তাদের গল্পটা কষ্ট দিয়ে সাজানো


প্রকাশিত: ০২:৪৮ পিএম, ৩০ মে ২০১৭

স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন প্রতিনিয়ত আমাকে নির্যাতন করতো। কারণ একটাই যৌতুক। বাবা গরীব তাই তার কথা মতো টাকা দিতে না পারায় চলতো এই নির্যাতন। একপর্যায়ে তালাক নিয়ে নিতে তারা বাধ্য করে। এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানালেন ঝিনাইদহের স্বামী পরিত্যক্তা নারী তাহমিনা।

যৌতুক না দেয়ার কারণে সারাদিন গরুর মতো সংসারের কাজ করাতো। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতো মানুষিক নির্যাতন। সেই সঙ্গে শারীরিক নির্যাতন।

আপনারাই বলেন কীভাবে একটা মানুষ এই যন্ত্রণা সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। কাঁদকে কাঁদতে সেই নির্যাতনের ইতিহাস বলতে লাগলেন কোটচাঁদপুর উপজেলার আদর্শপাড়ার নিশি খাতুন।

কেটিচাঁদপুর উপজেলার য়ৌতকের বলি এমনই ৩৫ জন নারী। তারা হলেন, উপজেলার বাজেবামদা গ্রামের কুলসুম আক্তার, সাফদারপুরের সাথি খাতুন, নারানপুরের হামিদা, নাসিমা বেগম, রেহেনা খাতুন, বাজেবামদা গ্রামের শোভা রানী, লতিফা খাতুন, কুলসুম আক্তার, কবিতা খাতুন, রুনা আক্তার, নাসরিন আক্তার, মো. বিপাশা খাতুন, শিরিন খাতুন, মমতাজ বেগম, সলেমানপুরের সুরাইয়া খাতুন, গালিমপুর গ্রামের সুমি আক্তার, আদর্শপাড়ার নিশি খাতুন, বহরমপুর গ্রামের হালিমা খাতুন, বিলকিস আক্তার, নওদাগ্রামের তাসলিমা খাতুন, তালসার গ্রামের আছিয়া আক্তার, গুড়পাড়া গ্রামের নাছিমা খাতুন, বকশিপুর গ্রামের কাজলী খাতুন, ফুলবাড়ি গ্রামের রিয়া খাতুন, জহুরা বেগম, বলুহর গ্রামের রিয়া খাতুন, বলুহর গ্রামের সাগরী খাতুন, টিএনটিপাড়া গ্রামের মোছা. নিশি, মানিকদিহি গ্রামের মাসুরা খাতুন, ইয়াসমিন খাতুন, বলরামনগর গ্রামের রোকসানা খাতুন, কাগমারী গ্রামের মধু খাতুন, জগদিসপুর গ্রামের নুরজাহান, তাহমিনা ও কবিতা। তাদের প্রত্যেকের গল্পটা ভিন্ন ভ্ন্নি কষ্টের কাহিনী দিয়ে সাজানো। কিন্তু কষ্টের কারণ একটাই আর তা হলো যৌতুক।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্বামী পরিত্যক্তা এসব নারী সবাই কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সবার চোখ মুখে আবারও নতুন আশার ঝিলিক। কর্মের মাধ্যমে তাদের সাদা-কালো জীবনে যেন রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে আবার।

নিচ্ছে উপজেলা পরিষদ হতে হাতের কাজের প্রশিক্ষণ। জোরালোভাবে চলছে ব্লগ-বাটিক, হস্ত-কুটির শিল্প, সেলাই কাজ শেখা। সাদা-কালো শাড়ি-ওড়না-জামা তারা রঙিন করে তুলছে।

কয়েকদিন আগে ১৫ দিনের একটা প্রশিক্ষণ শেষ করেছে তারা। কিছুদিন পর তারা ‘ওমেনস ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি শোরুম উদ্বোধন করতে যাচ্ছে কোটচাঁপুর উপজেলা শহরে।

Jhenaidah

মানিকদিহি গ্রামের মাসুরা খাতুন বলেন, আমাদের সকল প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিরলসভাবে সাহায্যসহ যে কোনো ধরনের সহায়তা করে চলেছেন কোটচাদপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মুন্সি ফিরোজা সুলতানা। আমরা প্রায় সকলেই বাল্যবিয়ের শিকার। মূলত আপার চেষ্টাতেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

কোটচাঁদপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মুন্সি ফিরোজা সুলতানা এ বিষয়ে বলেন, কাজের কারণেই তাকে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে যেতে হয়। তিনি দেখেন প্রায় সব গ্রামেই বাল্যবিয়ের শিকার অনেক মেয়েরা রয়েছে। যাদের অধিকাংশের বয়স ১৩-১৭ বছরের মধ্যে।

তিনি বলেন, এসব নারীরা বাবার সংসারেও একরকম বোঝার মতো রয়েছে। গত বছর ঢাকায় একটি ট্রেনিংয়ে যাই। সে সময় একজন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। পরবর্তীতে তাদের বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলি।

তিনি জানান, উপজেলা পরিষদে মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে ওই ৩৫ কিশোরী-তরুণীকে নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্য নবী নেওয়াজ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন তাদের জন্য একটি দোকান বরাদ্দের জন্য।

কোটচাদপুরের পালবাড়ি এলাকায় তিনতলা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট তৈরি করছে সরকার। সেখানে এসব অসহায় মেয়েদের জন্য একটি রুম বরাদ্দের আবেদনও করেছেন তিনি। একটি শোরুম ‘ওমেনস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি।

মুন্সি ফিরোজা সুলতানা দাবি করেন, বাল্যবিয়ের শিকার কিশোরী নারীদের জন্য এডিবি থেকে কিছু বরাদ্দ দিলে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া যেতো। যাতে করে তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারতো।

আহমেদ নাসিম আনসারী/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।