ভবন-জনবল থাকলেও ২৪ বছর ধরে চিকিৎসা নেই হাসপাতালে
- সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় হাসপাতালটি
- নির্মাণে সময় লেগেছে ২৪ বছর
- বিদ্যুৎ বিল বকেয়া সোয়া ৪ লাখ
- জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় চালুর উদ্যোগ নেই
- চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত দেড়লাখ মানুষ
ভবন আছে। জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কাগজে-কলমে। কিন্তু ২৪ বছরেও তালা খোলেনি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ি ২০ শয্যা হাসপাতালের। সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি এখন এক ভুতুড়ে স্থাপনা। উদ্বোধনের আগেই দেওয়ালে ধরেছে ফাটল। বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে আছে চার লাখ টাকা। ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় অন্তত দেড়লাখ মানুষ।
জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২৪ বছর আগে। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম আবু তাহেরের উদ্যোগে চার কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর হঠাৎ প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দুই দশক পর ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুনরায় কাজ শুরু হয়। বাকি কাজ শেষ করতে ব্যয় ধরা হয় ছয় কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪০ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কবির ট্রেডার্স কাজ শেষ করার পর ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ভবনটি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, অকেজো পড়ে থাকা এ হাসপাতালে একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও), দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও একজন মেডিকেল অফিসারসহ মোট ১০ জন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কাউকেই হাসপাতালে আসতে দেখা যায় না। নিয়োগপ্রাপ্ত আরএমও বর্তমানে নোয়াখালীর একটি হাসপাতালে সংযুক্তিতে আছেন। একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যজন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত। বাকি সাত কর্মীকে বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করতে পাঠানো হয়েছে।

সরেজমিন বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে ২০ শয্যার হাসপাতালটি। কাগজে-কলমে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও ভেতরে নেই কোনো আসবাব, ওষুধ কিংবা চিকিৎসা সরঞ্জাম। দোতলা মূল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য রয়েছে আলাদা দুটি কোয়ার্টার। এছাড়া গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের জন্য পৃথক ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে বাইরে থেকে চকচকে মনে হলেও সামনে যেতেই চোখে পড়ে অব্যবস্থাপনার ছাপ। হাসপাতাল ভবনের সামনের অংশের দেওয়াল থেকে এরই মধ্যে পলেস্তারা খসে পড়ছে। পশ্চিম পাশের অংশে দোতলার দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ভেতরে নিচতলার সিঁড়ির পাশের দেওয়াল থেকেও আস্তর খসে পড়ছে। সব মিলিয়ে উদ্বোধনের আগেই ভবনটির দশা এখন জরাজীর্ণ।
আরও পড়ুন
হাসপাতালে সুযোগ থাকলেও পরীক্ষা করতে বাইরে পাঠান চিকিৎসক
অদ্ভুত স্থবিরতায় ধুঁকছে ১০ বার দেশসেরা হওয়া হাসপাতাল
‘রাজনৈতিক বিদ্বেষে’ দেড়যুগেও চাকা ঘোরেনি খাওয়ার স্যালাইন কারখানার
জনবল সংকটে অকেজো হাসপাতালের আধুনিক যন্ত্রপাতি
হাসপাতালটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মোতালেব জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি হাসপাতালটি পাহারা দিচ্ছেন। আগে মাসে ২০ হাজার টাকা করে পেলেও গত আট মাস ধরে পাচ্ছেন মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২০ হাজার টাকা। যার ফলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। রাতে অন্ধকার এবং গরমের মধ্যে পাহারা দিতে খুব কষ্ট হয়। ঠিকমতো টাকা না পাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়েও কষ্টে আছেন বলেন জানান।
হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, হাসপাতালটি চালু হলে বরুড়া উপজেলার আদ্রা, পয়ালগাছা, বাউকসার, লক্ষ্মীপুর ও আড্ডা ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী কচুয়া উপজেলার আশ্রাপুর ইউনিয়নের প্রায় দেড়লাখ মানুষ দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। যাতায়াতের দুর্ভোগ কমে আসার পাশাপাশি দক্ষিণ অঞ্চলের এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আক্ষেপও ঘুচবে।
সোনাইমুড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে কুমিল্লা বা বরুড়া সদরে দৌড়াতে হয়। যাতায়াত সমস্যার কারণে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। হাসপাতালটি চালু হলে এ অঞ্চলের দেড়লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘুচবে।’

পদুয়ারপার গ্রামের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমার বয়স যখন ছয় বছর, তখন থেকে দেখছি হাসপাতালটির কাজ চলে। মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও এখন সেবা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। কেন উদ্বোধন হচ্ছে না, সেটাই আমাদের জানা নেই। রাত-বিরাতে বাচ্চারা অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাতে নেওয়ার পথে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’
আরও পড়ুন
১১ বছর ধরে তালাবদ্ধ কোটি টাকার আইসিইউ
চালুর আগেই হাসপাতালের ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুট
বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদুর রহমান জানান, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত ১০ জন জনবলকে অন্যত্র কাজ করতে হচ্ছে। বর্তমানে সাতজন কর্মী বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত। হাসপাতালটি পরিপূর্ণভাবে চালু করতে আরও অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালটি চালু করার জন্য আমরা ২৮ জন জনবল চেয়েছি। এর মধ্যে ডাক্তারসহ ১০ জন জনবল আমাদের রয়েছে। বাকি জনবল ও আসবাবপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধের বরাদ্দ পেলে শিগগির হাসপাতালটি চালু করতে পারবো বলে আমরা আশাবাদী।’

ভবনে ফাটলের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভবনের কাঠামোতে কোনো সমস্যা নেই। হয়তো দেওয়াল গাঁথুনির কারণে ফাটল দেখা দিতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল সিভিল সার্জন কার্যালয়কেই পরিশোধ করতে হবে বলে জানান তিনি।
জেডআইপি/কেএইচকে/এসআর/এএসএম