ফিতা কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ গুড়পুকুরের মেলা


প্রকাশিত: ০৫:৪৫ এএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

সাতক্ষীরার ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলাটি ঐতিহ্য হারিয়েছে। এক সময়ে বৃহত্তর পরিসরে উদযাপিত এ মেলাটি এখন শহরের রাজ্জাক পার্কে ফিতা কাটা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আগেকার বিশাল আকারের সেই মেলাটা এখন আর নেই। শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শহরের চিত্রশিল্পী আব্দুল জলিল জাগো নিউজের কাছে এভাবেই সাতক্ষীরা শহরের চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলার বর্তমান অবস্থার কথা বর্ণনা করেন।

শহরের পলাশপোল এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ওয়ারেশ খান চৌধুরী জাগো নিউজকে জানান, ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৌলবাদী গোষ্ঠী মেলা চলাকালে শহরের রস্কি সিনেমা হল ও স্টেডিয়ামে সার্কাস প্যান্ডেলে বোমা হামলা চালায়। এতে নিহত হয় তিনজন। আহত হয় মেলায় আগত শতাধিক মানুষ। সেখান থেকে মেলাটি বন্ধ থাকার পর ২০০৯ সালে পুনরায় চালু হলেও সেই আগের অবস্থায় ফেরেনি।

satkhira

গুড়পুকুরের মেলাটির উৎপত্তি ও শুরুকালের বিষয়ে সাতক্ষীরা জর্জ কোর্টের অ্যাড. অরুণ ব্যানার্জী জানান, এটা নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে। তবে কথিত রয়েছে সাতক্ষীরার জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর পূর্ব পুরুষরা প্রজাদের হিতার্থের জন্য রাস্তাঘাট, পুকুর, দিঘি, স্কুল, মন্দির ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন।

সাতক্ষীরার পলাশপোলে একটা বড় বটগাছ ছিল। সেখানে একজনকে সাপে কাটে। মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় সে সময় প্রজারা বটতলায় মনসা পূজা করেন। তারপর সে অসুস্থ যুবক সুস্থ হয়ে যায়। এই মনসা পূজা থেকেই গুড় পুকুরের মেলার উৎপত্তি ঘটে।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক নিমাই চন্দ্র মন্ডল জানান, এই মেলার একটি অর্থনৈতিক তাৎপর্য ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাদের গৃহকার্যে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র যেমন দা, কুড়াল ইত্যাদি জিনিস ক্রয় করতো। ফার্নিচারের ব্যাপারটাই ছিল অন্য রকম। দুই থেকে চার মাসের কর্মসংস্থান হতো এই সব পেশাজীবী মানুষের। আজ যা ফুরিয়ে গেছে।

এদিকে, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার আয়োজনে ১৯ সেপ্টেম্বর সোমবার উদ্বোধন করা হবে গুড় পুকুরের মেলা। চলবে ১৫ দিন। পলাশপোলের সেই বটতলায় স্বল্প পরিসরে মনসা পূজা শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন থেকেই আগে বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হতো গুড়পুকুরের মেলা। যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুই হয়নি।

satkhira

সাতক্ষীরা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আনিস খান চৌধুরী বকুল বলেন, মেলাটি শহরের চৌধুরী বাড়ি থেকে গুড়পুকুর হয়ে কদমতলা ইটাগাছা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন শহরের রাজ্জাক পার্কে ছোট্ট পরিসরে উদযাপন করা হচ্ছে। জাকজমকপূর্ণ পরিবেশ আর নেই।

দীপালোক একাডেমির শিক্ষক শ্যামলী চৌধুরী বলেন, গুড়পুকুরের মেলায় আমরা এক সময় যে আনন্দ করেছি এখন তার এক অংশও পাচ্ছি না। এজন্য আমরা এখন যেতেও পারি না। কারণ রাজ্জাক পার্কে এতো সীমিত জায়গায় হচ্ছে। এখানে কোনো মজা নেই। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় গুড়পুকুরের মেলা তার ঐতিহ্যটা হারিয়ে বিলীন হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, মেলা প্রাঙ্গনে কয়েকটি ফুচকার দোকান ও কিছু প্রসাধনী দোকানে শেষ মুহূর্তে সাজসজ্জার কাজ চলছে। বাঁশ খুঁটিও এখনো লাগানো হয়নি। নেই বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী, কাঠে তৈরি ফার্নিচার। নেই বিভিন্ন ফলদ, বনজ, ভেষজ ও পাতা বাহার গাছের সমাহার। থাকছে না সার্কাস, পুতুল নাচ ও যাত্রাপালা।

মেলাটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দীন জাগো নিউজকে জানান, মেলাটিকে কিভাবে আগের মতো ফিরিয়ে আনা যায় সেটি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে মেলাটিকে আগের মতো প্রাণবন্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন সাতক্ষীরা উন্নয়ন কমিটির সদস্য অ্যাড. ফাইমুল হক কিসলু।

আকরামুল ইসলাম/এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।