৫২ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন এক টাকার মাস্টার

আনোয়ার আল শামীম আনোয়ার আল শামীম , জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ১৬ মে ২০২৬
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান। ছবি/ জাগো নিউজ

৭৮ বছর বয়সেও গ্রামে ঘুরে ঘুরে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। উদ্দেশ্য দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যেন পড়ালেখা থেকে ঝরে না পড়ে। এজন্য সম্মানী হিসেবে নেন দৈনিক নামমাত্র এক টাকা। এজন্য তিনি এলাকায় ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

এই আলোর বাহকের নাম লুৎফর রহমান। এভাবেই নিজের অভাবের বিপরীতে গিয়ে প্রায় ৫২ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। লুৎফর রহমানের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের পাশে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদীর একটি বাঁধে।

এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালে জেলার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামের এক ধনাঢ্য পরিবারে। তার বাবার নাম ফইমুদ্দিন ব্যাপারী। লুৎফর রহমান ফুলছড়ি উপজেলার গুনভরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে তার বাবা সর্বস্বান্ত হলে অর্থাভাবে তিনি আর পড়াশুনা করতে পারেননি।

আরও পড়ুন-
সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নৌকা চালান প্রধান শিক্ষক
কোচিং বন্ধে শিক্ষকদের সই নিলেন প্রধান শিক্ষক
শ্রমিক সংকট, কৃষকের ধান কাটলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

১৯৭৪ সাল থেকে তিনি ওই এলাকার নদী পাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাইভেট পড়ান। বিনিময়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে তিনি প্রতিদিন নেন মাত্র এক টাকা। নিজের পরিবারের সুখ-শান্তির চিন্তা না করে আজও তিনি এই শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো।

নদীভাঙনের নিঃস্ব হয়ে লুৎফর রহমান একসময় গাইবান্ধার সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নেন। সেই থেকে এক টাকার বিনিময়ে তার ছাত্র পড়ানো শুরু। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তারা সবাই বিবাহিত।

‘এক টাকার মাস্টারের কাছে আমার ছেলে-মেয়ে পড়েছে। এখন আমার নাতিরা পড়েন। সকলের উন্নতি হলেও মাস্টারের জীবনের কোনো উন্নতি হয়নি।’

সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটা। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটির ঘণ্টা শেষ হয়েছে আধা ঘণ্টা আগেই। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনের পাড়া গ্রামের এক বাড়ির উঠান থেকে শব্দ আসছে ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা’ কবিতার সুর। সেই বাড়িতে ঢুকে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে গোল হয়ে পড়ছেন এক টাকার মাস্টারের কাছে। অনেক অভিভাবক তার সন্তানকে পড়াতে দিয়ে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে আছেন।

শিক্ষার্থীরা গোল হয়ে এক টাকার মাস্টারের কাছে পড়ছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পড়া শেষে সবাই এক টাকা করে দিচ্ছে লুৎফর রহমানকে পারিশ্রমিক হিসেবে। এভাবে বাগুড়িয়া, মদনের পাড়া, ঢুলিপাড়া, কঞ্জিপাড়া, পুলবন্দিসহ বেশ কিছু গ্রামে হেঁটেই শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন লুৎফর মাস্টার।

স্থানীয়রা জানান, লুৎফর মাস্টার একজন সাদা মনের মানুষ এবং অত্র এলাকায় শিশু শিক্ষার উন্নয়নে একজন নিবেদিত প্রাণ। এলাকার কিছু সংগঠন তাকে সাদা মনের মানুষ হিসেবে পুরস্কৃত করেছেন। পুরস্কৃত করেছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাছে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

৫২ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন এক টাকার মাস্টার

অভিভাবক মর্জিনা বেওয়া বলেন, ‘এক টাকার মাস্টারের কাছে আমার ছেলে-মেয়ে পড়েছে। এখন আমার নাতিরা পড়েন। সকলের উন্নতি হলেও মাস্টারের জীবনের কোনো উন্নতি হয়নি।’

‘আমার ছয় মেয়েই এই স্যারের কাছে পড়েছে। তখন অনেক অভাব-অনটন ছিল। এক টাকা করে দিয়ে এই স্যারের কাছে পড়াইছি আমরা। এখন আমার একটা মেয়ে মাস্টারি করে, একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। শুধু আমারই না অন্যান্য মানুষের অনেকে ছেলে-মেয়ে স্যারের কাছে পড়ে মানুষ হয়েছে।’

আরেক অভিভাবক নাজমা বলেন, ‘আমার ছয় মেয়েই এই স্যারের কাছে পড়েছে। তখন অনেক অভাব-অনটন ছিল। এক টাকা করে দিয়ে এই স্যারের কাছে পড়াইছি আমরা। এখন আমার একটা মেয়ে মাস্টারি করে, একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। শুধু আমারই না অন্যান্য মানুষের অনেকে ছেলে-মেয়ে স্যারের কাছে পড়ে মানুষ হয়েছে।’

আরও পড়ুন-
বছরে এক প্রতিষ্ঠানের দুই শিক্ষকের বেশি বদলি নয়, নারীদের অগ্রাধিকার
শিক্ষার্থীদের জুতার মালা: এখনো শাস্তির বাইরে অভিযুক্ত শিক্ষক
শিক্ষিকাকে বেত দিয়ে পেটালেন আরেক শিক্ষিকা

