চার দশকেও অন্তরালে ওসমানী জাদুঘর
জেনারেল মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। এমএজি ওসমানী নামেই দেশের ইতিহাসে তার নাম লেখা রয়েছে স্বর্ণাক্ষরে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হওয়ার কারণে ১৯৩০ সালে নির্মিত বাড়িটিও গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ধ্বংসযজ্ঞের সেই বাড়িটিই এখন ‘ওসমানী জাদুঘর’। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা এটি।
১৯৮৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে চার দশক পরও দেশের ইতিহাসের এক উজ্বল নক্ষত্র জেনারেল ওসমানীর স্মৃতি বিজড়িত এই জাদুঘরটির খবর জানে না খোঁদ সিলেটের মানুষও।
প্রচার-প্রচারণার অভাবে সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও ‘অন্তরালে’ ওসমানী জাদুঘর। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও তার দুর্লভ নিদর্শন জাদুঘরে সাজিয়ে রাখলেও দেখার কেউ নেই।
দর্শনার্থী বাড়াতে কর্তৃপক্ষেরও নেই প্রচার-প্রচারণা। এমনকি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা পর্যটন সংশ্লিষ্ট দর্শনীয় স্থানের তালিকায়ও নেই ওসমানী জাদুঘরের নাম। এতে করে সিলেটে আসা পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে না জাদুঘরটি।
এদিকে প্রচারণার অভাবে অন্তরালে থাকা জাদুঘরে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে জেনারেল ওসমানীর অনেক দুর্লভ নিদর্শন প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একবছর আগে যুক্তরাজ্য থেকে আসা ওসমানীর ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্র এখনও বাক্সবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৮৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সে সময়ের রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকার পর সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মূলফটক নির্মাণ করে। দৃষ্টিনন্দন ফটকের কারণে এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীদের চোখে পড়ে জাদুঘরটি।

জাদুঘর ঘুরে দেখা গেছে, জাদুঘরের ৩টি গ্যলারিজুড়ে ৪৬৬টি নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শনের বেশিরভাগই মহান মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনের জিনিসপত্র এবং ওসমানীর ব্যবহৃত পোশাকও রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় প্রাপ্ত পদক সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি গ্যালারিতেও দেখা মেলে আতাউল গনি ওসমানীর নিত্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র। দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙানো আছে মুক্তিযদ্ধের দুর্লভ অনেক ছবি। রয়েছে বাবার কোলে থাকা ছোট্ট শিশু ওসমানীর ছবি। এমনকি মৃত্যুর আগে পালন করা শেষ জন্মদিনের ছবিও শোভা পাচ্ছে দেওয়ালে। প্রাচীন স্থাপত্যরীতির আদলে তৈরি এই বাড়িটি ১৯৩০ সালে নির্মিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাদুঘরে কর্মরতরা।
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রথম গ্যালারিতে জেনারেল ওসমানীর ব্যবহৃত সুটকেস, খাট, চেয়ার, বেতের সোফা, পানির পাত্র, টেবিল, বই, বুক সেলফ, কাপড়, আলমারি, ছাতা, লাঠি, জুতা, সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্মসহ বিভিন্ন সময়কার স্মৃতি বিজড়িত ছবি দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে।
‘স্থান সংকুলানের কারণে মুক্তিযুদ্ধের এই মহান নেতার ব্যহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শনীতে রাখা যাচ্ছে না। তিনটি গ্যালারিতে জায়গা না হওয়ায় স্টোর রুমে অনেক জিনিসপত্র রয়েছে। জেনারেল ওসমানীর ব্যবহৃত দুর্লভ জিনিসপত্র একটি বাক্সে করে পাঠিয়েছেন তারই চাচাতো ভাই ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী। কিন্তু জায়গার অভাবে এখনও সেগুলো বাক্সবন্দি রয়েছে।‘
দ্বিতীয় গ্যালারিতে ওসমানীর কর্মজীবনে অর্জিত বিভিন্ন পদক, র্যাংক, ব্যাজ, বুক শেল্ফ, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের একটি চেক বুক, ক্রেস্ট, তলোয়ার, পাসপোর্ট, উপহার সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন চিত্রশিল্পীদের আর্ট করা ছবি, রণাঙ্গনে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার ছবি।
