রাজশাহীতে নেই আগাম আলুর দাম
কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজশাহীর বাজারে উঠছে আগাম আলু। কিন্তু দাম নেই। এতে হতাশ এ অঞ্চলের চাষিরা। এছাড়া ঘন কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়া আলুক্ষেতে ছড়িয়েছে লেটব্লাইট। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষি। তবে কৃষি দফতরের সহায়তায় মোড়ক নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসেবে, জেলায় এ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৩শ ৫০ হেক্টর বেড়ে আলুচাষ হয়েছে ৪২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। এ বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৪০ হাজার ৯শ হেক্টর। ব্যাপক আলুচাষ হয়েছে জেলার পবা, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, তানোর ও গোদাগাড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায়। এ বছর জেলায় আগাম আলুচাষ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর। এর অধিকাংশই জেলার বাগমারায়।
রাজশাহীর বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন আলু বিক্রি দেদার। পুরাতন আলু নেই বললেই চলে। থাকলেও ক্রেতাদের পছন্দ নতুন আলু। পাইকারী বাজারে প্রতি মণ নতুন গ্র্যানুলা বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায়। এছাড়া কার্ডিনাল ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় এবং দেশি গুটি আলু ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে এসব আলু একই দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
রাজশাহী শহরের অন্যতম পাইকারি সবজি বাজার মাস্টার পাড়াই গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিকেজি গ্র্যানুলা ৮ টাকায়, কার্ডিনাল ১২ টাকায় এবং দেশি আলু ১৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুক্রবারও প্রতিকেজিতে আলুর দাম এক থেকে দুই টাকা বেশি ছিল।
বাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দাম কমতি বলে জানিয়েছেন পাইকারি সবজি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ টাকায় প্রতিকেজি আলু বিক্রি হয়েছে। ধীরে ধীরে তা কমে এসেছে। নতুন আলু বাজারে আসার আগে পুরনো আলু প্রতিকেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন ৫ টাকায় তা বিক্রি হচ্ছে।
তবে আলু চাষিরা এ দামে হতাশ। কয়েকজন আলু চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে আলুর চাষ করে তাদের খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এবার বীজআলুর দামও ছিল চড়া। ৮০ কেজির প্রতি বস্তা বীজআলুর দাম পড়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা।
এছাড়া নাবিধসা রোগ দেখায় তা ঠেকাতে চড়া দামে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়েছে। ক্ষেতে মোড়ক লাগায় কমেছে ফলন। এবছর প্রতি বিঘায় আলু ফলছে ৩৫ থেকে ৫০ মণ। গত বছর আলুর ফলন হয়েছিল অন্তত ৬০ মণ। গত বছর প্রতি মণ আগাম আলু বিক্রি হয়েছে অন্তত ৮০০ টাকায়। এবার অর্ধেকও দাম পাচ্ছে না চাষি।
জেলার বাগমারার গনিপুরের আলু চাষি আক্তারুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে বাগমারাতেই আগাম আলু চাষ হয়েছে। কেউ কেউ আলু তুলেছেন বাজারে। কিন্তু আলুর দাম মিলছেনা। এছাড়া জয়পুরহাট ও বগুড়ার আগাম আলুও এসেছে বাজারে। এতে স্থানীয় বাজারে আলুর দাম পড়ে গেছে। দাম কম থাকায় আগাম আলুচাষিরা পড়েছেন চরম দুর্বিপাকে।
আলু ব্যবসায়ীরা জানান, গত মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম তুলনামুলক কম ছিল। শুরুতে প্রতি বস্তা (৮৫ কেজি) ১২শ থেকে ১৪শ টাকায় বিক্রি হলেও শেষে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২৫শ টাকায়। শুরুতেই যারা কম দামে আলু বিক্রি করে দিয়েছেন তারা লোকসান গুনেছেন।
জেলার ২৮টি কোল্ড স্টোরে সংরক্ষণ করা যায় প্রায় ৩৬ লাখ বস্তা আলু। কিন্তু উৎপাদন মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় কোল্ড স্টোরে জায়গা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে চাষিরা পানির দামে বিক্রি করেছেন আলু। এতে শেষ দিকে এসে আলুর দাম বেড়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা এবার ব্যাপক আলু চাল করেছেন এ জেলায়।
এদিকে, জেলার বাগমারা উপজেলার আগাম আলুক্ষেতে দেখা দিয়েছে লেটব্লাইট। উপজেলার ভবানীগঞ্জ, গনিপুর, বাসুপাড়া, যোগীপাড়া, বড়বিহানালী, নরদাশ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ক্ষেতে ছড়িয়েছে এ মোড়ক। সম্প্রতি বৃষ্টিপাতের পর ঘন কুয়াশায় ছড়িয়েছে এ মোড়ক। তবে এরই মধ্যে তা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন চাষিরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান জানান, খেতে মাত্রারিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগে এ রোগ দেখা দিয়েছে। তবে এখন তা নিয়ন্ত্রণে বলা যায়। এনিয়ে কৃষি দফতর সভা করে চাষিদের সচেতন করেছে। কৃষি দফতরের পরামর্শ মেনে সুফল পেয়েছেন চাষিরা।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালি বলেন, মেঘলা আবহাওয়া ও ঘন কুয়াশায় লেটব্লাইট ছড়ায়। এসময় চাষিদের ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া সেচ ও সবধরণের সার প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালি জানান, রোগবালায় এড়াতে আগে থেকেই চাষিদের সর্তক করা হয়েছিল। বাণিজ্যিক সকল চাষিই রেখেছেন পূর্ব প্রস্তুতি। মূলত বৃষ্টিপাত কিংবা তাপমাত্রা বেড়ে গেলে লেট ব্লাইট ছড়ায়। কোথাও কোথাও এ মোড়ক দেখা দিলেও এখন তা নিয়ন্ত্রণে। আলু ক্ষেতের যেকোনো রোগ বালাই দমন সংক্রান্ত তথ্য দিতে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, আগাম আলুর পুরোটাই বিক্রি হয়ে যায় বাজারে। কিছুদিন পর যেসব আলু উঠবে তা হিমাগারে রাখার জন্য সংগ্রহ করবেন ব্যবসায়ীরা। এখন আলুর তুলনামূলকভাবে দাম কম হলেও ব্যাপকভাবে আলু কেনা শুরু হলে কৃষকেরা আলুর ভালো দাম পাবেন।
ফেরদৌস সিদ্দিকী/এফএ/এমএস