অস্তিত্ব সংকটে এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর
একই ছাদের নিচে দেখা মেলে ৮৭টি নদীর পানি। জানা যায় নদীর ইতিহাস-ঐতিহ্য, নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনধারা ও সংগ্রামের নানা তথ্যচিত্র। তবে সময়ের পরিক্রমায় এখন টিকে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের সপ্তম পানি জাদুঘরটির।
২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের অর্থায়নে ‘আভাস’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা ও কারিগর হিসেবে কাজ করে উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের ৪৮৫ জন নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত আত্মনির্ভরশীল সমাজসেবা সংগঠন ‘উপকূলীয় জনকল্যাণ সংঘ’। সংগঠনের সদস্যরা মহাসড়কের পাশে পাখিমারা বাজার সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের ১৫ শতাংশ জমিতে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলেন এই ব্যতিক্রমী জাদুঘরটি।
উপকূলীয় জনকল্যাণ সংঘের সভাপতি ও পানি জাদুঘর পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানান, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীগুলো দিন দিন তাদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। পানির কৃত্রিম সংকট এবং পরিবেশগত ঝুঁকি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, শুরুতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় থাকলেও বর্তমানে দর্শনার্থী একেবারে কমে গেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা থেকে দূরত্ব এবং পর্যাপ্ত প্রচারের ঘাটতির কারণে জাদুঘরটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, জাদুঘরে প্রবেশ ফি শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা এবং অন্যান্য দর্শনার্থীদের জন্য ২০ টাকা। ভেতরে সাদা কাঁচের বোতলে সারিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত রয়েছে বাংলাদেশের ৮৭টি নদীর পানি। এর মধ্যে নেপাল, ভারত, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা আন্তঃদেশীয় ৫৮টি নদ-নদীর পানি এবং ৩০টি দেশীয় নদ-নদীর পানি রয়েছে।
পর্যটক শামিম রেজা বলেন, এখানে এসে ৮৭টি নদীর পানি একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য। এটি জ্ঞানার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। যথাযথ সংস্কার ও উদ্যোগ নিলে এটি দেশ ও জাতির জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।

দোতলা টিনের ঘরটির সামনে বালুর ওপর শিকল দিয়ে নোঙর করা একটি নৌকা স্থাপন করা হয়েছে, যা মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতায় শুকিয়ে যাওয়া নদীর প্রতীকী চিত্র তুলে ধরে। দোতলায় প্রায় ৫০০ বর্গফুট জায়গায় নদীর নাম লেখা সাদা বোতলে পানি সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণ, মাছ ধরার নৌকা, চাঁই, ঝাঁকি জাল, খুচনি জাল, পল্লা, কাঁকড়া ধরার চাঁই, তাঁত মেশিন, বাঁশের ডোলা, রান্নার মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পিতলের বাসনসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা থেকে দূরত্ব এবং পর্যাপ্ত প্রচারের ঘাটতির কারণে জাদুঘরটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে দেশীয় খাল-নদীর ছবি, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জেলে, কুমার ও তাঁতিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনধারার চিত্র।
আরও পড়ুন-
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
বিমানবাহিনী জাদুঘর বন্ধ থাকবে ৩ দিন
সামরিক জাদুঘরে ডিজিটাল পার্কিং সেবা চালু
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর দ্রুত হেরিটেজ ঘোষণা করা হবে: অর্থমন্ত্রী
জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আলামত প্রদর্শিত হবে স্মৃতি জাদুঘরে
জাদুঘরের পরিচালক লিপিমিত্র বলেন, বর্তমানে দর্শনার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি থাকত, এখন গড়ে মাত্র ৩–৫ জন দর্শনার্থী আসেন। ফলে জাদুঘরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে সীমিত আয় ও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে জাদুঘরের অবকাঠামো সংস্কার, প্রদর্শনী উপকরণ সংরক্ষণ এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে পানি জাদুঘর পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম সরকার বলেন, এ জাদুঘরটি উপকূলীয় মানুষের আত্মত্যাগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। নদী ও পানিসম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এটি তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার একটি কার্যকর উদ্যোগ।
‘এখানে এসে ৮৭টি নদীর পানি একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য। এটি জ্ঞানার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। যথাযথ সংস্কার ও উদ্যোগ নিলে এটি দেশ ও জাতির জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।’
তিনি জানান, প্রথমদিকে অ্যাকশন এইডের সহযোগিতায় পরিচালনা ও তদারকির কারণে ব্যাপক সাড়া মিলেছিল এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও ছিল সন্তোষজনক। বর্তমানে কিছু সংস্কারকাজ চলমান থাকলেও পর্যটক আকর্ষণ বাড়াতে আরও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, কুয়াকাটার (উপরা) আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু জাগো নিউজকে বলেন, জাদুঘরটি আমাদের জন্য গর্বের জায়গা। মানুষ ৮৭টি নদীর পানির সঙ্গে পরিচিত হয়। তাই এটাকে সংস্কার ও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। কুয়াকাটায় আগত পর্যটকদের ওখানে যেতে আলাদা একটি সময় বের করতে হয়, যে কারণে ওখানে অনেকেই যাচ্ছে না। তবে এটা যদি কুয়াকাটার কাছাকাছি হতো তাহলে এটার পরিচিতি আরও বেশি হতো।

‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) এর কলাপাড়া উপজেলা কো-অর্ডিনেটর এবং কলাপাড়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মাননু জাগো নিউজকে বলেন, মানুষকে নদ-নদী সম্পর্কে সচেতন করতে ও পরিবেশ রক্ষায় এই উদ্যোগটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রথমে আভাস সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে পরিচালনা করায় বেশ সাড়া ফেলেছিল। তবে এখন অ্যাকশন এইড নিজেরা তদারকি করছে। তারা প্রতিবছর সংস্কারও করছে, কিন্তু তারপরও দিনদিন এখানে পর্যটকদের আগমন কমছে।
‘দীর্ঘদিন ধরে সীমিত আয় ও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে জাদুঘরের অবকাঠামো সংস্কার, প্রদর্শনী উপকরণ সংরক্ষণ এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রকৃতি, পরিবেশ, নদনদী ও খাল মরে যাওয়ার অন্যতম নিদর্শন এই জাদুঘরটি, যা তরুণ সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম এই জাদুঘরটি আমাদের জন্য উপকূলীয় মানুষের বাস্তব জীবনচক্র। আমরা মনে করি এটিকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি তাই কুয়াকাটার আশপাশে নিয়ে এটিকে সংরক্ষণ করা দরকার।
উপকূলীয় মানুষের জীবনচক্র ও নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠা এই পানি জাদুঘর এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এশিয়ার প্রথম এই পানি জাদুঘরটি আবারও পর্যটন ও পরিবেশ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
এফএ/এমএস