সরকার পাল্টালেও ‘কারা হেফাজতে’ মৃত্যু কমেনি, বেড়েছে আরও
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রতি বছর কারা হেফাজতে মৃত্যুর যে ভয়াবহ চিত্র ছিল, গণঅভ্যুত্থানের পরও তার পরিবর্তন হয়নি। বরং ২০২৩ ও ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্থায়ী অভিযোগ। ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মানুষের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারেনি কোনো সরকারই। আওয়ামী লীগ শাসনামলে এ ধরনের মৃত্যুকে প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
কারা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পরও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় একই রয়ে গেছে। অর্থাৎ সরকার বদলালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কারা প্রশাসনের জবাবদিহিতায় কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মৃত্যুকে প্রায়শই ‘অসুস্থতা’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে দেখানো হলেও স্বাধীন তদন্ত ও ময়নাতদন্তের অভাবে প্রকৃত কারণ চাপা পড়ে যায়। ফলে দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই সমস্যার মূল। এক সরকারের সময়ে দায়মুক্তি যে পথ তৈরি করেছে, পরবর্তী সরকারগুলো সেই পথ ধরেই হেঁটেছে। ফলে কারাগারগুলো এখনো মানুষের জন্য নিরাপদ স্থান হয়ে উঠতে পারেনি।
গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি—কারা হেফাজতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা তারই প্রমাণ। প্রকৃত পরিবর্তন চাইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
নিহত পরিবারগুলোর অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাদের স্বজন মারা গেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কারা অধিদপ্তরের দাবি, হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন
গ্রেফতারের দু’দিন পর কারা হেফাজতে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু
বিএনপি নেতার মামলায় গ্রেফতার, কারা হেফাজতে দিনমজুরের মৃত্যু
কারা হেফাজতে বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু
কারা হেফাজতে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন বেশিরভাগই মারা যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের (৭৫) মৃত্যু হয় ঢামেকে।

ঢামেক কর্তৃপক্ষের দাবি, কারাগার থেকে আসা বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। ডিভিশনপ্রাপ্ত না হয়েও অনেকে ডিভিশনের সুযোগ-সুবিধার দাবি করে। সেটা না পেলেই চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারে চিকিৎসায় ১৪১ জন আবাসিক চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র দুজন দায়িত্বে আছেন। এই কারণে অসুস্থ বন্দিদের সময়মতো চিকিৎসা দিতে কিছু ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগলেও অবহেলার সুযোগ নেই। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সংকট রয়েছে। দেশের ৭৫টি কারাগারে মাত্র ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে যে কোনো মৃত্যুই উদ্বেগজনক। কারণ একজন নাগরিক একবার রাষ্ট্রের হেফাজতে গেলে তার নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। কেউ অপরাধী হোক বা অভিযোগের মুখোমুখি, তার মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তাই হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আইনি ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রাষ্ট্রের জবাবদিহি দাবি করে।
চার বছরে কারা হেফাজতে ৬৩২ জনের মৃত্যু
২০২২ সালে সারা দেশে কারা হেফাজতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ২৮৬ জন বন্দি। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৫৫ জনের, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৩ হাজার ৮০১ জন বন্দি। ২০২৪ সালে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ৮৬৪ জন বন্দি। ২০২৫ সালে ১৭২ জন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন, আর চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ হাজার ২০৮ জন বন্দি।
পাঁচ বছরে কারাগারে ১৯ জনের ‘আত্মহত্যা’
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ছয়জন বন্দি ‘আত্মহত্যা’ করেন। এর আগে ২০২৪ সালে তিনজন পুরুষ বন্দি ‘আত্মহত্যা’ করেন। ২০২৩ সালে একজন পুরুষ ও একজন নারী ‘আত্মহত্যা’ করেন। ২০২২ সালে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী বন্দি আত্মহত্যা করেন। ২০২১ সালে সেই সংখ্যা ছিল চারজন। তারা সবাই ছিলেন পুরুষ।

হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান অনেকে
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, যারা মারা গেছেন, তারা বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর তাদের হাসপাতালে পাঠানোর সময় কেউ পথে মারা যান, কেউবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কারা কর্মকর্তা জানান, কারাগারগুলোয় রাতের বেলায় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। কোনো কোনো কারাগারে অ্যাম্বুল্যান্স না থাকায় গুরুতর রোগীকে দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় লেগে যায়। ফলে পথেই কোনো কোনো বন্দি মারা যান।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশে বর্তমানে কারাগারের সংখ্যা ৭৫টি। এরমধ্যে মানিকগঞ্জ কারাগার ও রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। বাকি ৭৩টি কারাগারে সিভিল সার্জন অফিস থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দেন। সেগুলোতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নেই। ৭৫টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ২৭টি। বাকি কারাগারগুলোতে ভাড়া করা গাড়িতে করে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
একটি সূত্র জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছে, ২০১৯ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় নানা অজুহাতে কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় প্রক্রিয়া আটকে রেখেছে। এ কারণে ২০১৯ সাল থেকে কারা কর্তৃপক্ষ কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিনতে পারেনি।
