ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পাকবাহিনী
গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নবাসীর। ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পাক হানাদার বাহিনী। জীবন বাঁচাতে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন।
বাগবাটি ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহ-সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য জাফর হোসেন ও তার সহযোদ্ধা গাজী আবু সাঈদ ও গাজী আজিজুর রহমান মাস্টার জাগো নিউজকে এসব কথা বলেন।
তারা আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে পাক হানাদার বাহিনী নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাস ফায়ার করে দেড় শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে ইউনিয়ন পরিষদের পাশে বদ্ধ কূপের মধ্যে ফেলে রাখে। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পাক বাহিনীর সদস্যরা আক্রমণ চালায়। পাক বাহিনী চলে যাওয়ার পরে গ্রামটিতে মানুষ ফিরতে শুরু করে।
মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, সিরাজগঞ্জ শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সদর থানার বাগবাটি গ্রাম। শহর থেকে কাজিপুর উপজেলা যাওয়ার পথে পিপুলবাড়িয়া বাজারের পশ্চিমের গ্রাম বাগবাটি। ১৯৭১ সালের ২২ মে বাগবাটি ইউনিয়নের ঘোড়াচড়া স্কুল মাঠে মফিজ ভূইয়ার সভাপতিত্বে রাজাকার শান্তি বাহিনীর এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে বাগবাটি, হরিণা গোপাল, উত্তর আলোকদিয়া, ডলডোব ও মালিগাঁতীতে পাঁচ শতাধিক মুক্তিকামী নিরীহ মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
এরই অংশ হিসেবে স্থানীয় রাজাকার তমেজ উদ্দিনের নেতৃতে হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৭ মে ভোর ৫টায় বাগবাটি, আলোকদিয়া ও হরিনা গোপাল, ডলডোব ও মালিগাঁতী গ্রাম ঘেরাও করে শত শত ঘুমন্ত নারী-পুরুষদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
তারা আরও বলেন, গুলির শব্দ প্রথম ভেসে আসে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের দিক থেকে। কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় ঘুমন্ত মানুষের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ। পাক সেনা ও স্থানীয় রাজাকার একযোগে লুটতরাজ, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। পাকবাহিনীর নৃশংসতার স্মৃতি আজও বাগবাটি ইউনিয়নবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে এক দুঃস্বপ্নের কালরাত হয়ে আছে।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন তাদের চোখে পানি ছলছল করছিল। সেই দিনের কালরাতের কথা মনে পড়লেই তাদের গা শিউরে ওঠে বলে জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে পাক সেনারা সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের শহর দখলে নেয়ার পর ব্যাপকভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাক হানাদারদের ভয়ে পার্শ্ববর্তী বগুড়া, শেরপুর, চান্দাইকোনা, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ শহর থেকে অসংখ্য নারী পুরুষ বাগবাটি গ্রামটিতে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নেয়া অধিকাংশ মানুষ ছিল সংখ্যালঘু ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী।
স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা ও লুটতরাজের পরিকল্পনা করে গ্রামটিতে একযোগে হানা দেয়। ভোর ৪টায় কয়েকশ পাক সেনা অস্ত্রসহ সেখানে হামলা চালায়। সেইদিন হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে ৩৭জন শহীদের নাম সনাক্ত করা গেছে।
বাগবাটি ইউনিয়নের হরিনা গোপাল গ্রামের ইউপি সদস্য প্রদীপ কুমার সরকার জাগো নিউজকে জানান, ২৭ মে পাক সেনারা নিরীহ বয়স্ক গ্রামবাসীদের ধরে এনে অমানসিক নির্যাতনের পর তাদের ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পর ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে গণহত্যার এই স্থানটিকে সরকারিভাবে বধ্যভূমি ঘোষণা করে তা চিহ্নিত করেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা শেষে প্রাথমিকভাবে ৪২জন শহীদের নামের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু শত শত শহীদের স্মরণে বাগবাটিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সেই দাবি আজও বাস্তবায়িত হয়নি এবং শহীদদের তালিকা সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয়নি।
ফুলকোচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা গাজী আজিজুর রহমান মাস্টার জাগো নিউজকে জানান, বাগবাটি গ্রামের দুর্গা দত্তর বাড়িতে পরিত্যক্ত একটি কুয়াতে গণকবর আছে। সেই কুয়াতে পাক সেনারা ১১জনকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। এছাড়াও হরিণা গোপাল ও বাগবাটি গ্রামের বলরাম নমদাসের বাঁশ ঝাড় ও খুদু রায়ের কুয়ার এলাকায় রয়েছে একাত্তরের বধ্যভূমি। তাদের স্মরণে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে একটি স্মৃতি ফলক তৈরি করা হয়েছে। সেই স্মৃতি ফলকটি অবহেলায় ও অযত্মে পড়ে রয়েছে।
আরএআর/এমএস