জোয়ার এলেই নৈসর্গিক সৈকত হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ

আসাদুজ্জামান মিরাজ আসাদুজ্জামান মিরাজ , উপজেলা প্রতিনিধি, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
সরকারি স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়ার পর এখনো পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ/ ছবি: জাগো নিউজ

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে দেখা মিলে নৈসর্গিক সৌন্দর্য। তবে এ সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ভয়ঙ্কল মৃত্যু ঝুঁকি। জোয়ারের ভাঙনে বিলীন হওয়া বিভিন্ন স্থাপনার ভাঙা কংক্রিট ও অবশিষ্টাংশ বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোয়ারের সময় এসব কাঠামো পানির নিচে অদৃশ্য থাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা। ফলে আতঙ্ক নিয়েই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তারা।

পর্যটক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি স্থাপনা থেকে শুরু করে উচ্ছেদ হওয়া অবৈধ রিসোর্টের ধ্বংসাবশেষ অপসারণ না করায় দিন দিন এমন ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রের এ ভয়াবহ বাস্তবতায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সৈকতে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিকদার রিসোর্টের মালিকানাধীন ‘বিচ ক্লাব’ নামের স্থাপনাটি গত ২০২২ সালে গুঁড়িয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। এরপর থেকেই মরণ ফাঁদ হয়ে পড়ে আছে সেই কংক্রিটের অংশগুলো। শুধু তাই না, সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকায় গত ১০ থেকে ১৫ বছর আগের পুরানো টয়লেট এবং ডাকবাংলো সমুদ্র গর্ভে বিলীন হলেও অপসারণ করা হয়নি সেই কংক্রিটের ভাঙ্গা অংশ। যে কারণে গোসলের নামে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা এবং হাত-পা ভেঙে যাচ্ছে অনেকের। যা পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্কে সৃষ্টি করে।

‘জোয়ারের সময় পুরো সৈকতটাই পানির নিচে চলে যায়, তখন কোথায় কী আছে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। এই কংক্রিটগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে থাকে। দুই বছর আগে আমাদের এলাকার মো. ইউনুস নামে এক মোটরসাইকেল চালক খুব ভোরে পর্যটক আনতে গিয়ে হঠাৎ কংক্রিটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যূ হয়’

এছাড়া ২০০৫ সালে জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে ঝাউবন এলাকায় ১ হাজার ৬১৩ হেক্টর জায়গাজুড়ে কুয়াকাটা ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর এটিকে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের উপকূলীয় ভাঙনে উদ্যানের অধিকাংশ অংশই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু স্থাপনাটি বিলীন হলেও রয়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনার কংক্রিটের অংশ, যা বিপজ্জনক। টয়লেট, রান্নাঘর, টিউবওয়েল, গোলঘর, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও প্রধান ফটকের অংশবিশেষ এখনো সমুদ্রের ভেতরে ও সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। অনেক জায়গায় এসব কংক্রিট বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকলেও আংশিক অংশ বেরিয়ে থাকায় তা সহজে চোখে পড়ে না।

জোয়ার এলেই নৈসর্গিক সৈকত হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদকুয়াকাটার জিরো পয়েন্টে পড়ে আছে কংক্রিটের ভাঙা অংশ/ ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয়দের অভিযোগ, জোয়ারের সময় এসব কংক্রিট সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়, ফলে তা দেখা যায় না। এতে পর্যটকরা গোসলে নামার সময় বা জেলেরা নৌকা নিয়ে চলাচলের সময় হঠাৎ করেই আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন
বর্ষা এলেই বুক ধড়ফড় করে চরাঞ্চলের খামারিদের
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা
আতঙ্কের নগরী নারায়ণগঞ্জ, দিনে বের হতেও ভয়

ঝাউবন এলাকার বাসিন্দা মো. মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, জোয়ারের সময় পুরো সৈকতটাই পানির নিচে চলে যায়, তখন কোথায় কী আছে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। এই কংক্রিটগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে থাকে। দুই বছর আগে আমাদের এলাকার মো. ইউনুস নামে এক মোটরসাইকেল চালক খুব ভোরে পর্যটক আনতে গিয়ে হঠাৎ কংক্রিটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যূ হয়। এখনো প্রতিদিন আমরা ভয় নিয়ে চলাফেরা করি। আমরা চাই না আর কোনো পরিবার এভাবে তাদের প্রিয়জনকে হারাক। তাই দ্রুত এসব কংক্রিট সরিয়ে নেওয়া হোক।

‘সৈকতে পড়ে থাকা ভাঙা কংক্রিট ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অপসারণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে বনবিভাগ ও সিকদার রিসোর্টকে এই কংক্রিট সরাতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে জিরো পয়েন্টে যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে অতিদ্রুত অপসারণ করা হবে’