আরও পড়ুন
উখিয়ায় ফোর মার্ডার: গ্রেফতার কয়েদির কারা হেফাজতে মৃত্যু
চুয়াডাঙ্গায় সেনা হেফাজতে বিএনপি নেতার মৃত্যু
বগুড়ায় কারা হেফাজতে আ’লীগ নেতার মৃত্যু
বর্তমান সরকারের আমলে কারা হেফাজতে মৃত্যু
গত বছরের ৫ ডিসেম্বর যশোরের কেশবপুর পৌর যুবদলের সদস্য এবং একই পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আফজাল হোসেনের ছোট ভাই উজ্জ্বল বিশ্বাসকে (৩৯) যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ জানান, উজ্জ্বল বিশ্বাসকে তারা রাত সাড়ে ৯টায় কারাগারে পান। সেখানে ডাক্তারি সার্টিফিকেটে লেখা ছিল ‘পাবলিক অ্যাসল্ট’। তখন উজ্জ্বল স্বাভাবিক ছিলেন। কারাগারের সব কাজ শেষে উজ্জ্বলকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারাগারের ভেতরের মেডিকেল সেন্টারে পাঠানো হয়।
জেলারের ধারণা, উজ্জ্বলের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ছিল। মেডিকেল সেন্টারে তিনি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত সাড়ে ১০টার দিকে যশোর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের পর উজ্জ্বল মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুম-খুন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা বিপ্লব করে যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে, সেই পরিবর্তিত বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে কারও মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
গত বছরের ২৭ নভেম্বর টাঙ্গাইলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মিয়া (৫৫) কারাগারে বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সুলতান মিয়া মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
এর আগে ১৮ নভেম্বর বিকেলে মিরপুর ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মো. মুরাদ হোসেনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান বগুড়ার গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল মতিন ওরফে মিঠু (৬৫)। একই বছরের ২৬ নভেম্বর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহাদত আলম ঝুনু কারা হেফাজতে মারা যান। একটি হত্যা মামলা, ভাঙচুর ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন ঝুনু।
বগুড়া জেলা কারাগারের জেল সুপার ফারুক আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কারা হাসপাতালে ঝুনুর হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। পরে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে সিরাজগঞ্জ পৌঁছানোর পর পথে তার মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন
গ্রেফতারের পর কারাগারে আসামির মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের
‘হেফাজতে মৃত্যু’ আইন নিয়ে পুলিশই কষ্টে!
দেশে গণপিটুনি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু বেড়েছে
চলতি মাসের ১১ জানুয়ারি নব্বই দশকের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাবনা জেলার সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক প্রলয় চাকী (৬০) কারা হেফাজতে মারা যান। ১৬ ডিসেম্বর পাবনা শহরের দিলালপুরের নিজ বাড়ি থেকে প্রলয় চাকীকে আটক করা হয়। পরে ৪ আগস্টের একটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তিনি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
প্রলয় চাকীর ছেলে সনি চাকীর অভিযোগ, তার বাবার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তাকে হয়রানি করা হয়েছে। কারাগারে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও প্রথমে তাদের জানানো হয়নি। কারাগারে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তার বাবা মারা গেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাবনার জেল সুপার ওমর ফারুক। তিনি বলেন, প্রলয় চাকী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী তাকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হতো। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়েছিল বিএনপি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারা হেফাজতে মৃতদের বড় একটি অংশই ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী কারা হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দি নেতাদের পরিবারের সদস্যরা গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনযাপন করছে।
রিজভী অভিযোগ করে বলেন, কারা হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীদের কারো না কারো মৃত্যুর সংবাদ আসছে প্রায়শ। গত তিন মাসে কারাগারে নির্যাতন করে বিএনপির ১৩ জন নেতার মৃত্যু হয়েছে কারা হেফাজতে। প্রত্যেকটি মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ৮ ফেব্রুয়ারি বিনা অপরাধে রংপুর কারাগারে বন্দি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি মহিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলামকে নির্যাতন করে বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়।
বন্দি অসুস্থ হলে আইনে কী আছে
১৮৬৪ সালের জেলকোড বন্দিদের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ ব্যবস্থা রেখেছে। এ বিধান অনুযায়ী, কোনো বন্দি অসুস্থ হলে প্রহরীরা সঙ্গে সঙ্গে হেড ওয়াড্রেনকে জানাবেন। তিনি সাব-অ্যাসিসট্যান্ট সার্জনকে বন্দির অসুস্থতা সম্পর্কে জানাবেন। এরপর অ্যাসিসট্যান্ট সার্জন সঙ্গে সঙ্গে বন্দির ওয়ার্ড ভিজিট করবেন। বন্দির অবস্থা বুঝে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে জেলকোডে। এ বিষয়ে তিনি জেলার এবং মেডিকেল অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।
বাংলাদেশের জেলখানায় এ নিয়মগুলো মানা হয় না বলে অনেকের অভিযোগ।
