ছায়েদুল-মোকতাদির দ্বন্দ্বে কপাল পুড়ল ছাত্রলীগের!
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হক এমপি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে এবার কপাল পুড়লো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগ নেতাদের। রোববার রাতে জেলা ছাত্রলীগের সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।
জেলা ছাত্রলীগের কাছে সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে পাঠানো চিঠিতে কোনো কারণ উল্লেখ না থাকলেও মূলত মন্ত্রী ছায়েদুল হককে জুতা প্রদর্শনের কারণেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছে।
সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিতের পাশাপাশি জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুম বিল্লাহ্ ও সাধারণ সম্পাদক রাসেল মিয়াকে সংগঠন থেকে কেনো স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেটিরও কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
এছাড়া পৃথক আরেকটি চিঠির মাধ্যমে জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মমিন মিয়ার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নাসিরনগরের হরিপুর ও গুনিয়াউক ইউনিয়নে জেলা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ও নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘর-বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে দায়ী করে আসছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদস্য সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হক।
এ নিয়ে মন্ত্রী ছায়েদুলের সঙ্গে সাংসদ মোকতাদির চৌধুরী ও জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। সম্প্রতি জেলার আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পৃথক দুটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর সঙ্গে মন্ত্রী ছায়েদুলের হকের দ্বন্দ্ব ফের সবার সামনে চলে আসে।
আশুগঞ্জে একটি সুধি সমাবেশকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগে মন্ত্রী ছায়েদুল হক সমর্থক ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরাতায় কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রীর অংশগ্রহণে আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ আয়োজিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
তবে গতকাল রোববার কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয়ে যাওয়া বিজয়নগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও সমাবেশ নিয়ে সাংসদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক ও মোকতাদির চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা কিছুতেই কাটছিল না।
বিজয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তানভীর ভূঁইয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীকে কোনো কিছু না জানিয়ে প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র উদ্বোধন ও সমাবেশের কর্মসূচি দেয়ায় মন্ত্রী ছায়েদুল হকের অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দেন।
পরে রোববার বিজয়নগরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠন। এরপর গত শুক্রবার দুর্বৃত্তরা বিজয়নগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাকে মারধর করে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের নামফলক ভেঙে দেয়।
এ ঘটনার পর জেলা ও উপজেলা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর পক্ষ নিয়ে যে করেই হোক মন্ত্রী ছায়েদুল হক বিজয়নগরে ঢুকলে তাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। মন্ত্রী ছায়েদুল হককে প্রতিহত করার জন্য তার ছবি বিকৃতি করে দেয়া স্ট্যাটাস ও লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মিছিলের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ভাইরাল হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় মন্ত্রী ছায়েদুল হক ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রোববার সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সব ধরণের সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করে বিজয়নগর, সদর, আশুগঞ্জ ও সরাইল উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন।
তবে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রোববার দুপুর পৌনে ১টার দিকে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের গাড়ি বিজয়নগরে ঢুকার সময় চান্দুরা এলাকায় তাকে লক্ষ্য করে জুতা প্রদর্শন করেন। এসময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে আহত হন নবীনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমতিয়াজ আহম্মেদ। এ ঘটনায় সর্বত্র ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে।
অবশ্য সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর অনুসারীদের বিক্ষোভের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র উন্নয়ন কেন্দ্র উদ্বোধন শেষে মন্ত্রী ছায়েদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, যার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে মারধর করে আমার নামফলক ভেঙেছে এবং বিক্ষোভ করেছে তারা সন্ত্রাসী। তারা বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মন্ত্রী ছায়েদুল হককে লক্ষ্য করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জুতা প্রদর্শনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থাগিত হওয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ্ জাগো নিউজকে বলেন, বিজয়নগরসহ ৪ উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল আমরা যেন রোববার বিজয়নগরে না যাই। আমি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশনার বিষয়টি আমার জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দকে এসএমএস এর মাধ্যমে জানিয়ে বলেছি তারা কেউ যেন বিজয়নগরে না যান।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কমিটি ভাঙতে চায় এমন কিছু অতি উৎসাহী বিজয়নগরে গিয়ে মন্ত্রী ছায়েদুল হককে জুতা প্রদর্শন করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে আমি এবং আমার সাধারণ সম্পাদক কেউই জড়িত নই। যদি কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ দিতে পারেন তাহলে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করার কথাও জানান তিনি।
এফএ/পিআর