আতঙ্কের নগরী নারায়ণগঞ্জ, দিনে বের হতেও ভয়
- চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নারায়ণগঞ্জে ৩৯টি হত্যাকাণ্ড
- চুরির ঘটনা ঘটেছে ১০৭টি, ছিনতাই ২৯টি এবং ডাকাতি ২০টি
- দুই মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ৬ হামলা
নারায়ণগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন কিছুতেই উন্নতি হচ্ছে না। একের পর এক খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক বিস্তার, প্রকাশ্যে হামলা নারায়ণগঞ্জবাসীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে, মানুষ এখন দিনে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।
যেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীই নিরাপদ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের জন্য কতটুকু সম্ভবপর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী মামুন জাগো নিউজকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার কারণে জনসাধারণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর যদি হামলা হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে নিরাপত্তা পাবে? সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক শিষ্টাচারের অভাবের কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে। আর এসকল ঘটনার কারণে নারায়ণগঞ্জে সাধারণ মানুষ রাতের বেলা তো বটেই দিনের বেলাও ভয় পায়। এই অবস্থার উন্নতি না হলে জনগণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা হারাবে।
‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে হামলার শিকার হচ্ছে, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? পুলিশই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবে কী করে?’
আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাতেমা আক্তার পপি জাগো নিউজকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করেই আমরা চলাফেরা করি। তারাই যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে কিভাবে নিরাপদ থাকবো। আমরা এখন বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাই। এই সন্ত্রাসীদের কারণে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি।

আরও পড়ুন
পুলিশের ঝুঁকিভাতা-ওভারটাইমসহ এক গুচ্ছ দাবি, সরকারের আশ্বাস
দর্শনা সীমান্তে শক্তিশালী সিন্ডিকেট: সোনা যায় মাদক আসে
খাতা-কলমে লিজ, বাস্তবে জবরদখল
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা
দুই মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ৬ হামলা
গত দুই মাসে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর ছয়টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ৬ মে ফতুল্লার কাশিপুরের হাশেমবাগ এলাকায় অভিযানে গিয়ে একদল পুলিশের সদস্য অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। এসময় আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। যদিও ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত হননি।
এর আগে ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্যরা হামলার শিকার হন। এসময় দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়।
‘সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার কারণে জনসাধারণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর যদি হামলা হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে নিরাপত্তা পাবে? সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক শিষ্টাচারের অভাবের কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে। আর এসকল ঘটনার কারণে নারায়ণগঞ্জে সাধারণ মানুষ রাতের বেলা তো বটেই দিনের বেলাও ভয় পায়। এই অবস্থার উন্নতি না হলে জনগণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা হারাবে’
একই দিন গভীর রাতে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় পুলিশের গাড়ি থেকে একাধিক মামলার আসামি শামীমকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ওই ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গত ৩০ এপ্রিল বন্দরের পুরান বন্দর এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় এক কনস্টেবলের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
একইভাবে গত ১৫ মার্চ শহরের উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে রাতেই অভিযানে নেমে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গত ৯ মার্চ ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমানকে কুপিয়ে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরবর্তীতে বন্দর থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

চার মাসে ৩৯ খুন
জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নারায়ণগঞ্জে ৩৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে ১০৭টি, ছিনতাই ২৯টি এবং ডাকাতি ২০টি। নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১০৪টি। শুধু এপ্রিলেই ১১টি হত্যাকাণ্ড, ২৩টি চুরি, ১০টি ডাকাতি ও ছয়টি ছিনতাইয়ের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর বাইরে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের একাধিক অভিযোগও রয়েছে।
নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে আতঙ্ক। স্থানীয়রা জানান, এখন আর কেউ নিরাপদ বোধ করছেন না।
‘র্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। এরইমধ্যে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
শহরের মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা ইসরাফিল হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে হামলার শিকার হচ্ছে, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? পুলিশই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবে কী করে?’
আমিনুল ইসলাম নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার সময় এখন ভয় লাগে। মোবাইল, টাকা কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়।’
আরও পড়ুন
২৬ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে বালুর সঙ্গে মাটি, আরও আছে নিম্নমানের খোয়া
আয়ের পাল্লা হালকা, ব্যয়ের ভারে ন্যুব্জ শ্রমজীবী
ভেজা ধানেই খোরাকির খোঁজ
ভারতীয় গরুর আধিপত্য নেই, দেশিতেই লাভের আশা খামারিদের
রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘যারা এসব হামলা করেছে তাদের গ্রেফতার করার সক্ষমতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর রয়েছে। অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসবে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে।’
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার নিন্দা জানান জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘অভিযানের ক্ষেত্রে বাহিনীরও পদ্ধতিগত সতর্কতা থাকা জরুরি। অনেক সময় ড্রেসকোড বা পরিচয় নিশ্চিত না থাকলে অপরাধীরা প্রতিপক্ষ ভেবে হামলা চালায়। এসব বিষয়ে আরও সচেতনতা প্রয়োজন।’
গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানুষ বিপদে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আশ্রয় নেয়। যখন সেই বাহিনীই হামলার শিকার হয়, তখন সাধারণ মানুষ আস্থা হারায়। হামলাকারীদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।’

যাব বলছে র্যাব-পুলিশ
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এএইচ এম সাজ্জাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘র্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। এরইমধ্যে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি।
তিনি বলেন, হামলা ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানাই।
এনএইচআর/এসআর/এএসএম