তৃতীয় গ্যালারিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পরিকল্পনা করার জন্য বাংলাদেশের ম্যাপ, পড়ার জন্য জার্নাল, টেবিল-চেয়ার, খাট, খাবারের টেবিল, নামাজের চৌকি, টুপি, রেফ্রিজারেটর ও যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত হ্যান্ড মাইক।
জাদুঘর সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ জন দর্শনার্থী ঘুরতে যান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দর্শনার্থী ৩০-৪০ জন আসা যাওয়া করেন। এরচেয়ে বেশি দর্শনার্থী কখনোই হয় না।
আরও পড়ুন-
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
কড়ি থেকে কাগুজে নোটের সমাহার ‘টাকা জাদুঘর’
জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আলামত প্রদর্শিত হবে স্মৃতি জাদুঘরে
সম্প্রসার হবে বাংলাদেশ লোক-কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের জাদুঘর
তারা আরও জানান, সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তাছাড়া শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য শিশুদের জন্য ১০ টাকা ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা।
জাদুঘরের নিরাপত্তাকর্মী রিপন মিয়া বলেন, এখানে স্থানীয় পর্যটকদের চেয়ে অন্য জেলার পর্যটক বেশি আসেন। কেউ কেউ সন্তানদের নিয়েও আসেন এখানে ঘুরতে। বিদেশিদের মধ্যে বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পর্যটক বেশি আসেন।

তিনি বলেন, স্থান সংকুলানের কারণে মুক্তিযুদ্ধের এই মহান নেতার ব্যহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শনীতে রাখা যাচ্ছে না। তিনটি গ্যালারিতে জায়গা না হওয়ায় স্টোর রুমে অনেক জিনিসপত্র রয়েছে। জেনারেল ওসমানীর ব্যবহৃত দুর্লভ জিনিসপত্র একটি বাক্সে করে পাঠিয়েছেন তারই চাচাতো ভাই ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী। কিন্তু জায়গার অভাবে এখনও সেগুলো বাক্সবন্দি রয়েছে। তবে তালিকায় ওঠার জন্য ওই বাক্সের সব জিনিসপত্র জাতীয় জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে তালিকায় যুক্ত হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাদুঘরের আরেক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে সিলেটের মানুষই এই জাদুঘর সম্পর্কে জানেন না। খোঁদ জাদুঘরের পেছনের বাড়ির লোকও জানে না এখানে কী আছে। কারণ অনেক দর্শনার্থী আসেন, তারা কোনো কিছুই জানেন না। আমরা তাদেরকে বিস্তারিত বলি। যদি প্রচারণা থাকতো তাহলে এই মহান ব্যক্তির স্মৃতি বিজড়িত জাদুঘরে দর্শনার্থীদের ঢল থাকতো।
‘হচ্ছে সিলেটের মানুষই এই জাদুঘর সম্পর্কে জানেন না। খোঁদ জাদুঘরের পেছনের বাড়ির লোকও জানে না এখানে কী আছে। কারণ অনেক দর্শনার্থী আসেন, তারা কোনো কিছুই জানেন না। আমরা তাদেরকে বিস্তারিত বলি। যদি প্রচারণা থাকতো তাহলে এই মহান ব্যক্তির স্মৃতি বিজড়িত জাদুঘরে দর্শনার্থীদের ঢল থাকতো।’
তিনি আরও বলেন, জাদুঘরের সামনে যতটুকু জায়গা রয়েছে, পেছনে তার চেয়েও বেশি জায়গা রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলে পুরো জায়গাজুড়ে জাদুঘর সম্প্রসারণ করা যেতো।
ওসমানী জাদুঘরের সহকারী কিপার নাজমুল হায়দার বলেন, জাদুঘরের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রতিনিধি দল গত ৮ মে আসার কথা ছিল। কিন্তু পরিদর্শনের শিডিউল পরিবর্তন হয়েছে। শিগগিরই তারা আসবেন এবং এটাকে কীভাবে আরও পরিচিত করা যায় সেই ব্যবস্থা নিবেন।
ওসমানীর অনেক নিদর্শন বাক্সবন্দি থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মাস খানেক আগে যোগদান করেছি। এখনও সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনি। জাদুঘরকে কীভাবে ঢেলে সাজানো যায় সেই পরিকল্পনা করছি।’
জাদুঘরের নাম জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে না থাকা প্রসঙ্গে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ডিসি স্যারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবো।’
এফএ/এমএস