মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মেলেনি স্বীকৃতি


প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ২০ জুন ২০১৫

গোপালগঞ্জের শিল্পী সাধন মজুমদার (৭০) শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাননি আজও। একজন  মুক্তিযোদ্ধা হয়েও ৪৪ বছরে পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের লবণহ্রদ শরণার্থী শিবিরে ছবি একে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন। ছবির প্রদর্শনী করে অর্জিত অর্থ প্রবাসী সরকারের তহবিলে দান করে তিনি ভূমিকা রেখেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ ও পাকবাহিনীর বর্বরতার ছবি একে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার আঁকা ছবি দেখে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ও প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান প্রশংসা করেন।  

শিল্পী সাধন মজুমদার একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, সংগীত শিল্পী, চিত্রশিল্পী. মৃৎ শিল্পী, যন্ত্রকুশলী ও বাঁশিবাদক।
কোটালপিাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের সহজাত গ্রামীণ শিল্পী ছোটবেলা থেকে গান লেখা, গান গাওয়া, কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, মূর্তিগড়া, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা ও শাড়ির প্রিন্টসহ বিভিন্ন শৈল্পিক কাজের প্রতি উৎসাহি হয়ে পড়েন।
 
দরিদ্র পরিবারের সন্তান সাধন মজুমদার বিভিন্ন কাজে পারদর্শী ও মেধাবী হওয়া সত্বেও পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তার পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ১৯৬৭ সালে তিনি খুলনা আর্ট স্কুল থেকে ৪ বছরের ডিপ্লোমা লাভ করেন।
 
এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও শিল্পী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রাখেন। এরপর দেশে ফিরে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিযে আনতে তিনি শিল্প কর্মে মনোনিবেশ করেন। বিভিন্ন পূজায় দেব-দেবির মূর্তি বানিয়ে ছবি এঁকে গান গেয়ে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নেন তিনি। ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে তার গান ও কবিতা লেখা । এ পর্যন্ত তার রচিত গানের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার  ঘোষণার পর গ্রামে গ্রামে তার রচিত ও সুর আরোপিত গান গেয়ে তিনি মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা জুগিয়েছেন।

এক পর্যায়ে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনে বাটিক শিল্প বিভাগে স্বল্প বেতনের একটি চাকরি নেন। তার তৈরি বাটিক শিল্প বেশ প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এজন্য তিনি সারা দেশের মধ্যে বেসরকারি সংস্থার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করেন।

সাধন মজুমদারের আঁকা অধিকাংশ ছবি রিয়েলিস্টিক বা গণমানুষের জন্য সহজে বোধগম্য। জটিল কম্পোজিশনে তিনি কোনো ছবি আঁকেননি। শিল্পীর সরল জীবনের মতোই যেন তার আঁকা ছবি। ৬ সন্তানের জনক সাধন মজুমদার এখন বয়সের ভারে ক্লান্ত। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। শিল্পী সাধন মজুমদারের জীবনের শেষ ইচ্ছে হলো, তার মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি যেন মেলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একবার দেখা করে তার মাটির তৈরি একটি ইদুর ও জলরঙে আঁকা কিছু ছবি উপহার দিতে চান তিনি। কিন্তু শিল্পীর সে ইচ্ছা আদৌ পূরণ হবে কিনা তা নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন , আমার আঁকা ছবি সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষকে নিয়ে। ওইসব সাধারণ মানুষ আমার আঁকা ছবির মর্মার্থ না বুঝলে আমার প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণেই আমি রিয়েলিস্টিক ছবি আঁকা পছন্দ করি। আমার আঁকা বাটিক প্রিন্টের একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ও একটি মাটির ইগুর শাহবাগ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। আমি রুগ্ন শরীর নিয়ে দিনাতিপাত করছি। জাতীয় পর্যাযে আমার আঁকা ছবি নিয়ে কোনো প্রদর্শনী হয়নি। আমার ছবির সংখ্যা হাজারের বেশি। আমি যাতে জাতীয় ক্ষেত্রে শিল্পীর মর্যাদা পাই এবং মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাই এই আমার প্রত্যাশা।

তিনি আরো বলেন, এতে আমার আত্মা শান্তি পাবে এবং একটি মুক্তযোদ্ধা পরিবার হিসেবে আমার পরিবারের স্বীকৃতি মিলবে।

এ ব্যাপারে তার বন্ধু কবি ও সাংবাদিক রবীন্দ্রনাথ অধিকারী জাগো নিউজকে বলেন, শিল্পী সাধন মজুমদার ছোটবেলা থেকেই মেধাবি ও বিরল প্রতিভার অধিকারী। তার আঁকা ছবি ও তার রচিত গান এলাকায় ভীষণ জনপ্রিয়। এ পর্যন্ত তিনি শিল্পী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। বৃদ্ধ বয়সে এ স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তার মন ব্যাকুল। সরকার এ গুণী শিল্পীকে যথাযথ মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন এটাই আমাদের আশা।

এস এম হুমায়ুন কবীর/এমজেড/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।