স্থানীয় জেলে মো. সেলিম বলেন, আমরা প্রতিদিন জীবিকার জন্য গভীর সমুদ্রে যাই এবং আবার এই সৈকত দিয়েই ফিরি। কিন্তু জোয়ারের সময় কংক্রিটগুলো একেবারেই দেখা যায় না। অনেক সময় নৌকা থেকে নামার সময় বা জাল টানার সময় পায়ে আঘাত লাগে, পড়ে যাই, রক্তাক্ত হই। অনেকের হাত-পা ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আমরা খুব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি।

ঢাকা থেকে আসা আবু সুফিয়ান নামের এক পর্যটক জাগো নিউজকে জানান, আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঘুরতে এসে খুব আনন্দের সঙ্গে গোসলে নামি। কিন্তু আমাদের একজন বন্ধু আগে নামতেই পানির নিচে থাকা শক্ত কংক্রিটে আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হয়। তার হাঁটু ফেটে যায়, অনেক রক্তপাত হয়। পরে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়। এই ঘটনাটা আমাদের পুরো ভ্রমণের আনন্দটাই নষ্ট করে দেয়। পর্যটনকেন্দ্রে এমন ঝুঁকি থাকা খুবই দুঃখজনক। যদি এসব অপসারণ না করা হয়, তাহলে মানুষ এখানে আসতে ভয় পাবে।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু জাগো নিউজকে বলেন, সমুদ্র ভাঙনের কারণে যেসব স্থাপনা বিলীন হয়েছে, সেগুলোর কংক্রিট অংশ ধীরে ধীরে বালুর নিচে চাপা পড়েছে। কিন্তু পুরোপুরি চাপা পড়েনি অনেক জায়গায়। কিছু অংশ সবসময় বাইরে থেকে যায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

জোয়ার এলেই নৈসর্গিক সৈকত হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদজাতীয় উদ্যানের গেটের ভাঙা অংশ/ ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, কংক্রিটের এই অংশগুলো আরও শক্ত হয়ে ভবিষ্যতে ‘ট্র্যাপ’ হিসেবে কাজ করবে। এতে মানুষ হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে, গুরুতর আঘাত পেতে পারে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। এটি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে এসব অপসারণ করা জরুরি।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার জাগো নিউজকে বলেন, কুয়াকাটা দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক আসেন। সৈকতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কংক্রিট ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো পর্যটকদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।

‘সমুদ্র ভাঙনের কারণে যেসব স্থাপনা বিলীন হয়েছে, সেগুলোর কংক্রিট অংশ ধীরে ধীরে বালুর নিচে চাপা পড়েছে। কিন্তু পুরোপুরি চাপা পড়েনি অনেক জায়গায়। কিছু অংশ সবসময় বাইরে থেকে যায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক’

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে এসব কংক্রিট অপসারণ করুক, যাতে কুয়াকাটার ভাবমূর্তি ও পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নিরাপদ সৈকত নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের আস্থা বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

কুয়াকাটা ২০ শষ্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. রিয়াজ বলেন, সৈকতে ভাঙা কংক্রিটে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিনিয়তই আহত রোগী হাসপাতালে আসছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পায়ে কাটা, রক্তপাত, হাড়ভাঙা ও গুরুতর আঘাতের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। জোয়ারের সময় এসব কংক্রিট পানির নিচে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় আহতদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই শুধু সতর্কতাই নয়, স্থায়ী সমাধান হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ কংক্রিট দ্রুত অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে দুর্ঘটনা ও চিকিৎসা জটিলতা উভয়ই কমবে।

আরও পড়ুন
টেকনাফের খাল-বিল এখন রোহিঙ্গাদের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়
এ বছর ঘনঘন দুর্যোগের কারণ কী?
খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা
দু’বছরে বিসিসির মশা মারার ব্যয় ২১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬ কোটি

ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়নের সহকারী পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, কুয়াকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় এখানে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আমরা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যটকদের সতর্ক থাকার জন্য সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

জোয়ার এলেই নৈসর্গিক সৈকত হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদসৈকতে অবৈধ রিসোর্টের ধ্বংসাবশেষ/ ছবি: জাগো নিউজ

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউসার হামিদ বলেন, সৈকতে পড়ে থাকা ভাঙা কংক্রিট ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অপসারণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে বনবিভাগ ও সিকদার রিসোর্টকে এই কংক্রিট সরাতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে জিরো পয়েন্টে যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে অতিদ্রুত অপসারণ করা হবে।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জাগো নিউজকে বলেন, সৈকতের ভাঙা কংক্রিট ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর বিষয়টি পৌরসভা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অপসারণ কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটার সৌন্দর্য রক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পৌরসভা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। পর্যটনবান্ধব ও ঝুঁকিমুক্ত সৈকত গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

এনএইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।