নিখোঁজ শিফাতের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হবার শঙ্কা পরিবারের


প্রকাশিত: ০২:৫৬ পিএম, ০৪ আগস্ট ২০১৬

মাদকের ছোবল থেকে দূরে রাখতে ছেলেকে বিদেশে পড়িয়ে উচ্চশিক্ষিত করলেও সেই ছেলে চলে গেল বিপথে। বললেন নিখোঁজ হওয়া বগুড়ার ব্যারিস্টার এ কে এম তাকিউর রহমান শিফাতের বাবা আব্দুল খালেক।

শিফাত তার স্ত্রী রিজিতা রাইলা ইকবাল ও ১৮ মাসের শিশুসন্তান রোমাইশা বিনতে তাকিকে নিয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ হয়। পরিবারের ধারণা, শিফাত বিপথে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে সে তুরস্ক কিংবা সিরিয়ায় রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বগুড়া সদর থানায় হাজির হয়ে নিখোঁজ শিফাতের বাবা আব্দুল খালেক জানান, ২০১৫ সালের ৯ জুন ঢাকার কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। ডায়েরিতে লেখা ছিলো, আমার ছেলে এ কে এম তাকিউর রহমান সপরিবারে ঢাকার বশির উদ্দিন রোড ১৪ লেক সার্কাস, ফ্লাট ৮/বি, বসবাস করা অবস্থায় ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল ছেলে বউ রিজিতা রাইলা ও আমার নাতনি ১৮ মাসের রোমাইশাকে নিয়ে ওমরা হজের কথা বলে চলে যায়। তারপর আর দেশে ফিরে আসেনি।

বগুড়া শহরের কালিতলার বাসিন্দা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, কালিতলা এলাকা ছিল মাদকের আড্ডা। ছেলে মাদকে জড়িয়ে যাবে সেই ভয়ে তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভারতের শিলিগুড়ি মাউন হারমান মিশনারি স্কুলে ভর্তি করা হয়।

তারপর সেখান থেকে একই এলাকার রগভেলী স্কুলে ‘ও’ লেভেলে ভর্তি করি। ‘ও’ লেভেল পাস করে ২০০৬ সালে ঢাকার লন্ডন কলেজ অব লিগাল স্টাডিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘এ’ লেভেলে ভর্তি করে দেই। সেখান থেকে পাস করার পর যুক্তরাজ্যে ক্যান্টি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়তে যায়। এরপর ২০১০ সালে বার এট ল’ পাস করার পর দেশে ফেরে। পরে ঢাকার কলাবাগানে বাসা ভাড়া নিয়ে আইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিল।

তিনি আরো জানান, ভারত থেকে পড়ালেখা করে আসার পর এবং দেশে পড়ালেখা করা অবস্থায় শিফাত একজন স্মার্ট ছেলের মতো ঘোরাফেরা করতো। কখনোবা কানে দুল লাগিয়ে গিটার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। মাঝে মাঝে চুল বড় করে মেয়েদের মতো মাথায় বেনি করতো। এসব বিষয়ে ধমকিয়ে নামাজ পড়ার কথা বললেও নামাজ পড়তো না। কিন্তু যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করার শেষ দিকে তার আচার-আচারণের কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। বার এট ল’ করার আগে দাড়ি রাখে। ২০১১ সালে দেশে ফেরার পর নামাজ-রোজা নিয়মিত করতে থাকে।

তবে তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করা অবস্থায় সিলেটের এক ইমামের মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। ওই ইমামের ছেলে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিফাতের সঙ্গে পড়ালেখা করতো।  

শিফাতের বাবা আরো জানান, ওমরা হজে যাওয়ার আগে তার শ্বশুর চট্টগ্রামের কর্নেল (অব.) ইকবাল দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে আসার পর তাকে হজে যাওয়ার কথা বললেও শিফাত তা না শুনে আগেই হজে চলে যায়। আমিও (আব্দুল খালেক) তাকে পরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু শিফাত জানায়, কম খরচে আমাদের সার্কেলের সঙ্গে হজে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা নেই।

হজে যাওয়ার পর ওই বছরের ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। শিফাত জানায়, ২২ এপ্রিল দেশে ফিরবো। তারপর আর ফিরে আসেনি। তিন মাস পর হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলে। শুধু জানায়, ভালো আছি। কোথায় আছে তা বলেনি।

তার কয়েক মাস পর শিফাতের শ্যালক সাদমানের সঙ্গে শিফাতের কথা হয়। শিফাত তখন তাকে জানিয়েছিল তুরস্কে আছে। শিফাতের বাবা আব্দুুল খালেকের ধারণা শিফাত বিপথে গিয়ে তুরস্ক কিংবা সিরিয়ায় অবস্থান করছে।  

শিফাতের এক নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিফাত ইয়ো ইয়ো স্টাইলে ছেলে হলেও যুক্তরাজ্য থেকে পড়ালেখা শেষ করে এসে সে বলতো অনেক কিছুই তো দেখলাম। অনেক কিছুই করলাম। এখন পরকালের জন্য কিছু করি। তাই নামাজ-রোজা করছি।

শিফাতের নানা আইয়ুব উদদ্দৌলা বেনু বলেন, ছোটবেলা থেকে শিফাত দেশের বাইরে পড়ালেখা করতে গিয়ে বাবা-মার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। বাবা-মার প্রতি পারিবারিক যে বন্ধন থাকে তা থেকে সে ছিল বঞ্চিত।

জীবনের বেশিটা সময় ছিল একাকী। যখন সে বুঝতে শিখলো তখন তার বাবা-মার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সব কিছু মিলেই শিফাতের কিশোর ও শৈশব জীবনে একটা বড় ধরনের ভালোবাসার ঘাটতি ছিল। এ কারণে সে বিপথে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে।

এআরএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।