দূষিত বর্জ্যে হুমকির সম্মুখীন তুরাগ তীরের জীব-বৈচিত্র্য
রাজধানী শহরের নিকটে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় গাজীপুরে গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার শিল্প কারখানা। তবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠায় এসব কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি নির্গত হচ্ছে তুরাগ নদ ও আশপাশের বিলগুলোতে। যার কারণে তুরাগ নদ ও বিলের পানি দূষিত হয়ে মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদের জীব ও বৈচিত্র্য। এক সময় তুরাগ নদে রুই, কাতলা, চিতল, শোল, বোয়াল, টেংরা, পুটিসহ ছোট বড় নানা পদের দেশী মাছ পাওয়া যেত। হাজার হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। বর্তমানে শিল্প কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্যরে কারণে মাছ তো দূরের কথা কোন জলজ প্রাণীও দেখা যায় না।
অনুসন্ধানে ও তুরাগ নদের আশপাশে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী, মনিপুর, সফিপুর, চন্দ্রা, কালিয়াকৈর এলাকাসহ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার শিল্পকারখানা। এসব কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে তুরাগ নদ ও আশপাশের বিল গুলোতে। কারখানার তরল বর্জ্য তুরাগ নদে ফেলায় বিষাক্ত হয়ে গেছে তুরাগ নদের পানি। যার কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মাছ, জীব ও বৈচিত্র্য। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সব জলজ প্রাণী।
গত কয়েক বছর আগেও এই তুরাগ নদের পানি লাখ লাখ মানুষ ব্যবহার করতো। গোসলসহ রান্নার ও কৃষি কাজে ব্যবহার করা হতো এ নদের পানি। কিন্তু কিছু অসচেতন শিল্প ব্যবসায়ীদের অসচেতনতার কারণে বিলিন হয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদের ব্যবহার। শিল্প কারখানার দূষিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে তুরাগ নদে। যার ফলে মানুষ এবং পশু পাখিসহ কোন প্রাণীই তুরাগ নদের পানি র্স্পশ করতে পারছে না। মাছসহ নানা ধরণের জলজ প্রাণী মরে যাচ্ছে। শূন্য হয়ে পড়েছে তুরাগ নদে বিচরণ করা সব প্রাণী।
এছাড়া শিল্প কারখানার দূষিত পানির দূর্গন্ধে তুরাগ নদের পার দিয়েও হেটে যাওয়া যায় না। একসময় তুরাগ নদের আশপাশের লোকজন চলাচল করতো নৌকায়। দূর্গন্ধ দূষিত পানির কারণে বিলিন হয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদে নৌকার চলাচলও। এখন তুরাগ নদের পানি স্পর্শ করলে চর্মরোগসহ নানা ধরণের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
দেশ বিদেশ থেকে লাখ লাখ মুসুল্লি টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন। শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্যের কারণে বিষাক্ত তুরাগ নদের পানি কোন রকম ব্যবহার করতে না পারায় এবং দূর্গন্ধে ইজতেমায় আসা ওইসব মুুসল্লিরা পড়ে দূর্ভোগে।
এছাড়া তুরাগ নদ ও বিলের পানি বিষাক্ত হওয়ায় প্রতিনিয়তই জন্মাছে ডেঙ্গু, মেলেরিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা ধরণের রোগ ছড়ানো মশা মাছি। বর্ষাকালে তুরাগ নদে শ্রোত থাকায় প্রায় তিন চার মাস পানি মানুষ ব্যবহার করতে পারলেও সারা বছর দূর্ভোগে থাকতে হয় লাখ লাখ মানুষকে।
তুরাগ নদের পরিবেশ আগের মতো ফিরে পাওয়ার দাবি তুরাগ নদের আশপাশে বসবাস করা লাখ লাখ মানুষ। তুরাগ পাড়ে বসবাসকারি মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, আমরা আগে তুরাগ নদের সাঁতার কেটে গোসল করতাম, এখন তুরাগ নদের পাড়ে যাওয়া যায় না। শিল্পকারখানার বর্জ্যরে গন্ধে। তুরাগ নদের পানি শরীরে লাগলে শরীরের ঠোসা পড়ে চামড়া উঠে যায়।
আরেক বাসিন্দা মো. নাসিম মন্ডল জানান, তুরাগ নদের পানি বিষাক্ত হওয়ায় পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ছে ব্যাপক হারে। শিল্প কারখানার দূষিত পানি তুরাগ নদে ফেলায় ওই পানি কৃষি কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে পানির সমস্যায় পড়তে হয় কৃষকদের। ধান, শাক সবজিসহ নানা ফসল ফলাতে কৃষক পড়ে দূর্ভোগে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ওই পানি ব্যবহার কররেও ফসলের ফলন কম হওয়ায় ক্ষতি গুনতে হয় কৃষককে।
সরকারের পক্ষ থেকে তুরাগ নদ দূষণ মুক্ত করার কোন পদক্ষেপ নিলে আবার আমরা দুষণমুক্ত তুরাগ ফিরে পেতাম। লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হতো বলেও জানান তিনি।
এব্যাপারে গাজীপুর জেলা কৃষি কর্মকর্তা সৌমেন সাহা জানান, শিল্প কারখানার দূষিত বর্জ্য কৃষি জমিতে পড়লে মাটির উর্ভরতা কমে যাবে ফলনও কম হবে। ওই জমির ফসল খেলে মানুষ নানা ধরণের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোনিয়া সুলতানা জানান, তুরাগ নদ দূষণ মুক্ত করতে আমাদের মনিটরিং চলছে।
আরএস/এমএস