এ সম্পর্কে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর জাগো নিউজকে বলেন, গ্রেফতারের সময় কিংবা রিমান্ডের সময় পুলিশ মারধর করার পর কারাগারে সঠিক চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে অনেক সময় আসামি মৃত্যুবরণ করেন। কেউ মৃত্যুবরণ করলে ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে পারেন। এছাড়া কারাগারে চিকিৎসক সংখ্যা বৃদ্ধিরও কথা জানান তিনি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, সরকারের বিরোধিতাকারীদের ক্ষেত্রে সব সরকারই চায় তারা জেলে গিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করুক। আগের সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তিলে তিলে মারা হয়েছে—এমন অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে জেল হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। জেলে থাকা রাজনৈতিক নেতারা অভিযোগ করছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে তাদের ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া এসব পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
নির্বাচনের পর যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের উদ্দেশে কারা হেফাজতে মৃত্যু কমানোর বিষয়ে কোনো বার্তা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, এ বিষয়ে একটি আশার জায়গা রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৫ বছর বিদেশে ছিলেন, আর দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলে মানুষের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে। তারেক রহমান যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে তিনিই এককভাবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। দলীয় উদ্যোগের চেয়ে তার ব্যক্তিগত সদিচ্ছা ও সরাসরি ভূমিকা থাকলেই বিষয়টির বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইনের রক্ষক যখন আইনের ভক্ষক
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, কারা হেফাজতে মৃত্যু রোধের একমাত্র উপায় হলো আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কারা হেফাজতে মৃত্যুর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অতীতে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকলেও বর্তমানে সেই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। তবে এখনও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যা থেকে বোঝা যায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে এবং তারা পরিত্রাণ পেয়ে যাচ্ছে।
‘এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাই অনেক সময় আইনের রক্ষক না হয়ে আইনের ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। ঘটনা ঘটার পর সাধারণত বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়, যা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কারা হেফাজতে মৃত্যু একটি গুরুতর অপরাধ। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তারা যেই হোক না কেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।’
আরও পড়ুন
কারা হেফাজতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হত্যা মামলার আসামির মৃত্যু
২০ বছরে কারা ও পুলিশ হেফাজতে কত মৃত্যু, জানতে চান হাইকোর্ট
কারাগারে বিএনপির ১৩ নেতাকর্মীর মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে রিট
কারাগারগুলোতে গুরুতর চিকিৎসক সংকট
কারা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, কারাগারের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১৪১ জন হলেও বাস্তবে বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক অফিসিয়ালি পোস্টেড রয়েছেন। বাকি চিকিৎসকরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে দেশের কারাগারগুলোতে গুরুতর চিকিৎসক সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, এই সংকট নিরসনে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া যায় কি না—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত এক থেকে দেড় বছরে একাধিকবার আলোচনা হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
কারাগারে চিকিৎসা অবহেলার কারণে বন্দিদের মৃত্যুর অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজনস বলেন, কারাগারে যে কোনো মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত। একজন বন্দির চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো বন্দি অসুস্থ হলে প্রাথমিকভাবে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাক বা গুরুতর শারীরিক জটিলতার ক্ষেত্রে অনেক সময় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশের কারাগারগুলোতে ৮০ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছে। আমরা কখনোই চাই না কোনো বন্দির মৃত্যু হোক। কোনো কারাগারে বন্দির মৃত্যু হলে পুরো কারাগারই স্তব্ধ হয়ে যায়, সবার মন খারাপ হয়। ব্যক্তিগতভাবেও আমার মন খারাপ হয়।’
কারাগারে আসার পর বন্দিদের জীবনযাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে, অনেক বন্দি বয়স্ক এবং কারাগার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে জানান তিনি। চিকিৎসক সার্বক্ষণিক থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হতো বলেও মন্তব্য করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা অবহেলার যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক নয় উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেন বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের পর সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়।
তদন্ত ঠিকঠাকভাবে হয় না
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আল মামুন রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ যে পরিমাণ আসামি থাকার কথা তার দুই থেকে তিন গুণ বেশি রয়েছে। ছোট কারাগারে আসামি বেশি হওয়ার কারণে কারাগারে একজন বন্দির সংবিধানের ৩১ ও ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে সেই অধিকার বন্দিরা পান না। কারাগারে চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ভালোভাবে চিকিৎসা মেলে না। এর বাইরেও নিজস্ব কোন্দল ও মারামারি হয়। কিন্তু এগুলোর তদন্ত হয় না।
টিটি/এমএমএআর/