এক টাকার মাস্টারের ছাত্র আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বয়স ৪০ বছর। আমি নিজেও স্যারের কাছে এক টাকায় পড়েছি। আমার চেয়ে যাদের বয়স ১৫-১৬ বছর বেশি তারাও নাকি স্যারের কাছে পড়েছেন। স্যারের অনেক ছাত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু স্যার জীবনে কিছুই করতে পারেননি।’

লুৎফর রহমানের বড় ছেলে লাবলু মিয়া বলেন, ‘বাবা সমাজের কথা ভাবতে গিয়ে ও গরিব লোকের ছেলে-মেয়েদের পড়াতে গিয়ে আমাদের সংসারের অভাবের কথা কখনো ভাবেননি। তার এই একগুঁয়েমির জন্য আমাদের অনেকদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এখন আমরা দুই ভাই ভালো রোজগার করি। বাবাকে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতে নিষেধ করি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেন না। পড়ানোই তার নেশা।’

‘বাবা সমাজের কথা ভাবতে গিয়ে ও গরিব লোকের ছেলে-মেয়েদের পড়াতে গিয়ে আমাদের সংসারের অভাবের কথা কখনো ভাবেননি। তার এই একগুঁয়েমির জন্য আমাদের অনেকদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এখন আমরা দুই ভাই ভালো রোজগার করি। বাবাকে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতে নিষেধ করি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেন না। পড়ানোই তার নেশা।’

এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান বলেন, ‘শুরুর দিকে সংসারের অভাবের তাড়নায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে এক টাকার বিনিময়ে ছাত্র পড়ানোর কাজ শুরু করি। সেসময় দশ ছাত্রকে পড়িয়ে দশ টাকা পেয়েছি। সেই টাকা দিয়ে বাজারে অনেক কিছু পাওয়া যেত। পরবর্তীতে এই পেশার মাঝেই আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাই এবং অন্য কোনো পেশার কথা কখনো চিন্তা করিনি।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে কখনোই দরিদ্র হতে পারে না। আর লেখাপাড়া না জেনে মরলেও কষ্ট আছে। এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষই গরিব। তাছাড়া আমি টাকার জন্য পড়াই না। আমি পড়াই যাতে ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হয়। পিতা-মাতার মুখে হাসি ফোটাতে পারে।’

লুৎফর রহমান গর্ব করে বলেন, ‘আমি জীবনে হাজার হাজার ছেলে-মেয়েকে পড়িয়েছি। আমার অনেক ছাত্র এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার ও আইনজীবী হয়েছে।’

মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে লুৎফর রহমান বলেন, ‘একটা শিক্ষিত মেয়ে হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষিত মেয়েরা সমাজের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মেয়ে শিক্ষিত হলে সেই পরিবার আলোকিত হবে, আর পরিবার আলোকিত হলেই দেশ আলোকিত হবে।’

‘একজন শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে কখনোই দরিদ্র হতে পারে না। আর লেখাপাড়া না জেনে মরলেও কষ্ট আছে। এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষই গরিব। তাছাড়া আমি টাকার জন্য পড়াই না। আমি পড়াই যাতে ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হয়। পিতা-মাতার মুখে হাসি ফোটাতে পারে।’

এক সময়ের চৌকস লুৎফর মাস্টার বয়সের ভারে এখন কিছুটা নুয়ে পড়েছেন। এখন আগের মতো আর গুছিয়ে কথাও বলতে পারেন না। কিন্তু তাই বলে থেমে যাননি তিনি। এখনও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াচ্ছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। মূলত যেসব অভিভাবকরা টাকার অভাবে সন্তানদের ভালো শিক্ষকের কাছে দিতে পারেন না কিংবা ভালো কোচিং বা স্কুলে দিতে পারেন না, তারাই এই এক টাকার মাস্টারে শরণাপন্ন হন।

সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন-উর রশিদ (ইদু) বলেন, ‘লুৎফর মাস্টার সম্পর্কে গাইবান্ধার সবাই অবগত। সমাজ ও দেশের সেবা করতে গিয়ে তিনি অনেক কষ্টের শিকার হয়েছেন। এমন একজন গুণী মানুষ সমাজে খুবই কম পাওয়া যাবে।’

কলেজশিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, এই জ্ঞানগুরু ৭০-এর দশকের শুরু থেকে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রেখে আসছেন। তিনি শুধু বাগুড়িয়া, মোদনের পাড়া নয়; আশপাশের আট-দশটি গ্রামের শত শত সুবিধাবঞ্চিত শিশুর হাতেখড়ি করিয়েছেন। তিনি একজন নির্লোভ, নিঃস্বার্থ মানুষ। তাই সমাজের বিত্তবান ও রাষ্ট্রের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। লুৎফর রহমানের এই ত্যাগ, মমতা ও নিবেদন আজও এই গ্রামীণ জনপদের শিক্ষায় প্রেরণার বাতিঘর হয়ে জ্বলছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।