অপরিচিত কাউকে দেখলেই কেঁদে উঠে শিশুটি


প্রকাশিত: ০১:৩৮ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০১৬

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম চাঁনপুর। গ্রামের হতদরিদ্র এক পরিবারের প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ঘটনার পর অপরিচিত কাউকে দেখলেই ভয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে শিশুটি।

জানা যায়, তৃতীয় শ্রেণির প্রতিবন্ধী এই ছাত্রীর ধর্ষণের বিচার হিসেবে ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে রায় দিয়েছেন স্থানীয় সমাজপতিরা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় হারুন মেকার (৫০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওই প্রতিবন্ধী ছাত্রীটিকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে আইনের আশ্রয় নিতে পারেনি অসহায় পরিবার।

স্থানীয়রা জানায়, সমাজপতিদের চাপের মুখে প্রথম দিকে পরিবারটি ধর্ষণের বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখলেও ধর্ষণের ঘটনা আর চাপা না থাকায় গত ১৮ অক্টোবর লোক দেখানো একটি গ্রাম্য সালিশ হয়। সালিশে ধর্ষককে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। টাকা পরিশোধে টালবাহানা চললে বিষয়টি আরো আলোচিত হয়। পরে চলতি মাসের ৫ তারিখ মেয়ের পালক বাবাকে ৪০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয় সমাজপতিরা।

মেয়েটির মা জানান, ঘটনার পর থেকে অপরিচিত কোনো পুরুষ মানুষ দেখলেই ভয়ে কেঁদে ওঠে শিশুটি। বাড়ির অদূরে একটি মাঠ পাড়ি দিয়ে পাশের সাহাপাড়া মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তো সে। মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় তৃতীয় শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে পারেনি শিশুটি।

তবে থেমে থাকেনি তার স্কুলে যাওয়া-আসা। অন্যদের তুলনায় বয়সে একটু বড় হলেও স্কুলের সহপাঠী ছোট ছোট শিশুদের সাথেই খেলা করতো। ওই ঘটনার পর থেকে স্কুলে আর না গেলেও অজানা কারণে প্রতিদিনের হাজিরা খাতায় রয়েছে তার নাম। ধর্ষণের ঘটনা ও স্কুলে উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো কথাই বলছেন না স্কুল কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হালিমুজ্জামান তালুকদার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ায় এ বিষয় ও ঘটনা সম্পর্কে সবাই অবগত হলেও তার ভয়ে মুখ খুলছেন না কেউ।

ঘটনার বিষয়ে মেয়েটির মা বলেন, মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় নানাভাবে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। ঘটনার দিন তার বাবা বাড়ি ছিল না। এ খবর জেনে বাড়িতে আসে পূর্বপরিচিত কামাক্ষা গ্রামের হারুন মেকার। মেয়েটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে চান তিনি। প্রথমে রাজি হইনি। পরে মেয়েটির কোন ক্ষতি হবে না এমন আশ্বাস দিলে স্কুল থেকে এনে তার হাতে তুলে দিই শিশুটিকে।

ডাক্তারের কাছে না নিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে যান শিশুটিকে। বাড়িতে নিয়ে মুখে গামছা বেঁধে অত্যাচার করেন। পরে মেয়েটি বাড়িতে এসে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলে সব খুলে বলে।

এ বিষয়ে মেয়েটির বাবা বলেন, আমি বাড়ি ছিলাম না। বাড়ি এসে সব শুনে গ্রামের লোকজনদের জানাই। আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে তারা আমাকে বিচারের আশ্বাস দেয়। পরে শালিসে বসে ৪০ হাজার টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সবাই আমাকে মেনে নিতে বললে আমি বাধ্য হয়ে মেনে নিই।

এ প্রসঙ্গে মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হালিমুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমি স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছি। এ নিয়ে ঝামেলা বাধলে ইউপি সদস্য মোনায়ের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকায় সমাধান করা হয়।

গোপালপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিল বলেন, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। এর মধ্যেই যতটুকু জেনেছি তারা আমাদের অগোচোরে ও ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে ইউপি সদস্য মোনায়ের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে আপোস করেছে।

তিনি আরো বলেন, মেয়েটির পরিবার নিরীহ ও হারুন মেকার প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারেনি। তদন্ত করে সব রকমের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুমূর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এইমাত্র অবগত হলাম। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোপালপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরিফ উর রহমান টগর/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।