্যুঝুঁকি কতটা হবে। একইসঙ্গে এটি বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে ভাইরাসটি কীভাবে ছড়াচ্ছে ও সংক্রমণ ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ইতিহাস
হান্টাভাইরাস নতুন কোনো রোগ নয়। এর নাম এসেছে কোরিয়ার ‘হান’ নদী অঞ্চল থেকে, যেখানে ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের মধ্যে প্রথম এ ধরনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ সালে নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা ও আশপাশের ‘ফোর কর্নার্স’ অঞ্চলে রহস্যজনক শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবের পর এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে গবেষকরা জানতে পারেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই ইঁদুরের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
এরপর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা, চিলি ও পানামায় গত কয়েক বছরে সংক্রমণ বেড়েছে। আর্জেন্টিনায় ২০২৫ সালে নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা ৮৬-তে পৌঁছায় ও মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ।
মানুষে কীভাবে ছড়ায় হান্টাভাইরাস?
সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের মূত্র, মল বা বাসা তৈরির উপকরণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত হয়। যেমন- কেউ যদি গোয়ালঘর পরিষ্কার করেন বা ঝাড়ু দেন, তখন ভাইরাস বাতাসে ভেসে উঠতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ইঁদুরের লালা, মূত্র বা মল যদি কারও ত্বকের ক্ষতস্থানে লাগে বা চোখ, নাক কিংবা মুখে প্রবেশ করে, তাহলেও সংক্রমণ হতে পারে।
তবে অধিকাংশ হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। কেন ছড়ায় না, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যদিও একটি গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, আক্রান্ত মানুষের ফুসফুসে এসব ভাইরাস খুব কম পরিমাণে পূর্ণাঙ্গ ভাইরাস কণা তৈরি করে।
তবে অ্যান্ডিজ ভাইরাস এ ক্ষেত্রে বড় ব্যতিক্রম। নিউ ওয়ার্ল্ডের এই ভাইরাস আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়ের বেশিরভাগ সংক্রমণের জন্য দায়ী।
কেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে অথচ অন্য হান্টাভাইরাস পারে না, এটি এখনো গবেষণার বিষয়। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, অ্যান্ডিজ ভাইরাস মানুষের লালার অ্যান্টিভাইরাল উপাদানের বিরুদ্ধে অন্য ভাইরাসের তুলনায় বেশি প্রতিরোধী। ফলে এটি সহজে নিষ্ক্রিয় হয় না।
তবে স্টিভেন ব্র্যাডফুট বলছেন, অ্যান্ডিজ ভাইরাসও খুব ‘দক্ষভাবে’ ছড়ায় না। হাম বা করোনার মতো বাতাসে দীর্ঘ সময় ভেসে থেকে এটি সংক্রমণ ঘটায় না। তার ভাষায়, একই বিছানায় ঘুমানো, যৌন সম্পর্ক বা একসঙ্গে খাবার ভাগাভাগির মতো ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। তবে এটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে না।
২০১৮-১৯ সালে আর্জেন্টিনায় ঘটে যাওয়া একটি প্রাদুর্ভাব অ্যান্ডিজ ভাইরাসের ভয়াবহতা তুলে ধরে। সেখানে একজন ব্যক্তি প্রথমে ইঁদুর থেকে আক্রান্ত হন। পরে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তার কাছাকাছি বসা তিনজন সংক্রমিত হন। এরপর তারা বিভিন্ন জনসমাগমে অংশ নিলে শেষ পর্যন্ত ৩৪ জন আক্রান্ত হন ও ১১ জন মারা যান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই সামাজিক গোষ্ঠীর একাধিক মানুষ একই সময়ে আক্রান্ত হওয়ার কয়েকটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এর একটি হলো- একজন আক্রান্ত ব্যক্তি বাকিদের সংক্রমিত করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যা কেবল তখনই যুক্তিযুক্ত, যদি সেখানে অ্যান্ডিজ ভাইরাস জড়িত থাকে।
সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব কি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বা এটিই কি হতে পারে পরবর্তী মহামারি?
গত ৫ মে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি ও অতিমারি প্রস্তুতি বিভাগের প্রধান মারিয়া ভ্যান কেরখোভ বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসের ঝুঁকি কম।
স্টিভেন ব্র্যাডফুটও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, হান্টাভাইরাস, এমনকি অ্যান্ডিজ ভাইরাসও মানুষের মধ্যে খুব সহজে ছড়ায় না।
তার সহ-লেখক হিসেবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে এলোমেলোভাবে পরীক্ষা করা প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইঁদুর হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু তারপরও সেখানে বছরে হাতে গোনা কয়েকটি মানব সংক্রমণ দেখা যায়। ব্র্যাডফুটের ভাষায়, ভাইরাসটি খুব দুর্বলভাবে ছড়ায়। তাই এটি বিপজ্জনক হলেও এটির বিস্তার খুব বেশি হওয়ার বা মহামারির পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, বিবিসি, ইনফোবে
এসএএইচ